কিনতু গন্তব্যটা কোথায় ছিলো সেটা কি ড্রাইভারের মনে আছে? প্রশ্নটা করার আগে ছফা আশংকা করেছিলো, সম্ভবত অনেক দিন আগের ঘটনা বলে ড্রাইভারের পক্ষে গন্তব্যের কথাটা মনে না-ও থাকতে পারে। এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু তাকে চমকে দিয়ে ঐ ক্যাবচালক জানায় তার স্পষ্ট মনে আছে ঐ প্যাসেঞ্জারকে কোথায় নামিয়ে দিয়েছিলো।
কথাটা শুনে ছফা যারপরনাই বিস্মিত হয়। কিন্তু সে নিশ্চিত হতে পারছিলো না ক্যাবচালক কিভাবে এটা মনে রাখতে পারলো। ঠিক তখনই চালক তাকে ভড়কে দিয়ে আরেকটি তথ্য দেয়-হাসিবকে ওখানে পৌঁছে দেবার মাস দুয়েক আগে আরেকজন প্যাসেঞ্জারকে একই জায়গায়, একই রেস্টুরেন্টে নামিয়ে দিয়েছিলো সে। রেস্টুরেন্টটির অদ্ভুত নাম আর দু জন প্যাসেঞ্জারকে একই গন্তব্যে পৌঁছে দেয়ার কারণেই এতোদিন পরও ওই জায়গাটা ক্যাবচালকের মনে আছে।
সুন্দরপুরে? ওখানকার সড়কের পাশে একটি রেসটুরেন্টে?
রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসে নি??
.
অধ্যায় ২৭
এসপি মনোয়ার হোসেন অনেকক্ষণ চুপ মেরে সব শোনার পর গাল চুলকালো।
এরইমধ্যে চা দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়েছে ছফাকে। চায়ের কাপে পর পর কয়েক চুমুক দিয়ে শেষ করে রেখে দিলো সে। এসপি আরো আগেই নিজের কাপ খালি করেছে। ছফা এতোক্ষণ একনাগারে কথা বলছিলো বলে চায়ে খুব কমই চুমুক দিতে পেরেছে।
“বুঝলাম ঐ দু-জন নিখোঁজ ব্যক্তি ঢাকা থেকে রবীন্দ্রনাথে এসেছিলো,” সুন্দরপুরের এসপি যথেষ্ট নরমকণ্ঠে বললো, “কিন্তু তার মানে তো এই নয়, ওদের নিখোঁজের সাথে মিসেস জুবেরি জড়িত?”
“দু-জন মানুষ একই গন্তব্যে আসার পর নিখোঁজ হয়ে যাওয়াটা কি খুব বেশি কাকতালীয় হয়ে যায় না?” ছফা পাল্টা জানতে চাইলো।
“তা ঠিক,” এসপি থুতনি চুলকালো। “আমি কিন্তু তা বলছি না, আমি বলতে চাচ্ছি…এমনও তো হতে পারে, অন্য কেউ বা কোনো গ্রুপ এসবের সাথে জড়িত…তারা হয়তো রবীন্দ্রনাথকে সেফ-প্লেস হিসেবে ব্যবহার করেছে?”
ছফা মুচকি হাসলো কথাটা শুনে। “দুই-দু-জন লোক রবীন্দ্রনাথে এসে নিখোঁজ হয়ে গেছে-এটা জানার পর আমি ঢাকার থানাগুলোতে চেক করে দেখেছি একই রকম নিখোঁজ হবার আনসলভ কেস তাদের কাছে আছে কিনা। সব রেকর্ড চেক করার পর এরকম আরো তিনটি কেস পাওয়া গেছে। হ্রট করে তারা কাউকে কিছু না বলে একদিন উধাও হয়ে গেছে। তাদের সবার বয়স ত্রিশ থেকে পয়ত্রিশের মধ্যে। সবাই ভালো চাকরি করতো। সিঙ্গেল ছিলো।”
এসপি হা করে চেয়ে থেকে অবশেষে বললো, “ওই তিনজনও কি এখানে এসেছিলো?”
“না। সেটা এখনও জানা যায় নি। তবে আমার মনে হয় ওই তিনটি ঘটনাও এই কেসের সাথে সম্পর্কিত। সম্ভবত তারাও একইরকম ভাগ্য বরণ করেছে এখানে এসে।”
“কি রকম?”
