ঐদিন রাতে বাসায় ফিরে গেলেও সারারাত তার ঘুম আসে নি। হাসিরের মতো একজন যুবক হঠাৎ করে কোথায় হারিয়ে যাবে? সে তো কোনো দুর্ঘটনায় পড়ে মারা যায় নি। পুলিশ বহু আগেই এটা খতিয়ে দেখেছে। খারাপ কোনো লোকের পাল্লায় পড়ে কিডন্যাপও হয় নি। তাকে জিম্মি করে টাকা দাবি করার মতো ঘটনাও ঘটে নি।
তার ফিলোসফার অ্যান্ড গাইড কেএস খান ঢাকার বাইরে অন্য একটা কেস নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। বলা নেই কওয়া নেই এক সজ্জন ব্যক্তির ফ্ল্যাটে কোত্থেকে যেনো লাশ এসে হাজির! অজ্ঞাত মৃতলোকটি ফ্ল্যাটে কিভাবে ঢুকলো, কিভাবে খুন হলো সে-ব্যাপারে সামান্যতম কুলুও খুঁজে পায় নি পুলিশ। ফলে যা হবার তাই হয়েছে, তদন্তকারী কর্মকর্তা হালে পানি না পেয়ে কেএস খানের দ্বারস্থ হয়। পুলিশ আর ডিবির প্রায় সবাই কোনো কেসে সুবিধা করতে না। পারলে মি. খানের শরণাপন্ন হয়। ভদ্রলোকও কাউকে না করতে পারেন না।
অবশেষে ছফাও তাই করে কিনতু বেচারা কক্সবাজারে গিয়ে জুরে। পড়ে গেছিলো। জ্বরের ঘোরেই তার কাছ থেকে কেসটার ব্যাপারে সংক্ষেপে সব শুনে বলেন, আগের তদন্তকারীরা নিশ্চয়ই কোনো ভুল করেছে, আর সেই ভুলটা তাদের কাজের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। চলভাষায় স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে তিনি আরো বললেন, “নুরে ছফা, একটা কথা মনে রাখবেন, যে মাটিতে আছাড় খাইবেন সেই মাটি থেইকাই আপনেরে উঠতে হইবো।”
কেএস খান তাকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, কক্সবাজার থেকে ঢাকায় ফিরে তিনি কেসটা দেখবেন। এই ফাঁকে ছফা যেনো আগের তদন্তের কিছু ভুল-ত্রুটি খুঁজে বের করে।
পরদিনই ছুটি নিয়ে নেয় সে, সারাদিন পড়ে থাকে নিজের ঘরে। কেসের যতো কাগজপত্র আছে সবকিছুতে আবার চোখ বুলাতে শুরু করে। লোকজনের ইন্টারভিউ, ভাষ্য, সব আরেকবার পড়তে শুরু করলো গভীর মনোযোগের সাথে। আগের ফাইলে থাকা হাসিবের কিছু ছবি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখে গেলো, আর এটা করতে গিয়েই একটা বিষয় তার মাথায় এলো। আগের তদন্তকারীরা কি হাসিবের ঘনিষ্ঠ কারোর সাক্ষাৎকার বাদ দিয়েছে?
হাসিবের সাথে তার কলিগ আর বনধুবান্ধবদের কিছু ছবিতে চোখ বুলাতে গিয়ে সে চেক করে দেখলো এদের মধ্যে কার কার সাথে আগের তদন্তকারী অফিসাররা কথা বলেছে। কাগজপত্র ঘেঁটে সে নিশ্চিত হলো পুলিশ আর সিআইডি একটি ছেলের ইন্টারভিউ নেয় নি। কিন্তু হাসিবের সাথে বেশ কিছু ছবিতে ঐ কলিগকে অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখা গেছে, অথচ তার কোনো ভাষ্য পলিশ কিংবা সিআইডি নেয় নি কেন?
পরদিন সকালে নিজের মোটরসাইকেলে করে ঐ কলিগের সাথে কথা বলার জন্য হাসিবের অফিসে চলে যায় ছফা। ঐ কলিগের সাথে কথা বলার সময় সে জানতে চায়, হাসিবের কি কোথাও যাবার প্ল্যান ছিলো? এরকম কিছু কি সে ঐদিন বলেছিলো?
