সম্ভ্রম এবং বিস্ময় মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলো ইনফর্মারের চোখেমুখে।
“তুমি আর আমি কিনতু আগের মতোই কাজ করবো, ঠিক আছে?” মাথা নেড়ে সায় দিলো আতর আলী। তার মুখের জবান বন্ধ হয়ে গেছে।
প্রসন্নভাবে হাসলো ছফা। সুন্দরপুরে আসার আগেই এখানকার থানায় কাজ করে গেছে এমন একজনের কাছ থেকে আতর আলী বিবিসির খোঁজ পেয়েছিলো।
“তোমার মোবাইলফোনটা ঠিক আছে তো?”
“জি-জি, স্যার…তয় ডিচপ্লে-”
হাত তুলে থামিয়ে দিলো তাকে। “জানি। এখন মন দিয়ে আমার কথা শোনো।” আতরের কাঁধে হাত রাখলো নুরে ছফা। “ফোনটা চালু রেখো, যেকোনো সময় আমি তোমাকে ফোন দেবে। এখানে তুমি ছাড়া আর কারোর উপরে নির্ভর করতে পারছি না।”
ইনফর্মারের চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।
.
অধ্যায় ২৫
সুন্দরপুরের এসপি মনোয়ার হোসেন ভয়ার্ত চোখেমুখে নিজের ডেস্কে বসে আছে, তার সামনে বসে আছে নুরে ছফা। একটু আগে থানার ওসির সাথে কথা বলে ফোনটা যেই না রাখতে যাবে অমনি ভুতের মতো হাজির হয় এই লোক। কাকতালীয় ব্যাপার হলো, লোকটার পরিচয় ওসির কাছ থেকে পেতে পেতেই সশরীরে হাজির হয়েছে সে।
প্রথমে তাকে ঢুকতে দেখে অবাক হয়েছিলো এসপি। “আপনি?” হ্রট করে তার অফিসে একজন অপরিচিত লোককে ঢুকতে দেখে চমকে উঠে বলেছিলো সে।
“নুরে ছফা” কথাটা বলেই এসপির সামনে বসে পড়ে।
মনোয়ার হোসেন বিস্ময়ে চেয়ে থাকে তার দিকে।
“আশা করি চিনতে পেরেছেন।”
আলগোছে ঢোক গিলে চেয়ে থাকে সে। এইমাত্র সুন্দরপুর থানার ওসির কাছ থেকে নুরে ছফা নামের একজনের পরিচয় জানতে পেরেছে, আর সেটা মোটেও সুখকর কিছু নয়। ভদ্রলোক নিজের পরিচয় দেবার পর পরই তাকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক ক্ষমতাধর ব্যক্তির সাথে কথা বলিয়ে দিয়েছে। ক্ষমতাধর ব্যক্তির আদেশটি খুব পরিস্কার-নুরে ছফা নামের ডিবির যে অফিসার সুন্দরপুরে অবস্থান করছে, তাকে সব ধরণের সহযোগীতা করতে হবে, এক্ষেত্রে কোনোরকম গাফিলতি সহ্য করা হবে না।
“পরিচয় গোপন রাখার কোনো দরকারই ছিলো না..আপনি আরো আগে আমার সঙ্গে দেখা করলে ভালো হতো,” টেলিফোনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সেই লোকের সাথে কথা শেষ করার পর কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলে উঠলো মনোয়ার হোসেন।
“আমি যদি এখানে আসার পরপরই জানতে না পারতাম ঐ মুশকান জুবেরির সাথে আপনাদের এতো ভালো খাতির তাহলে অবশ্যই পরিচয় গোপন রাখতাম না।”
ছফার কথা শুনে এসপি কোনো জবাব দিলো না।
“প্রাইমারি ইনভেস্টিগেশনটা শেষ হবার পর অবশ্যই আপনাদের সাথে যোগাযোগ করতাম; সব খুলে বলতাম, কিন্তু তার আগেই “ রুমাল দিয়ে বামঠোঁটের কোণ মুছে নিলো সে।
সেদিকে তাকিয়ে কাচুমাচু খেলো এসপি। বেশ ফুলে আছে। বোঝাই যাচ্ছে কেটে গিয়ে রক্তও ঝরেছে। বাম চোখের নীচেও আঘাতের চিহ্ন সুস্পষ্ট, আর এসবই করা হয়েছে তার সরাসরি নির্দেশে।
“আমি খুবই সরি…” লজ্জিত ভঙ্গিতে বললো মনোয়ার হোসেন। “মানে, আমরা তো ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারি নি আপনি ডিবি থেকে এসেছেন। ভেবেছিলাম আবারো কেউ ম্যাডামের পেছনে লেগেছে।”
ছফার ভুরু কুচকে গেলো। “আবারো কেউ পেছনে লেগেছে মানে?”
