যাইহোক, মিসিং-কেসটা হাতে পেয়ে চ্যালেঞ্জ অনুভব করেছিলো ছফা। সে জানতো খুনের ঘটনার চেয়ে নিখোঁজ আর গুমের ঘটনা একটু বেশি কঠিন হয়। তবে এতোটা কঠিন নয় যে, সমাধানই করা যাবে না। দু দুটো সরকারী প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হবার পর তার হাতে কেসটা অর্পণ করার একটাই মানে-শেষ পর্যন্ত তার উপরেই আস্থা রাখা হয়েছে। যদিও ঈর্ষান্বিত কলিগদের কেউ কেউ মুখ ফুটে একটি আশংকার কথা বলতেও ভুলে যায় নি সমাধানের অযোগ্য একটি কেস দেয়া হয়েছে তার ক্যারিয়ারে ব্যর্থতার কলঙ্ক এঁটে দেয়ার জন্য। নিশ্চয়ই ঈর্ষাকাতর কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার কুমতলব এটি।
ছফা অবশ্য এরকম কিছু ভাবে নি। সে ভালো করেই জানতো কেন তাকে এই কেসটির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। ছেলেটা সাধারণ কোনো পরিবারের নয়, যারা পুলিশের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াবে আর কাকুতি মিনতি জানিয়ে নিজের সন্তানের হদিশ করবে। কেসটা দেবার আগে ডিবির কমিশনার তাকে ডেকে গোপন একটি কথা বলেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর অফিসের এক শীর্ষকর্মকর্তার ইচ্ছেয় এই কেসটা তাকে দেয়া হয়েছে। ভিক্টিম সেই কর্মকতার আপন বড়বোনের ছেলে। সঙ্গত কারণেই ভাগ্নের জন্য মামা বেশ উদ্বিগ্ন। ভাগ্নের পরিণতি কি হয়েছে, আর কে এর জন্যে দায়ি সেটা জানতে বদ্ধপরিকর ভদ্রলোক। লোকেমুখে ছফার সাফল্যের কথা শুনেই তিনি কেসটা ডিবিতে ট্রান্সফার করিয়েছেন আর ব্যক্তিগতভাবে কমিশনারকে অনুরোধ করেছেন, তদন্তের দায়িত্বটি যেনো অবশ্যই তাকে দেয়া হয়।
কেসটা যখন ছফার হাতে এলো সে ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারে নি এটা তাকে কতোটা ভোগাবে। ত্রিশ বছরের এক স্মার্ট আর কপোরেট এক্সিকিউটিভ নিখোঁজ। কথা নেই বার্তা নেই লোকটা দুনিয়া থেকে উধাও হয়ে গেছে। অফিসের কলিগের জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার পাঁচটার পর কাজশেষে যথারীতি অফিস থেকে বেরিয়ে যাবার পর তার আর কোনো খবর নেই। ছফা বেশ তিক্ততার সাথেই দেখতে পেলো, কেসটার সামান্য অগ্রগতিও করতে পারে নি আগের তদন্তকারীরা। ফলে একেবারে গোড়া থেকে শুরু করতে হয় তাকে।
পুলিশ আর সিআইডির একগাদা ফাইল পড়ার পর ফিল্ডে নেমে পড়ে সে। ছেলেটা অবিবাহিত, থাকতে একদম একা, অভিজাত এলাকার নির্জন এক ফ্ল্যাটে। আশেপাশের কারো সাথে কোনো রকম যোগাযোগ রাখতো না। বাবা-মা, ভাই-বোন সবাই থাকে কানাডায়। অভিজ্ঞতা থেকে ছফা জানতো, এরকম অসামাজিক, পরিবারহীন লোকজনের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নেয়াটা খুব কঠিন হয়।
ছেলেটার অফিসের কলিগদের সাথে দেখা করেও সুবিধা করতে পারলো সে। নিখোঁজ ছেলেটি মিশুক প্রকৃতির ছিলো না। অফিসের যে দু চারজনের সাথে তার বেশি খাতির তারা গুরুত্বপূর্ণ কিছুই জানাতে পারলো না। ওদের কাছ থেকে সামান্যতম ইঙ্গিতও বের করতে পারলো না সে। সবাই একই গল্প শোনালো নিখোঁজ হবার আগে হাসিব অন্যসব দিনের মতোই। অফিসের কাজে ডুবে ছিলো। তারপর কাজশেষে অফিস থেকে বেরিয়ে যায়। একজন কলিগ তাকে জিজ্ঞেস করেছিলো উইকেন্ডে সে কি করবে মাল্টিপ্লেক্সে হলিউডের একটা নতুন ছবি এসেছে, দেখবে নাকি? সে তাকে জানিয়েছিলো, ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ছবিটা দেখতে পারছে না কারণ শুক্রবার তার একটা দাওয়াত আছে।
কিসের দাওয়াত?
