“ঐ যে বললাম, ইলিগ্যাল ট্রেসপাসিং..রাইত-বিরাইতে ভদ্রলোকের বাড়িতে হানা দেয়া।”
“ভদ্রলোক নাকি ভদ্রমহিলা?”
ছফার এমন কথায় নিজের রাগ দমাতে বেগ পেলো ওসি। “আমার চায়া আপনেই তো ভালো কইরা জানেন। দেয়াল তো আমি টপকাই নাই।”
মুচকি হেসে বললো নুরে ছফা, “আমার মনে হয় আপনিও ভালো করে জানেন। এতোকিছু যখন জানেন…এটাও নিশ্চয় আপনার জানা আছে। কি বলেন?”
ভুরু কুচকে তাকালো ওসি। “ম্যাডাম মুশকান জুবেরির বাড়িতে কেন ঢুকছিলেন?”
“উনি কি কেস করেছেন, নাকি জিডি?”
“উনি কি করছেন সেইটা আপনের জানার দরকার নাই-”
“অবশ্যই আছে। আপনি আইনের লোক, আপনি ভালো করেই জানেন এটা জানার অধিকার আমার আছে।”
“ওই!” ঘরের এককোণ থেকে চিৎকার দিয়ে উঠলো এসআই আনোয়ার। “আমাগো আইন শিখাবি না! তোর পাছা দিয়া আইন ভইরা দিমু?”
ছফা পেছন ফিরে তাকালো এসআই’র দিকে, কিছু বলতে গিয়েও বললো না।
“এই যে সাংবাদিক সাহেব, আমার দিকে তাকান,” ওসি বললো।
ছফা মুচকি হেসে ওসির দিকে ফিরলো আবার।
“অন্য কোনো সময় হইলে আমি আমার এসআই’রে এমন রাফ বিহেইভ করতে দিতাম না, বিশেষ কইরী সাংবাদিকগো লগে তো না-ই। কিনতু আপনের ঘটনাটা একদমই আলাদা।”
“আলাদা কেন?”
যেনো খুব মজা পেয়েছে এমনভাবে হাসলো। “একটু আগে আমি মহাকাল-এ ফোন দিছিলাম…”
ছফার কপাল কুচকে গেলো সঙ্গে সঙ্গে। “ওইখানে নুরে ছফা নামের কোনো সাংবাদিক কাজ করে না।”
কথাটা শুনে এসআই আনোয়ার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো, আর আতর আলী ড্যাব ড্যাব চোখে চেয়ে রইলো ছফার দিকে। বিস্ময়ের চেয়েও বেশি কিছু আছে তার অভিব্যক্তিতে৷ যেনো তার সাথে বেঈমানি করা হয়েছে।
তথ্যটা দিয়ে সবাইকে অবাক করতে পেরেছে বলে সুন্দরপুর থানার ওসি ডেস্কের নীচে পা দোলাতে লাগলো। মুখে যথারীতি বাকাহাসি।
শালায় একটা ভুয়া সাংবাদিক!
.
