শুধু অনোয়ারই নয়, ওসি নিজেও তাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে অনুরোধের সুরে বলেছে, সে যেনো তার হয়ে নুরে ছফাকে বুঝিয়ে বলে যা হয়েছে তার জন্য তারা লজ্জিত। সবটাই না-জেনে হয়েছে। অল্প কদিনের মধ্যে আরেকটা বাজে বদলির শিকার হতে চাইছে না বেচারা।
ব্যাপারটা এখন পরিস্কার, আতর আর সামান্য ইনফর্মারের অবস্থানে নেই। ঢাকা থেকে আসা মহাক্ষমতাধর নুরে ছফার সবচাইতে ঘনিষ্ঠ আর বিশ্বস্ত লোক সে।
এসআই আনোয়ার শুধু সিগারেট দিয়েই ক্ষান্ত হয় নি, আতরকে সঙ্গে নিয়ে চলে যায় সুন্দরপুরের দক্ষিণ দিকে কালিন্দী বিলের কাছে। জায়গাটা নিরিবিলি। আয়েশ করে গাঁজা টানতে টানতে সুখ-দুঃখের কথা বলেছে এসআই। সে আরো কথা বলতে চেয়েছিলো কিন্তু আতর তাকে বলেছে জরুরি একটা কাজে তাকে এখন এক জায়গায় যেতে হবে। এসআই চলে যাবার পরই সে জমিদার বাড়ির দিকে পা বাড়ায়।
গেটের সামনে এসে জোরে জোরে দুটো টান দিয়ে গাঁজার স্টিকটা ফেলে দিলো আতর। বন্ধ গেটের ওপাশে যে বোবা দারোয়ান ফুটো দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে সে জানে। কানে শোনে না বলে বোবা ছেলেটা বেশিরভাগ সময়ই এটা করে থাকে। তুড়ি বাজিয়ে গেট খোলার ইশারা করতেই সঙ্গে সঙ্গে বড় গেটটার মধ্যে যে ছোটো গেটটা আছে সেটা খুলে মাথা বের করে ভুরু কুচকে তাকালো বোবা ইয়াকুব। ইনফর্মারকে দেখে সে খুবই অবাক হয়েছে।
আতর হাত দিয়ে ইশারা করে দেয়াশলাই কাঠি জ্বালানোর ভঙ্গি করলো। “আছে?”
ইয়াকুব মাথা ঝাঁকিয়ে জবাব দিলো। নাই।
মুচকি হাসলো ইনফর্মার। “মাঙ্গেরপুত…পকেটে তো ফোকা রাখোস ঠিকই, দ্যাশলাই রাখোস না ক্যান?”
বোবা তার কথাটা শুনতে না পারলেও বুঝতে পারলো খারাপ কিছুই বলা হয়েছে। আতর শব্দ করে একদলা থুতু ফেলে অন্যদিকে পা বাড়ালে রেগেমেগে ছোটো গেটটা বন্ধ করে দিলো দারোয়ান।
আতর আরো জোরে হাঁটতে শুরু করলো। জমিদার বাড়িটার পর জোড়পুকুরে আর কোনো বসত-বাড়ি নেই। কয়েকটা আবাদি-অনাবাদি জমির পর আবার ভিটের দেখা পাওয়া যায়। ক্ষেতের আইল ধরে এগোতেই দেখতে পেলো রমাকান্ত মাস্টার ধীরপায়ে আইল ধরে এগিয়ে আসছে। চোখে চশমা নেই বলে বুড়ো মানুষটা নীচের দিকে চোখ পিটপিট করে চেয়ে চেয়ে পা ফেলছে।
“মাস্টরসাব, কই যান?”
আতরের কথায় অনেকটা চমকে উঠলেন মাস্টার। পিটপিট করে তাকালেন। “তুমি?”
“এটটু পুবপাড়ায় যাইতাছিলাম….কিন্তু এই ভরদুপুরে আপনে কই যাইতাছেন?”