আত্মীয়-স্বজন আর বন্ধু-বান্ধবদের সাথে কথা বলেও তার কোনো হদিশ বের করতে পারে নি ছফা। ঐদিন ছেলেটার কোনো আত্মীয়, এমনকি পরিচিত কারোর কোনো অনুষ্ঠান ছিলো না। এটা খোঁজ করতে গিয়ে বরং সে জানতে পেরেছে, হাসিব একেবারেই অসামাজিক একটি ছেলে। নিকটাত্মীয়ের বিয়েতেও সচরাচর যায় না। অফিস থেকে বাসা, বড়জোর মাঝেমধ্যে সিনেমা দেখা। অফিসের বাইরে তার বন্ধুমহলটিও খুব ছোটো। ওদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগও রক্ষা করে না। বিদেশে থাকা বাবা-মা বিয়ের জন্য বেশ তাড়া দিলেও বিয়ে করতে রাজি হয় নি। ছফা ধরে নিয়েছিলো হাসিবের সাথে হয়তো কোনো মেয়ের সম্পর্ক আছে। কিন্তু এখানেও আশাহত হতে হয় তাকে।
নিখোঁজের পর পুলিশ এবং পরবর্তীকালে সিআইডি তদন্ত করেছে, অনেক লোকের সাক্ষাৎকার নিয়েছে। অনেককে সন্দেহ করে জিজ্ঞাসবাদও করেছে কিন্তু কোনো লাভ হয় নি। ছফা যখন তৃতীয়বারের মতো ঐসব লোকজনের সাথে কথা বলতে গেলো তখন স্বাভাবিক কারণেই সবাই বিরক্তি প্রকাশ করলো। একটা কেস নিয়ে পুলিশ বার বার তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে, এটা কেমন কথা? ফলে ছফাকে একটু বেকায়দায় পড়তে হয়।
কেসটা হাতে পাবার এক মাস পরেও সে কিছুই করতে পারে নি। ব্যাপারটা তার জন্য রীতিমতো হতাশার ছিলো। এরকম সাদামাটা কেস নিয়ে যে বিপাকে পড়বে সেটা একদমই ধারণা করতে পারে নি। সারাদিন অফিস করে রাতে বাড়িতে গিয়েও প্রচুর কাগজপত্র, তথ্য ঘাঁটাঘাটি করতে শুরু করে। প্রায় কয়েক শ পৃষ্ঠার কাগজে লোকজনের ইন্টারভিউয়ের কপি, হাসিবের বিভিন্ন সময়ের ছবি, ক্রেডিট কার্ডের মানি ট্রানজাকশান, ব্যাঙ্কের কাগজ, তার ঘর থেকে পাওয়া নানান ধরণের দলিল-দস্তাবেজ, রিসিট, এরকম কাগজের স্তূপে ডুবে গিয়েও সামান্যতম কলু বের করা যায় নি।
দেড় মাসের মাথায় তার বস, ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চের কমিশনার নিজের হতাশা প্রকাশ করে ছফাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, শুধু তিনি নিজে নন, ছেলেটার মামা, প্রধানমন্ত্রীর অফিসের ঐ ক্ষমতাবান কর্মকর্তাও তদন্তের এমন বেহাল দশা দেখে অসন্তুষ্ট। ছফা তার চাকরি জীবনে প্রথমবারে মতো বসের রুম থেকে মাথা নীচু করে বের হয়ে আসে। নিরস্ত্র সৈনিকের চেয়েও বেশি অসহায় কলু আর এভিডেন্স ছাড়া একজন ইনভেস্টিগেটর। অবশ্য তার বস দয়া করে, সম্ভবত ছফার অনন্য কীর্তি অক্ষুণ্ণ রাখার সুযোগ দেবার জন্য তাকে আরো এক মাসের সময় বাড়িয়ে দেয়।