“আশা করি সেটা খুব জলতি জানতে পারবো।”
“এমন কি হতে পারে না,” নরম কণ্ঠে বললো এসপি, “সংঘবদ্ধ একটি গ্রুপ এসবের সাথে জড়িত। ওরা হয়তো এখানেই, এই সুন্দরপুরে অপারেট করে?”
“যুক্তির খাতিরে যদি বলেন, তাহলে এটা অবশ্যই হতে পারে।”
এসপি নিজের হাইপোথিসিস বলতে উৎসাহী হয়ে উঠলো। “অনেকটা ছিনতাইকারীদের মতো আর কি..তারা একটা জায়গা বেছে নেয় নিরাপদে ছিনতাইয়ের জন্য। তার মানে তো এই নয়, ঐ জায়গার মালিক কিংবা আশেপাশে যারা থাকে তারা ছিনতাইর সাথে জড়িত?”
“আমি কিন্তু এটা জানার পরই ঐ মহিলাকে সাসপেক্ট করি নি,” আস্তে করে বললো ছফা। “এখানে আসার আগে আমি আসলে জানতামই না রেস্টুরেন্টটির অসাধারণ খাবারের কথা আর তার মালিক একজন মহিলা।”
এসপি চুপ মেরে গেলো।
“তার চেয়েও বড় কথা রেস্টুরেন্টটা যে মিটিংপ্লেস হতে পারে সেটাও ধরে নিয়েছিলাম কিন্তু এর অদ্ভুত নাম আর রহস্যময়ী মালিক আমার মনোযোগ আর্কষণ করলো, কারণ এই কেসটার সাথে রবীন্দ্রনাথের একটা কানেকশান আছে।”
“মানে?” এসপিকে খুবই বিস্মিত দেখালো।
“আমি যে ভিক্টিমের মিসিং-কেসটা নিয়ে কাজ করছি তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে চারুলতা নামের রহস্যময় একটি আইডি আছে। ঐ আইডিটা এখন ডি-অ্যাক্টিভ।”
“চারুলতার সাথে রবীন্দ্রনাথের কী সম্পর্ক?” বোকার মতো বলে ফেললো এসপি।
গাল চুলকালো ছফা। রবীন্দ্রনাথ যার ভালোমতো পড়া নেই তাকে এটা। বোঝাতে গেলে অনেক কথা বলতে হবে। “লম্বা গল্প…বাদ দেন। আসল কথা হলো, গত তিন-চারদিনে আমি আরো অনেক কিছুই জানতে পেরেছি। এখানে আসার আগে নিখোঁজ ঘটনাগুলোর সাথে রেসটুরেন্টটার কি কানেকশান থাকতে পারে সেটা নিয়ে আগে থেকে কিছুই ভাবি নি। ঐ মহিলার কথা তো বহু দূরের ব্যাপার।” একটু থেমে আবার বললো, “যাইহোক, আমি যে অনেক কিছু জেনে গেছি সেটা ঐ মুশকান জুবেরিও বুঝে ফেলেছে খুব দ্রুত, সে-কারণেই আমার পেছনে আপনাদের লেলিয়ে দিয়েছে।”
কথাটা শুনে এসপি মনোয়ার হোসেন কাচুমাচু খেলো।
“মনে রাখবেন, আমাদের ভিক্টিম যাত্রাপথে গাড়ি থামিয়ে রবীন্দ্রনাথে খাওয়াদাওয়া করে নি। সে ঢাকা থেকে একটা ট্যাক্সি নিয়ে এখানে এসেছিলো। ওয়ান-ওয়ে রেন্ট ছিলো ওটা। এজন্যে ক্যাব-চালককে ভালো টাকাও দেয়া হয়।”
এসপি ভদ্রলোক কপাল ঘষলো হাত দিয়ে। “ম্যাডামের ব্যাপারে কি এমন কিছু জানতে পেরেছেন যার কারণে উনাকেই প্রাইম সাসপেক্ট মনে করছেন?”
এসপির দিকে তাকিয়ে আবারো মুচকি হাসলো ছফা। “আমি যা জানতে পেরেছি সেটা যদি শোনেন তাহলে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠবে৷”।
