“যাহোক, মুশকান জুবেরির সিক্রেট রেসিপি নিয়ে আমার কোনো আগ্রহ নেই,” এসপিকে চুপ থাকতে দেখে বললো ছফা। “যদি না আমার ইনভেস্টিগেশনের সাথে সেটা কোনোভাবে কানেক্টেড থাকে।”
মনোয়ার হোসেন কয়েক মুহূর্ত ভেবে বললো, “আপনি যে কেসটা ইনভেস্টিগেট করছেন সেটা কি জানতে পারি?”
“অবশ্যই। আপনাকে তো এখন সবই জানাতে হবে, নইলে আপনার কাছ থেকে হেল্প নেবো কিভাবে।”
“আমার পক্ষে যতোদূর সম্ভব আমি সাহায্য করবে। এ নিয়ে কোনো চিন্তাই করবেন না।”
“থ্যাঙ্কস।”
“আসলে আমার বিশ্বাস করতেও কষ্ট হচ্ছে…”
নুরে ছফা সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকালো এসপির দিকে। “কোটার কথা বলছেন?”
“এই যে..মুশকান জুবেরির মতো একজন রুচিশীল, সংস্কৃতবান মহিলাও ক্রাইমের সাথে জড়িত থাকতে পারে?”
“সংস্কৃতবান মহিলা?” একটু ব্যঙ্গ করে বললো ছফা।
“হুম। উনাকে যারা চেনে তারা সবাই এটা জানে। উনি রবীন্দ্রনাথের বিরাট বড় ভক্ত।”।
“রবীন্দ্রনাথের বিরাট বড় ভক্ত এটা কিভাবে বুঝলেন?” মুচকি হেসে জানতে চাইলো ডিবির ইনভেস্টিগেটর।
“এটা তো খুবই সোজা। ভক্ত না হলে কি কেউ নিজের রেসটুরেন্টের নাম রবীন্দ্রনাথের নামে রাখবে?”
“আপনি ভুল করছেন। উনি রবীন্দ্রনাথের নামে রেস্টুরেন্টের নাম রাখেন নি…উনি রেখেছেন রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেন নি। এর পেছনে অন্য কারণ থাকতে পারে…কিংবা নিছক ব্যবসায়িক বুদ্ধি। অদ্ভুত নাম…সহজেই মানুষকে আকর্ষিত করে, বুঝলেন?”
এসপি কিছু বললো না। এর মানে এই না যে উনি বিরাট বড় রবীন্দ্রভূক্ত”
“উনি কিন্তু আমাকে অন্য কথা বলেছেন,” আস্তে করে বললো মনোয়ার হোসেন।
“কি বলেছে?”
“আমি একবার উনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম এরকম নাম কেন রেখেছেন…জবাবে আমাকে বলেছেন, সেই ছোটোবেলা থেকেই নাকি উনি। রবীন্দ্রনাথের ভক্ত। দিনের শুরু আর শেষ করেন রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনে। রবীন্দ্রনাথের সমস্ত রচনা তার একাধিকবার পড়া।” একটু থেমে আবার বললো এসপি, “তো এই রেস্টুরেন্টটা যখন দিলেন তখন নাম খুঁজে পাচ্ছিলেন না। একদিন হঠাৎ করেই উনার মনে হলো, এই যে তার জাদুকরী রান্না কতো শত লোক পরখ করে দেখবে, প্রশংসা করবে কিনতু তার প্রিয় ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথ কখনও এসব খেতে আসবেন না এখানে, এই আক্ষেপ থেকেই এমন অদ্ভুত আর সুন্দর নাম রেখেছেন।”
ভুরু কপালে তুলে বাঁকাহাসি দিলো ছফা। নাম রাখার আসল কারণটা সে জানে। মহিলা এসব ফালতু কথা বলে বেশ ভালো রহস্যই সৃষ্টি করতে পেরেছে। তার সামনে বসে থাকা পুলিশের উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা এসব গল্প বিশ্বাস করে বসে আছে।
