ওসি মুচকি হেসে মাথা দোলালো। “এইজন্যেই মানুষ বলে চোরের মা’র বড় গলা।”
এবার মুচকি হাসলো ছফা। তার হাসিতে তাচ্ছিল্য করার ভঙ্গি আছে।
“আমি বলতাছি, তুই কইথেকা আইছোস? কি করোস, মাদারচোদ্দ?!” পেপারওয়েটটা ডানহাতের মুঠোয় ধরে ক্ষিপ্তভঙ্গিতে বললো ওসি।
ছফা স্থিরচোখে চেয়ে রইলো ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দিকে। “পেপারওয়েটটা হাত থেকে রেখে কথা বলেন, একদম শান্তকণ্ঠে বললো সে, “নইলে রাগের মাথায় কিছু করে ফেললে পরে কিন্তু খুব পস্তাতে হবে।”
বিস্ফারিত চোখে চেয়ে রইলো ওসি। নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে গেছে তার। কিছু বলতে যাবে তার আগেই ছফা আবার কথা বলে উঠলো।
“এবার কিন্তু সুন্দরপুরের চেয়েও খারাপ জায়গায় ট্রান্সফার হয়ে যাবেন। তিন-চার বছরে কোনো শহরের মুখ দেখবেন না।”
মনের অজান্তেই পেপারওয়েটটা নামিয়ে রাখলো ওসি। “তু-তুই কে?” তোতলালো সে।
“বললাম তো আমি নুরে ছফা। কোনো সাংবাদিক নই। ওটা আমি বলেছি অন্য কারণে।”
ভুরু কুচকে চেয়ে রইলো তোফাজ্জল হোসেন। হঠাৎ হাত তুলে আনোয়ারকে থামিয়ে দিলো, সে চেয়ার ছেড়ে উঠে আসতে যাচ্ছিলো। এসআই থমকে দাঁড়ালেও চেয়ারে আর বসলো না। আতর আলী অবিশ্বাসের সাথে চেয়ে আছে ছফার দিকে। তার বিশ্বাসই হচ্ছে না ওসির সাথে কোনো ভুয়া সাংবাদিক এভাবে কথা বলতে পারে।
“আরেকটা কথা,” ডানহাতের তর্জনি উঁচিয়ে বললো নুরে ছফা, “এই তুই-তোকারিটা বন্ধ করেন। আর আপনার ঐ এসআইকে বলেন এই ঘর থেকে চলে যেতে। আপনার সাথে আমার অনেক জরুরি কথা আছে।”
ওসি যারপরনাই বিস্মিত হয়ে চেয়ে রইলো তার সামনে বসা ভুয়া সাংবাদিকের দিকে। কী বলবে বুঝতে পারছে না।
“আপনার ভালোর জন্যই বলছি,” আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বললো ছফা।
এসআই আনোয়ার বিস্ফারিত চোখে চেয়ে আছে ওসির দিকে। আতর আলী একবার ছফা আরেকবার ওসিকে দেখছে। সে কিছুই বুঝতে পারছে না। তার কেবল মনে হচ্ছে এই লোক ভুয়া সাংবাদিক হতে পারে কিন্তু তার ভাব ভঙ্গি ভুয়া নয়।
“তোমরা দুইজনে…” আস্তে করে কথাটা বলেই ডোক গিললো ওসি। “…একটু বাইরে যাও।”
এসআই আর আতর অবিশ্বাসে তাকালো একজন আরেকজনের দিকে। তারপর চুপচাপ কোনো কথা না বলে ঘর থেকে বের হয়ে গেলো।
ওসি ঢোক গিলে তাকালো নুরে ছফার দিকে। “আ-আপনে…?” প্রশ্নটা শেষ করতে পারলো না।
“বলছি, তার আগে একগ্লাস পানি দিন,” বেশ আদেশের সুরে বললো। সে।
সুন্দরপুরের ওসি তার ডেস্কের উপরে রাখা মিনারেল ওয়াটারের বোতলটা বাড়িয়ে দিলো। “এ-এই যে, নিন৷”
তুই থেকে আপনিতে চলে আসায় মজাই পেলো নুরে ছফা। বোতলটা হাতে নিয়ে ঢক ঢক করে পান করে নিলো।
*
থানার বারান্দায় নিরুপ দাঁড়িয়ে আছে আতর আর এসআই আনোয়ার। তারা ভালো করেই জানে, কোনো ভুয়া সাংবাদিকের কথায় ওসি তাদের ঘর থেকে চলে যেতে বলে নি। নিশ্চয় এরমধ্যে কোনো ব্যাপার আছে।
“ঘটনা কি?” মুখ খুললো ইনফর্মার।
“বুঝতাছি না,” আস্তে করে বললো এসআই। পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরালো সে। বোঝাই যাচ্ছে খুব টেনশনে পড়ে গেছে। সিগারেটে কয়েকটা টান দিয়ে আতরের দিকে তাকালো। এখনও সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে চেয়ে আছে তার দিকে। “এই লোকটা আসলে কে?”
