নুরে ছফা তাকে অল্পবিস্তর যেটুকু বলেছে তাতে দেখা যাচ্ছে রহস্যময় গোরখোদক বয়সে তরুণ, বিয়ে-শাদী করে নি এখন পর্যন্ত, কবরস্তানের ভেতরেই ছোট্ট একটা কুড়েঘরে থাকে। ওখানকার অনেকেই মনে করে এই গোরখোদক ছেলেটি কামেল কেউ হবে। তার অবশ্য তেমন কিছু মনে হচ্ছে না। সে হলো যুক্তির মানুষ। গালগল্প আর অতিপ্রাকৃত কিছুতে কোনো কালেই তার বিশ্বাস ছিলো না। সবকিছুই যুক্তি দিয়ে বিচার করে। সে নিশ্চিত, গোরখোদকের অমন অদ্ভুত আচরণের পেছনে বাস্তবসম্মত কারণ রয়েছে। আর সেই কারণটা যতক্ষণ না বের করতে পারছে ততোক্ষণ তার স্বস্তি নেই।
ছফা তাকে আরো বলেছে, এই ছেলেটাকে মুশকান জবেরির বাড়ির নির্জন জায়গায় কবর খুরে কিছু মাটিচাপা দিতেও দেখেছে সে। ঐ সময় রহস্যময়ী মহিলাও উপস্থিত ছিলো তখন। সব মিলিয়ে কৌতূহলোদ্দীপক একটি ঘটনা। আর এটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে ছুট করেই তার মাথায় একটা সম্ভাবনা উঁকি দিয়েছে। এটা হতে পারে অ্যাডভান্স কবর খোরার সম্ভাব্য যৌক্তিক ব্যাখ্যা। তবে তার জন্য কিছু জরুরি তথ্য জানা দরকার। এজন্যে নুরে ছফাকে ফোন করে বলে দিতে হবে।
“আপনে রাইতে কি খাইবেন?”
আইনস্টাইনের কথায় ফিরে তাকালো কেএসকে। “রুটি। চায়ে চুমুক দিয়ে সংক্ষেপে জানালো সে।
“আরে, রুটির লগে কি খাইবেন ওইটা জিগাইছি।”
“ও,” একটু ভাবলো কেএস খান। “তর যেইটা ভালা লাগে নিয়া আয়।”
“কলিজার ভূনা নিয়া আসুম?”
ছেলেটার দিকে তাকালো। তার চোখমুখে কেমন হাসিহাসি ভাব। বুঝতে পারলো, আজরাতে কলিজার ভুনাই খেতে হবে নইলে এই আইনস্টাইন সুগভীর এক আক্ষেপ নিয়ে ঘুমাতে যাবে।
“ঠিক আছে, কলিজার ভুনাই নিয়া আয়।”
হাসিমুখে ঘর থেকে চলে গেলো ছেলেটা।
নুরে ছফা কিছুটা বিরক্ত হলেও সেটা প্রকাশ করতে পারলো না, কারণ ফোনের ওপাশে যে মনুষটার সাথে এখন কথা বলছে তাকে সে কেবল শ্রদ্ধাই করে না, বরং অভিভাবকও মনে করে। এই মানুষটির সাথে তার বেশ মিল। তাদের দুজনের একটাই সমস্যা-নিজেদের নাম! উভয়ের প্যাশন। ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন। কেএসকের মতো ছফাও এখন পর্যন্ত কোনো কেসে ব্যর্থ হয় নি। আর তারা দু-জন নিছক চাকরি করার জন্য ডিবিতে যোগ দেয়। নি। এটা তাদের ধ্যান-জ্ঞান।
“নুরে ছফা, আপনে দেখবেন, ঐ আন্ডারটেকার পোলাটা যেসব অ্যাডভান্স কবর খুদছে ওইগুলার আশেপাশে কি আছে বুঝতে পারছেন। আমার কথা?”
“জি, স্যার,” নুরে ছফা জবাব দিলো। একটু আগে কেএস খানকে সে ফোন করেছিলো জরুরি একটা প্রয়োজনে, অথচ মি. খান মুশকান জুবেরির ব্যাপারে আগ্রহ না দেখিয়ে উৎসুক হয়ে পড়েছে গোরখোদক ফালুর ব্যাপারে!
“অ্যাডভান্স কবরগুলার পাশে যদি অন্য কোনো কবর থাকে তাইলে। দেখবেন ওইগুলা কতোদিনের পুরানা…আর ডিসটেন্সটাও কিন্তু খুব ভাইটাল…বুঝবার পারছেন তো আমার কথা?”
