বাড়ি থেকে চোখ সরিয়ে নিলো। একটা দুঃখবোধে আক্রান্ত হলো সে। সব সময়ই এটা ঘটে তার সাথে। যখনই সে থিতু হয়ে আসে তখনই এটা ঘটে। একবার নয়, দু-বার নয়, বেশ কয়েকবার এরকম হয়েছে। সত্যি কথা হলো এই বাড়িটার মায়ায় পড়ে গেছে, আর সে জানে, মায়া বড় খারাপ জিনিস। এরসাথে অবিচ্ছেদ্যভাবেই জুড়ে থাকে সুতীব্র কষ্ট।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথার চুলে আঙুল চালিয়ে দেখে নিলো কতোটা শুকিয়েছে। লনে কিছুক্ষণ থাকার পর বুঝতে পারলো শীতের নরম রোদ আর নরম নেই, গায়ে এসে লাগছে। বাড়ির দিকে পা বাড়ালো সে। সদর দরজার কাছে আসতেই ভেতর-বাড়ি থেকে সাফিনা দৌড়ে ছুটে এলো তার কাছে। মেয়েটার হাতে মোবাইলফোন।
“আপনের ফোন।” হাফিয়ে উঠেছে সে। সেটাই স্বাভাবিক। তার এই ফোনটা রাখা ছিলো দোতলার লিভিংরুমে, সেখান থেকে দৌড়ে নেমে এসেছে নীচে।
ফোনটা হাতে নিয়ে মেয়েটাকে চলে যাবার ইশারা করলো।
“হ্যালো…”।
ওপাশ থেকে একটা পুরুষকণ্ঠ আনন্দে বিগলিত হয়ে বললো, “ম্যাডাম, কেমন আছেন?”
“জি, ভালো। আপনি?”
“পুলিশের চাকরিতে খুব বেশি ভালো থাকার উপায় নেই, সব সময়ই ব্যস্ত থাকতে হয়। আপনাকে আর কী বলবো, আপনি তো সবই জানেন।”
মুশকান কিছুই বললো না। এসব আদিখ্যেতা কথা-বার্তা তার ভালো লাগছে না। দরকারের সময় অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা অসহ্য লাগে।
“ও, যার জন্য ফোন দিয়েছি..ওই লোকটার খবর জানা গেছে। সে একজন সাংবাদিক।”
কপালে একটু ভাঁজ পড়লো তার। “কোথায় কাজ করে?”
“মহাকাল-এ”
একটু ভেবে জিজ্ঞেস করলো সে, “তার ইন্টেনশনটা কি জানতে পেরেছেন?”।
“বলছে, সে নাকি আপনার ঐ রবীন্দ্রনাথের উপরে একটা ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্ট করতে চায়।” এসপি জানে মুশকান রেস্টুরেন্ট শব্দটি পছন্দ করে না। “এখনও ওসির রুমে আছে। আরেকটু টাইট দিলে আরো কিছু কথা হয়তো বের হবে।”
“উনি যে সাংবাদিক এটা কি আপনারা কনফার্ম করতে পেরেছেন?”
ফোনের ওপাশে কয়েক মুহূর্তের নীরবতা নেমে এলো। “না, মানে, আমি এটা ওসিকে বলি নি।”
আস্তে করে দীর্ঘশ্বাস ফেললো আক্ষেপে। “আমার মনে হয় মহাকাল এ ফোন করে খুব সহজেই এটা চেক করা সম্ভব।”
“তা তো ঠিকই। আপনি এ নিয়ে একদম চিন্তা করবেন না। তোফাজ্জল খুবই ধুরন্ধর লোক সে নিজেই এটা চেক করে দেখবে। ক্রিমিনালের মুখের কথা সে পটাপট বিশ্বাস করবে না। তারপরও, আমি এক্ষুণি বলে দিচ্ছি তাকে।”
“থ্যাঙ্ক ইউ, ভেরি মাচ।”
“আরে, এই সামান্য কাজের জন্য আবার থ্যাঙ্কস-ট্যাঙ্কসের কী দরকার।”
মুচকি হাসলো মুশকান। “কেন, থ্যাঙ্কসে কি মন ভরছে না?”