কাঁধ তুললো ইনফর্মার। “আমি কেমনে কমু? এতোদিন তো মনে করছি সাম্বাদিক…এখন দেহি ভুয়া।”
জোরে জোরে সিগারেটে টান দিলো এসআই। তার চোখেমুখে স্পষ্ট আতঙ্ক। নুরে ছফা নামের ভুয়া সাংবাদিককে বেশ কয়েকটা কিল-ঘুষি দিয়েছে, খুব খারাপ ব্যবহারও করেছে, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে লোকটা সাধারণ কেউ নয়। তার ক্ষমতার দৌড় কতোটুকু হতে পারে সেটাও ধারণা করতে পারছে না।
এসআই আনোয়ারের চিন্তিত ভাবভঙ্গি দেখে আতর চুপ মেরে গেলো। আর কোনো প্রশ্ন না করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো বারান্দার একটা পিলারে হেলান দিয়ে।
দশ-পনেরো মিনিট পর ওসির ঘর থেকে বেরিয়ে এলো ছফা। আতর আর এসআই আনোয়ার ঘুরে দাঁড়াতেই তাকে দেখতে পেলো। দু-জনের চেহারা হতবুদ্ধিকর। আনোয়ারের ঠোঁটে সিগারেটের শেষ অংশটুকু যেনো বেখেয়ালে আটকে আছে।
ছফা ধীরপায়ে এসে দাঁড়ালো দু-জনের সামনে। এসআই’র ঠোঁট থেকে সিগারেটটা নিজের হাতে নিয়ে মাটিতে ফেলে পা দিয়ে পিষে ফেললো। “থানা কম্পাউন্ডে ধুমপান নিষেধ?” কাছের দেয়ালে লাগানো সাইনটার দিকে ইঙ্গিত করলো সে। “অন্যদের চেয়ে আইনের লোকদের একটু বেশিই আইন মানতে হয়…বুঝেছো?”
ছফার এমন ব্যবহারে আনোয়ার রীতিমতো হতভম্ব হয়ে ফ্যালফ্যাল চোখে চেয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করতে পারলো না। আর একটু ধন্দে পড়ে গেলেও দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে তাকালো এসআই’র দিকে, সে এখনও ধাতস্থ হতে পারে নি।
এসআইর গালে আলতো করে চাপড় মেরে বললো ছফা, “তোমার হিসেব পরে করবো। এইসব ফালতু ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামানোর মতো সময় আমার হাতে নেই এখন।” এবার ইনফর্মারের দিকে ফিরলো সে, “আতর?”
“জি, স্যার?” আতর আলী জানে না সে কেন স্যার বললো, কিন্তু লোকটার ভাবভঙ্গিই এমন, স্যার না-বলে পারে নি।
“এদিকে আসো,” বলেই সে হাটা ধরলো। ভয়ে জড়োসরো হয়ে তার পেছন পেছন চলতে লাগলো ইনফর্মার।
থানার মেইনগেটের বাইরে এসে দাঁড়ালো ছফা। “শোনো আতর, আমি কোনো সাংবাদিক নই। আমি ডিবিতে আছি।”