মাস্টার যেনো একটু বিব্রত হলেন। কিছুটা দ্বিধাও দেখা গেলো তার মধ্যে। “এই তো…সামনেই…”
ক্ষেতের আইল থেকে নেমে দাঁড়ালো আতর, তার চোখেমুখে সন্দেহ। সামনে মাইনে? মনে মনে বললো সে। সামনে তো পুরা দুনিয়া পইড়া আছে।
রমাকান্তমাস্টার আর কোনো কথা না বলে হাটার গতি বাড়িয়ে দিলেন, যাবার সময় আতরের দিকে ফিরেও তাকালেন না।
আইলের পাশে দাঁড়িয়ে থেকে মাস্টারের গন্তব্য বোঝার চেষ্টা করলো ইনফর্মার। একবারের জন্যেও না থেমে, পেছন ফিরে না তাকিয়ে রমাকান্তকামার চলে যাচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর আতর আলী অবাক হয়ে দেখতে পেলো মাস্টারের গন্তব্য আর কোথাও নয়, ঐ জমিদার বাড়ি! ধপ-ধপ করে যে ভোতা শব্দ হচ্ছে সেটা তার ভালোই লাগে। ছোটোবেলায় মা যখন ঘুম পাড়াতো তখন তার পিঠের উপরে মায়ের নরম হাত চাপড় মারলে এমনটি হতো। শব্দটার মধ্যে থাকতো সম্মোহনী শক্তি। ধীরে ধীরে গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতো সে।
ধপ ধপ! ধপ!
একটু বিরতি দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো ফালু। কবরটা এখনও খোরা শেষ হয় নি কিন্তু সারা শরীর ঘেমে একাকার। তার বলিষ্ঠ পেশীগুলো আরো ফুলেফেঁপে উঠেছে। দেখে মনে হচ্ছে তেলমাখানো শরীরের কোনো মল্লবীর। শীত হোক আর গ্রীষ্ম, মাথার উপরে সূর্য থাকলে একটু গরম লাগবেই। আর সেই সূর্যের নীচে দাঁড়িয়ে কেউ যদি মাটি কাটার মতো পরিশ্রমের কাজ করে তাহলে ঘেমে ওঠাটা খুব স্বাভাবিক। সাধারণ মাটি কাটার কাজের চেয়ে গোর খুরতে আরো বেশি পরিশ্রমের দরকার পড়ে। আজকের এই পরিশ্রমটা তার করতেই হতো না যদি গতরাতে ওরা চলে না আসতো।
যাহোক, সদ্য খোরা কবরের দিকে তাকালো সে। সাড়ে-তিনহাত গভীর করে মাটি খুরতে হবে। একটুও বেশ-কম করার উপায় নেই। এরইমধ্যে তিনহাত খোরা হয়ে গেছে, আর অল্প একটু খুরলেই কাজ শেষ হয়ে যাবে। কপালের ঘামগুলো ডানহাতের আঙুল দিয়ে কেচে ফেলে দিলো। তাকে একটু দ্রুত করতে হবে। জরের আজান দিয়ে দিয়েছে। নামায শেষ হলেই জানাযা আর জানাযা শেষ হলে গোর।
উপুড় হয়ে আবারো কাজে নেমে পড়লো সে। বেতের টুকরিটা কবরের জমিনে রেখে দিয়েছে। কোদাল দিয়ে মাটি তুলে ওটা ভরাট করে কবরের বাইরে ফেলছে। সদ্য কবরটার একপাশে জমে আছে আলগা মাটির স্তূপ। ফালু কাজে ডুবে যেতেই আবারও সেই শব্দটা ফিরে এলো :
ধপ-ধপ-ধপ।
শব্দটার সম্মোহনী শক্তি সব সময়ের মতোই আবারো তাকে কাজের মধ্যে ডুবিয়ে দিলো।
“কার কব্বর খুদতাছোস?”
কবরের নীচ থেকে মুখ তুলে তাকালো ফালু। আতরকে দেখে অবিশ্বাসে চেয়ে রইলো কয়েক মুহূর্ত। দু-হাত পেছনে রেখে দাঁড়িয়ে আছে। ইতরটার ভাব দেখে মনে হচ্ছে গ্রামপঞ্চায়েতের প্রধান সে।
“আবার ক্যাঠায় মরছে?”
“কেউ না,” তিক্তমুখে জবাব দিলো ফালু।
কথাটা শুনে রেগেমেগে তাকালো ইনফর্মার। “আবারও তুই ফাইজলামি শুরু করছোস? পাইছোস কি? নিজেরে কী মনে করোস? তুই কব্বর খুদলেই মানুষ মরবো?”
