সুন্দরপুরের এসপি ঢোক গিলে গোল গোল চোখে চেয়ে রইলো। কিছু একটা বলতে যাবে অমনি বেজে উঠলো তার মোবাইলফোনটা। বেচারার কপাল আজ সত্যি খারাপ। ফোনটা রাখা আছে ডেস্কের উপরে। ডিসপ্লেতে কলার আইডি দেখে ছফার অভিব্যক্তি কী রকম দুবোধ ঠেকলো তার কাছে।
“কলটা ধরবেন না?” বাঁকাহাসি দিয়ে বললো নুরে ছফা।
দীর্ঘশ্বাস ফেললো মনোয়ার হোসেন। “ধরে বলবোটা কী?”
“জানি না। তবে না ধরলে তো মহিলা অন্য কিছু ভাববে।”
এসপি চুপ মেরে রইলো।
“আমার মনে হয় ফোনটা রিসিভ করাই ভালো। উনাকে বলে দিন, আপনি অন্য একটা কাজে খুব ব্যস্ত আছেন। ওসির সাথে আর কথা হয় নি। সন্ধ্যার দিকে ফোন করে জানাবেন। আশা করি তখন আর ফোন করার দরকার হবে না।”
ফোনের রিং বন্ধ হয়ে গেলো।
“আরেকবার যদি করে তাহলে বলবো…এখন কলব্যাক করে এটা বলা ঠিক হবে না। আমি তো খুব বিজি আছি, তাই না?”
“আপনি একটু পরই উনাকে কলব্যাক করে এ কথাগুলো বলবেন।”
মাথা নেড়ে সায় দিলো এসপি মনোয়ার হোসেন। তার সামনে যে লোক বসে আছে তার সাথে দ্বিমত প্রকাশ করলে বিপদ বাড়বে বৈ কমবে না। এরইমধ্যে যথেষ্ট বিপাকে পড়ে গেছে। এই নুরে ছফা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ক্ষমতাবলে এখন ছড়ি ঘোরাচ্ছে তার উপরে। এর সাথে তাল মিলিয়ে না চললে বিপদ। একে চটানো হবে ক্যারিয়ার সুইসাইড করার শামিল। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ক্ষমতাধর ব্যক্তি স্বয়ং আইজিসাহেবকে দিয়ে ফোন। করিয়েছেন। কপাল ভালো থাকলে হয়তো সুন্দরপুর থেকে ভুরুঙ্গামারি কিংবা খাগড়াছড়িতে বদলি না-ও হতে পারে।
“আমাদের এমপি সাহেব কিনতু ইন্টারফেয়ার করতে পারেন…আই মিন, মিসেস জুবেরির সাথে উনার বেশ ভালো সম্পর্ক…উনি যদি ব্যাপারটা এমপিকে-”
হাত তুলে এসপিকে থামিয়ে দিলো ছফা। “এমপি আসাদুল্লাহকে নিয়ে চিন্তা করবেন না। উপযুক্ত জায়গা থেকে উনার লাগাম টেনে ধরা হবে।”
এসপি চুপ মেরে গেলো। কথাটার মানে বুঝতে আর বাকি নেই।
“আপনার সাথে যে মিসেস জুবেরির দারুণ খাতির…এটা আমার কাজে ভালোই সাহায্য করবে,” মনোয়ার হোসেনকে চুপ থাকতে দেখে বললো ছফা।
“না, আসলে তেমন খাতির নেই…” কাচুমাচু খেলো ভদ্রলোক। “ঐ আমাদের এমপির কারণে একটু যোগাযোগ রাখতাম আর কি।”
মাথা নেড়ে সায় দিলো সে। “এখন বলুন, ঢাকা থেকে কেউ কি ঐ মহিলার সাথে দেখা করতে আসে এখানে?”
এসপি বুঝতে পারলো না কী বলবে। তবে ছফাকে সহযোগীতা না করার কথা এ মুহূর্তে চিন্তাও করতে পারছেনা।
“ডাক্তার আসকার ইবনে সায়িদ নামের কেউ কি এখানে আসে?”
মনোয়ার হোসেন বুঝতে পারলো এই লোকের কাছে সত্যিটা না বলে এখন আর উপায় নেই। “আমার জানামতে কেবল উনিই আসেন…আর কারোর কথা আমার জানা নেই।”
মুচকি হাসলো ডিবির ইনভেস্টিগেটর। তার সহকারী ঠিকই বলেছে। অরিয়েন্ট হাসপাতালের অনেকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, হাসপাতালের একাংশের মালিক এবং স্বনামখ্যাত চিকিৎসক ডাক্তার আসকার ইবনে সায়িদের সঙ্গে মুশকান সোহেলির বেশ সু-সম্পর্ক ছিলো। আর এখন এসপি বলছে, ঐ ডাক্তারই কেবলমাত্র সুন্দরপুরে আসে। তার মানে ডাক্তারসাহেব আরেকটা সোর্স অব ইনফর্মেশন হতে পারে।
.