“যাহোক, একটা কথা আমি বলে দিচ্ছি, এখন থেকে ঐ মহিলার সাথে কোনো রকম যোগাযোগ রাখবেন না। আমি যে তার ব্যাপারে ইনভেস্টিগেট করছি সেটা যেনো ঘুণাক্ষরেও জানতে না পারে।”
এসপি আলতো করে ঢোক গিলে মাথা নেড়ে সায় দিলো। “ঠিক আছে।”
“ব্যাপারটা খুব সিরিয়াস কিন্তু।
“বুঝতে পেরেছি।”
“গুড।”
একটু চুপ থেকে বলে উঠলো এসপি, “আশা করি যা হয়েছে তা ভুলে যাবেন…আই মিন, আমি ওসবের জন্য সরি।”
হাত তুলে ভদ্রলোককে থামিয়ে দিলো নুরে ছফা। “আপনি আইনের লোক, যতক্ষণ পর্যন্ত আইনের মধ্যে থেকে কাজ করবেন ততোক্ষণ পর্যন্ত সরি বলার দরকার পড়বে না। কিন্তু আইনের বাইরে গেলে সরি বলেও সব মিটমাট করা যাবে না। কথাটা মনে রাখবেন।”
এসপি দীর্ঘশ্বাস ফেললো কেবল। ভালো করেই বুঝতে পারছে আরেকটা বাজে বদলির শিকার হতে যাচ্ছে।
“কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আপনারা শুধু আইনের বাইরে গিয়েই কাজ করেন নি.. রীতিমতো একজন সন্দেহভাজন অপরাধীর পক্ষ নিয়ে পেটোয়া বাহিনীর মতো আচরণ করেছেন।”
“এসব জানলে তো আমরা
আবারো তাকে থামিয়ে দিলো। “এখন থেকে মনে রাখবেন, আমি যে কেসটা নিয়ে কাজ করছি সেটার প্রাইম সাসপেক্ট হলো ঐ মুশকান জুবেরি।”
ডেস্কের উপর রাখা পানির গ্লাসটা তুলে নিলো মনোয়ার হোসেন। ঢকঢক করে পান করলো সে। “কিন্তু কেসটা কি সেটা তো এখনও বললেন না?”
“বলছি…তার আগে এক কাপ কড়া লিকারের চায়ের ব্যবস্থা করুন।”
৬. নুরে ছফার আপাত অমীমাংসিত কেস
অধ্যায় ২৬
নুরে ছফার আপাত অমীমাংসিত কেস
ডিবির জাঁদরেল ইনভেস্টিগেটর নুরে ছফার দশ বছরের চাকরি জীবনে কোনো অমীমাংসিত কেস নেই। এ নিয়ে তার গর্ব ছিলো কিন্তু অনন্য এই রেকর্ডটি মারাত্মকভাবে হুমকির শিকার হয় গত বছরের একটি মিসিং কেস’ তদন্ত করতে গিয়ে। পুলিশ থেকে সিআইডি ঘুরে ডিবিতে দেয়া হয়েছিলো সেটা। বড়কর্তাদের আশা ছিলো ডিবির চৌকষ ইনভেস্টিগেটর নুরে ছফা নিশ্চয়ই এটার সুরাহা করে নিজের রেকর্ডটা অক্ষুণ্ণ রাখতে পারবে। সবাই যখন ব্যর্থ তখন একজনই কেবল সমাধা করতে পারে, আর সেটি নুরে ছফা ছাড়া আর কেউ নয়-এমন বদ্ধমূল ধারণা ডিপার্টমেন্টে এরইমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। তার সক্ষমতার কথা উপরমহলে এতোটাই প্রচারিত যে, অনেক সময় এক ধরণের ভীতিও কাজ করে তাকে নিয়ে। এটি এমন এক ভীতি যা ছফাকে অন্যভাবে গর্বিত করে।
দু-বছর আগে আলোচিত এক সাংবাদিক-দম্পতির হত্যার তদন্ত সাংবাদিক মহলের প্রবল চাপ থাকা সত্ত্বেও তার কাছে অর্পণ করা হয় নি শুধুমাত্র কেঁচো খুঁড়তে সাপ বের হয়ে যাবে বলে। কর্তারা চায় নি সাপটা বেরিয়ে পড়ুক। কেসটা একে-ওকে দিয়ে সময়ক্ষেপন করা হয়। ফলে দীর্ঘ দুই বছরেও ওটার কোনো সুরাহা হয় নি।