না। এরকম কোনো কথা হাসিব তাকে বলে নি। কথাটা শুনে ছফা হতাশ হয়েছিলো, কিন্তু পরক্ষণেই ছেলেটা জানায়, তবে নিখোঁজ হবার দিন। হাসিব ওর কাছে জানতে চেয়েছিলো ভালো কোনো ট্যাক্সিক্যাব কোম্পানির নাম্বার দিতে পারবে কিনা।
ট্যাক্সিক্যাব?
হ্যাঁ। হাসিবকে সে গ্রিনল্যান্ড-ক্যাব কোম্পানির নাম্বারটা দিয়ে জানতে চেয়েছিলো, ক্যাব দিয়ে ও কি করবে। জবাবে ভিক্টিম বলেছে, সন্ধ্যার পর এক আত্মীয়কে এয়ারপোর্ট থেকে রিসিভ করতে হবে।
ছফা উত্তেজনায় টগবগ করতে শুরু করে। হাসিব তার ঘনিষ্ঠ কলিগকে বলেছে এক আত্মীয়কে এয়ারপোর্ট থেকে রিসিভ করতে হবে। অথচ অন্য এক কলিগকে সে বলেছিলো শুক্রবারে একটা বিয়ের দাওয়াত আছে।
অসঙ্গতি!
হাসিব কেন এরকম মিথ্যে বললো? তার নিকটজনেরা জানিয়েছে কোনো আত্মীয়কে এয়ারপোর্ট থেকে রিসিভ করার মতো ঘটনার কথা কারোর জানা নেই।
হুট করে এরকম কলু পেয়ে নড়েচড়ে বসলো সে। হাসিব মিথ্যে বলেছে। কেন বলেছে? কিছু একটা লুকানোর জন্য? অবশ্যই। সেটা কি? ছফা জানতো জবাবটা পাওয়া যাবে ঐ ট্যাক্সিক্যাব কোম্পানির কাছ থেকেই।
সঙ্গে সঙ্গে সে চলে যায় ট্যাক্সিক্যাব কোম্পানিতে। এক মুহূর্ত দেরি করার মতো মানসিক অবস্থায় ছিলো না। হাসিব ঠিক কোন দিন কতো তারিখে, আনুমানিক কয়টার দিকে ফোন করেছিলো সেটা জেনে নিয়েছিলো। ঐ ঘনিষ্ঠ কলিগের কাছ থেকে। ট্যাক্সিক্যাব কোম্পানি প্রথমে গাইগুই করলেও ছফার চাপাচাপিতে বাধ্য হয়েই পুরনো রেকর্ড ঘেঁটে দেখে, কিন্তু কয়েক মাসের পুরনো বলে ঐদিনের কোনো রেকর্ড সংরক্ষিত করা ছিলো না। ছফা এতে হতাশ না হয়ে অন্যভাবে চেষ্টা করে। ঐদিন গ্রিনল্যান্ড ক্যাব কোম্পানিতে কয়টি ক্যাব পথে ছিলো-সেগুলোর ড্রাইভার ছিলো কারা? কোম্পানি থেকে জানতে পারে, ঐদিন ক্যাবের সংখ্যা ছিলো একত্রিশটি। তার মধ্যে সাতাশজন ড্রাইভার বর্তমানে কর্মরত আছে, বাকিরা চাকরি ছেড়ে চলে গেছে, কোথায় গেছে সে সম্পর্কে তারা কিছু জানে না।
ছফা এরপর তিনদিন ধরে ঐ সাতাশজন ড্রাইভারকে ইন্টারভিউ করে যায়, হাসিবের একটি সাম্প্রতিক ছবি দেখিয়ে জানতে চায় এই লোককে তাদের মধ্যে কেউ প্যাসেঞ্জার হিসেবে পেয়েছিলো কিনা। তৃতীয় দিনে এক তরুণ ড্রাইভার হাসিবের ছবি দেখে জানায়, সম্ভবত লোকটাকে সে চিনতে পেরেছে। আগ্রহী হয়ে ওঠে ছফা। ড্রাইভার বলে, ঢাকার গুলশানের একটি অফিস থেকে প্যাসেঞ্জারকে তুলেছিলো। টেলিফোন করে ক্যাবটা বুকিং দেয়া হয়। ঠিক তখনই নুরে ছফা বুঝে গেছিলো এটাই সেই ড্রাইভার যে হাসিবকে তার গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছিলো।