হালকা হাসির শব্দ শোনা গেলো ওপাশ থেকে। “মন তো ভরছে কিন্তু পেট ভরছে না। আই মিন, আপনার হাতের স্পেশাল কিছু খাই না অনেকদিন হলো।”
অসভ্য! মনে মনে বলে উঠলো মুশকান। আরেকটা পেট ফুলিয়ে খাওয়া গর্দভ!
“কী যে বলেন, আপনাদের মত মানুষজনের জন্যই তো রবীন্দ্রনাথ দিলাম এখানে…যতোদূর মনে পড়ে গতপরশু আপনি গেছিলেনও।”
“আরে ম্যাডাম, ওখানে গিয়ে খাওয়া আর আপনার সামনে বসে আপনার হাতের রান্না করা খাওয়ার মধ্যে পার্থক্য আছে না?”
নিঃশব্দে বাঁকাহাসি দিলো মুশকান। “সমস্যা কি..সামনের শুক্রবারে চলে আসুন না? একটা নতুন কুইজিন নিয়ে কাজ করছি। অরিজিনটা স্প্যানিশ হলেও ওটা এখন মেক্সিকান কুইজিন হিসেবেই বেশি পরিচিত। একটু ঝাল, তবে আশা করি আপনার ভালো লাগবে।”
“উফ! আমার তো শুনেই জিভে পানি এসে গেছে। কেন যে আজকে বললেন…জাস্ট একদিন আগে বললেই হতো। এখন তিনদিন কি করে অপেক্ষা করি, বলেন তো?”
আকাশের দিকে তাকালো মুশকান। পুরুষ মানুষের ন্যাকামি তার কাছে অসহ্য লাগে। মনে হয় চোখের সামনে অসভ্য এক বামন লাফাচ্ছে। সার্কাস!
“কি আর করবেন, বলেই যখন ফেলেছি কষ্ট করে একটু অপেক্ষা করুন, আশা করি প্রতীক্ষার ফল সুস্বাদুই হবে।”
“হা-হা-হা,” অট্টহাসি শোনা গেলো ওপাশ থেকে। “এ-ব্যাপারে আমার মনে কোনো সন্দেহই নেই।
“ঠিক আছে তাহলে? শুক্রবার আমার বাসায় ডিনার করছেন।”
“অবশ্যই, অবশ্যই, ম্যাডাম।”
“থ্যাঙ্কস অ্যাগেইন।”।
ফোনটা কান থেকে নামিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। এইসব নিম্নরুচির মানুষজনদের সাথেও সম্পর্ক বজায় রাখতে হয় বলে নিজেকে একটুখানি করুণাই করলো সে।
.
অধ্যায় ২৪
ভুয়া সাংবাদিকের দিকে ঘৃণাভরে তাকিয়ে আছে আতর। এই লোকটার সাথে তিনদিন ধরে ওঠাবসা করেছে, সাহায্য করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে, অথচ ঘুণাক্ষরেও টের পায় নি সে ভুয়া! তার ইচ্ছে করছে লোকটার মুখে থুতু মারতে। বিশেষ করে ধরা খাওয়ার পরও লোকটার মধ্যে কোনো লজ্জা শরমের বালাই নেই দেখে রাগে সারা গা রি রি করে উঠলো। উল্টো এমন ভাব করছে যেনো ভুয়া সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে সে তেমন কোনো অন্যায়ই করে নি।
“এখন তাইলে বইলা ফালান, আপনি আসলে কে?” ওসি তোফাজ্জল হোসেন অনেকক্ষণ ধরে ডেস্কের উপরে রাখা পেপার ওয়েটটা নিয়ে নাড়াচাড়া করার পর জানতে চাইলো।
এসআই আনোয়ার মারমুখি হয়ে উঠে দাঁড়ালেও এখন বসে আছে। তাকে শান্ত থাকার নির্দেশ দিয়েছে ওসি। নিজের চেয়ারে বসে পড়লেও আনোয়ারের চোখমুখ দিয়ে ক্রোধ উপচে পড়ছে যেনো।
ছফা নির্বিকার ভঙ্গিতে বসে আছে চেয়ারে। “আমি মুরে ছফা…এটা কিন্তু একদম সত্যি। এরমধ্যে কোনো ভেজাল নেই।”