অধ্যায় ২৮
কোনো জটিল আর কঠিন কেস সমাধান করার পরই কিছুদিন বই নিয়ে ডুবে থাকে সে। অদভুত আর রহস্যময় একটি লাশ নিয়ে যে জটিলতার মধ্যে নিপতিত হয়েছিলো বিগত কয়েকটা দিন, অবশেষে সেটার মীমাংসা করা গেছে। কিন্তু বইয়ের মধ্যে ডুবে না গিয়ে অন্য একটি কেস নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে কেএস খান। এটা খুবই ব্যতিক্রমী ঘটনা। তবে যে কারণে সে এখন মাথা ঘামাচ্ছে সেটা আরো বেশি ব্যতিক্রধর্মী।
দীর্ঘদিন পর তদন্তের সুবাদে ঢাকার বাইরে কক্সবাজারে গেছিলো। তদন্ত কী আর করবে, ওখানে পা রাখতে না রাখতেই সারা শরীর কাঁপিয়ে জ্বর চলে আসে। পর পর তিনদিন হোটেল-রুমে বন্দী হয়ে থাকে সে। বেলকনি থেকে সমুদ্র দেখা ছাড়া আর কিছুই করতে পারে নি। তার ছাত্র। আমিরুল অবশ্য যথাসাধ্য সেবা করেছে তার। কক্সবাজারের সবচেয়ে বড় ডাক্তারকে ডেকে এনেছিলো হোটেলে। যদিও এর কোনো দরকারই ছিলো না। নিজের শরীরকে সে ভালোমলোই চেনে। তিন-চারদিন ভুগিয়ে এক সকালে ঘুট করেই জ্বর তাকে ছেড়ে পালাবে-এ ব্যাপারে একদম নিশ্চিত ছিলো। অসুখ-বিসুখ হলো তার ইয়ার-দোস্তের মতো। নিত্যদিন আসবে, আবাজি করবে তারপর চলেও যাবে, স্ত্রী-সন্তানের মতো জীবনের সাথে পুরোপুরি জড়িয়ে থাকবে না।
তো, তিনদিন পর জ্বরটা ঠিকই উধাও হয়ে গেলো। সেও দেরি না করে নেমে পড়লো কাজে। কারণ জ্বরের ঘোরেই তার মাথায় কুলু-বিহীন কেসগুলোর সমাধান চলে আসে চট করে। এই অদ্ভুত কাণ্ডটি বার বার ঘটে তার সাথে। সেদিক থেকে দেখলে, কোনো কেসের জটিলতম সময়ে তার জ্বর চলে এলে মনে মনে আশান্বিত হয়ে ওঠে সে।
হঠাৎ সম্বিত ফিরে পেতেই দেখতে পেলো তার সামনের টেবিলে এক কাপ চা ধোঁয়া ছাড়ছে। একটু আগে আইনস্টাইনকে চা দিতে বলেছিলো। কাপটা তুলে নিয়ে লম্বা করে চুমুক দিলো।
তার প্রিয়পাত্র নুরে ছফা একটা কেস নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। একজন মানুষের নিখোঁজ হবার ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে সে আবিষ্কার করেছে সত্যিকারের নিখোঁজের সংখ্যা পাঁচজনের নীচে হবে না। এই পাঁচজনের মধ্যে কমপক্ষে দু-জনের শেষ গন্তব্য কোথায় ছিলো সেটা বের করতে সক্ষম হয়েছে সে। উত্তরবঙ্গের একটি মফশ্বল শহর সুন্দরপুরে ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেন নি’র মতো অদ্ভুত নামের একটি রেসটুরেন্টের সন্ধান পাওয়া গেছে। রেস্টুরেন্টটির মালিক মুশকান জুবেরি সম্পর্কে এ পর্যন্ত যেসব তথ্য ছফা জানতে পেরেছে তাতে মনে হচ্ছে নিখোঁজ ঘটনাটির মতো ঐ মহিলাও কম রহস্যময়ী নয়। কিন্তু তার নিজের কৌতূহল হচ্ছে অন্য একজনকে নিয়ে। ছফা এখন যেখানে আছে সেই সুন্দরপুরে নাকি এমন এক গোরখোদক রয়েছে, যে মানুষ মারা যাবার আগেই টের পেয়ে যায়। অনেক সময়ই দেখা যায় নিজ উদ্যোগে সে কবর খুড়ছে, আর তার পর পরই শোনা যায় ঐ গ্রামে একজন মারা গেছে!