অধ্যায় ২৩
ঝরা পাতা গো, আমি তোমারি দলে
অনেক হাসি অনেক অশরুজলে।
ফাগুন দিল বিদায়মন্ত্র আমার হিয়াতলে… গুন-গুন করতে করতে নীচে নেমে এলো মুশকান। একটু আগে গোসল করেছে। চুলগুলো এখনও শুকোয় নি। কখনও হেয়ার-ড্রাইয়ার ব্যবহার করে না সে, ফ্যানের নীচে দাঁড়িয়েও চুল শুকায় না। চুলগুলো খুলে রেখে দেয়, বড়জোর রোদে কিছুক্ষণ হাটাহাটি করে। আজ ঠিক তাই করছে। সচেতনভাবেই গতরাতের ঘটনাটা মন থেকে তাড়াতে চাইছে সে। তার নার্ভ এমন দুর্বল নয় যে, এই সামান্য ঘটনায় ভড়কে যাবে, ঘণ্টার পর ঘন্টা এ নিয়ে ভেবে অস্থির হবে। এরচেয়ে অনেক বড় দুর্বিপাকে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নিপতিত হয়েছে যা কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে সহ্য করে। টিকে থাকা অসম্ভব। কিন্তু সে পেরেছে। আর তারপর থেকে পুরো জীবনটাই বদলে গেছে চিরতরের জন্য।
এসব চিন্তা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য সামনের লনটার দিকে তাকালো। দুপুরের রোদে চকচক করছে এখন। নিয়মিত পানি দেবার পরও ঘাসগুলো জায়গায় জায়গায় হলদেটে হয়ে গেছে দেখে মন খারাপ হয়ে গেলো। কিছুই করার নেই। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। শীতকালে যতই যত্ন নেয়া হোক ঘাস শুকিয়ে যাবেই। এটা হলো পাতাঝরার ঋতু।
মেইনগেটের দিকে তাকালো। ওখানে এখন কেউ নেই। একটু আগে দারোয়ান ছেলেটা গোসল করার জন্য জোড়পুকুরে গেছে।
বাড়িটার চারপাশে তাকালো মুশকান। দেখে মনে হয় না ১৮৮৪ সালে এটা নির্মাণ করা হয়েছিলো। অবশ্য এরপর অনেকবার রেনোভেট করা হয়েছে। মেরামতের শেষ কাজটি সম্পন্ন করা হয় মাত্র পাঁচ বছর আগে। মূল নক্সাটাকে অক্ষত রেখে যতোটা সম্ভব আধুনিক উপকরণ যোগ করা হয়েছে কেবল। অ্যাটাচড বাথরুম আর কিচেন-ল্যাবটার কথা বাদ দিলে প্রায়। সবকিছুই আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। কিন্তু মুশকান যখন বাড়িটা নিজের করে পেলো তখন একেবারে আস্তাবলের মতোই ছিলো জায়গাটা। দীর্ঘদিন বিভিন্ন মানুষের দখলে থাকা, তারপর আবার পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে থাকার পর এর সব সৌন্দর্য, গৌরব প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছিলো। যে লনে সে এখন হাটছে সেটা বড়বড় ঘাসেপূর্ণ খোলা জায়গা ছাড়া আর কিছু ছিলো না। লনের মাঝখানে যে ফোয়ারাটা আছে সেটার ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পেয়েছিলো ঝোঁপ আর মাটির নীচে। বাড়িটা দীর্ঘদিন গুদামঘর হিসেবে ব্যবহার করেছিলো স্থানীয় এক টাউট-পলিটিশিয়ান। জোড়পুকুরটা বলতে গেলে কচুরিপানায় ভরে ভোবায় পরিণত হয়ে গেছিলো। পানি বলতে ছিলো। গাঢ়-কালচে আর ঘন ময়লা। বাড়ির তিনদিকে ঘিরে থাকা জলাশয়টির অবস্থা ছিলো আরো করুণ। কচুরিপানা আর আগাছায় ভরে গেছিলো পুরো জায়গাটি। বেঁচে যাওয়া পুরনো কিছু ছবি দেখে দেখে রেনোভেশনের কাজটি করা হয়েছে। তবে জোড়পুকুরের দক্ষিণে যে শিবমন্দিরটি আছে সেটার কোনো সংস্কার করা হয় নি। অবশ্য মন্দিরের কোনো কিছু ওখানে ছিলোই না। এখন যেটুকু ভগ্নাবশেষ আছে ঠিক সেরকমই ছিলো। মেরামতের অযোগ্য মন্দিরের পুরনো কোনো ছবিও তার কাছে নেই, থাকলেও যে ওটা রেনোভেট করতো তা নয়। মন্দির ব্যবহার করার মতো কেউ এখন এই বাড়িতে থাকে না। সত্যি বলতে, ওখানে গিয়ে পূজা করার মতো খুব বেশি সংখ্যক মানুষজন এই সুন্দরপুরে নেই।
রোদের প্রকোপে সাদা রঙের বাড়িটাকে আরো বেশি মোহনীয় লাগছে, তবে সে খেয়াল করলো পাঁচ বছরের পুরনো সাদা রঙ কিছুটা ঔজ্জ্বল্য হারিয়ে একটু হলদেটে হয়ে গেছে। সে চেয়েছিলো তাজমহলের মতো সাদা। রঙা রোদ আর পূর্ণিমায় সাদা মুক্তার মতো চক চক করবে।