“না, মানে ঐ যে…উনার রেস্টুরেন্টের তো অনেক রেপুটেশন…উনার খাবারগুলোও অসাধারণ…এইসব নিয়ে জেলাস হবার লোক তো কম নেই। অনেকেই আবার উনার সিক্রেট রেসিপিগুলো সম্পর্কে জানতে চায়…” একটু থেমে বললো এসপি, “গত বছর এরকম এক ফেউ উনার পেছনে লেগেছিলো।”
“সিক্রেট রেসিপি?” বাঁকাহাসি দিয়ে বললো ছফা।
“উনার অসাধারণ খাবারগুলোর রেসিপি কিন্তু কেউ জানে না। ওগুলো একদম সিক্রেট।”
“রেসিপি আবার সিক্রেট হয় নাকি, আজব কথা,” একটু বিরতি দিয়ে বললো সে, “আজকাল তো টিভি খুললেই রান্না-বান্নার অনুষ্ঠান দেখা যায়। ওখানে সবাই আগ বাড়িয়ে নিজেদের রেসিপি বলে। একদম ডিটেইল। এমনকি দেখিয়েও দেয়। এই যুগে রেসিপি সিক্রেট রাখার মানে কি? সিক্রেট রেসিপি বলে কিছু আছে বলেও তো মনে হয় না।”
“কি বলেন?” এসপিকে খুব আশাহত মনে হলো। “এখনও সারা দুনিয়া জানে না কোকাকোলার রেসিপি.. আই মিন, ওটার ফর্মুলাটা কি। কোকাকোলা কোম্পানি এই ফর্মুলাটি একশ’ বছরেরও বেশি সময় ধরে সিক্রেট রেখেছে।
ছফা কিছু বললো না। কথাটা সত্যি।
“পৃথিবীতে এরকম অনেক খাবারের রেসিপিই সিক্রেট।” একটু থেমে আবার বললো, “বিদেশের কথা বাদ দেন, আমাদের দেশেও কিন্তু এরকম সিক্রেট রেসিপি আছে।”
ছফা জিজ্ঞাসু চোখে তাকালো কেবল।
“ধরুণ ঢাকার হাজির বিরিয়ানি…সত্তর বছর ধরে চলছে…কিন্তু ওটার রান্না করার ধরণ আর একজ্যাক্ট রেসিপিটা এখনও অজানা।”
“ঐ মহিলা নিজে কিন্তু সব রান্না করে না…ওগুলো করে তার বেতনভুক্ত বাবুর্চিরা “ বললো ছফা। “চাইলেও সে রেসিপিগুলো সিক্রেট রাখতে পারবে না। নাকি অন্য কোনো উপায়ে এটা করা হয়?”
মনোয়ার হোসেন স্থিরচোখে চেয়ে রইলো। কী বলবে বুঝতে পারলো না। একদিক থেকে কথাটাতে যুক্তি আছে। কিন্তু এটাও সত্যি, মুশকান। জুবেরির অপার্থিব খাবারগুলো তার বাবুর্চিরা নকল করতে গিয়েও ব্যর্থ হয়েছে কয়েকবার। দুয়েকজন রবীন্দ্রনাথে কাজ করার পর নিজেরাই রেসিপিগুলো নকল করার চেষ্টা করেছিলো কিন্তু কাজ হয় নি। সেই স্বাদ আর সেই গন্ধ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে তারা। এর কারণটাও এসপি জানে। মুশকান জুবেরি একজন অসাধারণ মহিলা। তিনি এতোটা বোকা নন যে, রেসিপির সিক্রেটগুলো অরক্ষিত রাখবেন। সত্যি বলতে প্রতিটি রেসিপি তিনি বাবুর্চিদের কাছে উনমুক্ত করে দিয়েছেন, কেবল একটা জিনিস বাদে ঐ একটা জিনিসই তার সমস্ত রেসিপিগুলোকে বাঁচিয়ে রেখেছে। প্রতিটি রেসিপির জন্য ভদ্রমহিলা একটি বিশেষ ধরণের সিরাপ আবিষ্কার করেছেন। ঐ সিরাপের ফর্মুলা তিনি ছাড়া আর কেউ জানেন না। গতবছর তার এই সিক্রেটটা জানার জন্য যখন এক ফেউ উঠেপড়ে লাগলো তখন মিসেস জুবেরি নিজের মুখে এ-কথা স্বীকার করেছেন তার কাছে।