“জি, স্যার,” আবারো একই কথা বললো বটে আসলে সে কিছুই বুঝতে পারছে না। “ডিসটেন্স মানে?…কিসের ডিসটেন্স, স্যার?”
“ঐ যে অ্যাডভান্স কবরের পাশে পুরাতন কবর যদি থাকে সেইটার কথা বলতাছি।”
আলতো করে দীর্ঘশ্বাস ফেললো ছফা। এসব তথ্য জানতে কেন উদগ্রীব হয়ে উঠেছে তার প্রিয় এই মানুষটি সে বুঝতে পারছে না। “ঠিক আছে, স্যার।”
“এইটা কইলাম খুব জরুরি..আপনে যত জলদি পারেন এই ইনফর্মেশনগুলা আমারে দেন।”
এইসব ইনফর্মেশন জরুরি! হতাশ হলেও মুখে বললো, “আচ্ছা, স্যার।”
“মনে হইতাছে ঐ আন্ডারটেকারের মিস্ট্রিটা প্রায় সলভ কইরা ফালাইছি।”
নুরে ছফার বিরক্তি আরো বেড়ে গেলো কথাটা শুনে, তবে যথারীতি সেটা প্রকাশ করতে পারলো না। “তাই নাকি, স্যার?”
“হুম। একটা হাইপো দাঁড় করাইছি…এখন ওইটার সাপোর্টে কিছু ইনফর্মেশন লাগবো।”
“স্যার?” ছফা নিজের দরকারটার কথা না বলে আর থাকতে পারলো না।
“বলেন, শুনতাছি তো…”
“আপনাকে একটা কাজ করতে হবে। কাজটা আমার এই কেসের জন্য খুবই জরুরি।”
“এই নিয়া চিন্তা কইরেন না, আমি তো বলছিই, আপনেরে এই কেসে যতোটুকু হেল্প করনের দরকার আমি করুম। আপনে আগে ঐ আন্ডারটেকারের-”।
“স্যার,” কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে বলতে বাধ্য হলো নুরে ছফা। “আপনার জন্য ঐ ইনফর্মেশনগুলো কালেক্ট করার ব্যবস্থা করছি কিন্তু আমি যে কাজটার কথা বলছি সেটা অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে অনেক বেশি ইম্পোর্টেন্ট।”
“ও।” ওপাশ থেকে কেবল এটাই বললো ডিবির সাবেক ইনভেস্টিগেটর।
“আপনি ছাড়া এটা অন্য কেউ ভালোভাবে করতে পারবো না।” “কাজটা কি, নুরে ছফা?”
.
অধ্যায় ২৯
আতর আলীর সিনা যতোটা চওড়া ছিলো তারচেয়েও বেশি চওড়া হয়ে গেছে। সেই চওড়া সিটা টানটান করে আয়েশি ভঙ্গিতে হেঁটে যাচ্ছে সে। স্বয়ং নুরে ছফা, যে কিনা এখন আর সামান্য সাংবাদিক নয়, ডিবির বিরাট বড় অফিসার, তাকে একটু আগে ফোন করে একটা কাজ দিয়েছে। থানার পুলিশকে বাদ দিয়ে ছফাস্যার তাকে বলেছে ফালু ছেলেটার অ্যাডভান্স কবর খোরার ব্যাপারে একটু খোঁজ-খবর নিতে হবে। কথাটা শুনে আতর একটু অবাকই হয়। গতকাল সে যখন অ্যাডভান্স কবর খোরার কথা বলছিলো তখন ছফা কোনো আগ্রহই দেখায় নি। আজ হঠাৎ করেই আগ্রহ দেখানোর কারণ কি?
যাহোক, অতো শত ভেবে কাজ নেই। সময় হলে এই প্রশ্নের জবাব সে ঠিকই পেয়ে যাবে।
আতর বুঝতে পারছে তার এখন সুদিন। অনেকেই তাকে তোয়াজ করতে শুরু করে দিয়েছে। নুরে ছফা থানা থেকে চলে যাবার পরই এসআই আনোয়ার একান্তে ডেকে নেয় তাকে, নিজের প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে দিয়ে নরম আর ভালো ব্যবহার করে তার সাথে। শেষে বেজার মুখ করে। বুঝিয়ে দিয়েছে, তার দিকটা যেনো আতর একটু দেখে। সে কি ওসিসাহেবের সামনে তার পক্ষ নিয়ে কথা বলে নি?
