“আপনাকে দিতে হবে না, আমিই দেবো।”
“আরে, কী যে বলেন,” আবারো বিগলিত হাসি এসপির মুখে এসে ভর করলো। “আপনি কেন দেবেন। একটু অপেক্ষা করেন, সব জানা যাবে। ওসি লোকটা খুব কাজের। পেট থেকে কথা বের না-করে ছাড়বে না।” মুশকান কিছু বললো না দেখে এসপি আবারো বলতে শুরু করলো, “শুধু একটু টাইম দিতে হবে। আমার মনে হচ্ছে পনেরো-বিশ মিনিটের মধ্যেই সব জানা যাবে।”
“ঠিক আছে,” আস্তে করে বললো মুশকান। “থ্যাঙ্কস অ্যা লট।”
“আরে, এখন না…এখন না। কাজ হবার পর দিবেন। এখনও তো কিছুই জানাতে পারলাম না। আপনার জন্য কিছু করতে পারলে আমার ভালোই লাগে…”
মনোয়ার হোসেন হঠাৎ করে বুঝতে পারলো ফোনের ওপাশে কেউ নেই। শেষ কয়টা কথা খামোখাই বলেছে। নিজেকে তার খুব বোকা বোকা লাগলো। বিরসমুখে ফোনটা নামিয়ে রাখলো সে।
.
অধ্যায় ২২
সুন্দরপুর থানার ওসির রুমে বসে আছে ছফা। তার ভেতরে আগ্নেয়গিরির লাভা উদগীরণ হতে চাইছে যেনো, বহু কষ্টে দমিয়ে রেখেছে সেটা। ঘরে আরো আছে আতর আলী, সে কাচুমাচু হয়ে মাথা নীচু করে বসে আছে ওসির সামনে। তবে যে লোকটার উপস্থিতি সহ্য হচ্ছে না সে হলো এসআই আনোয়ার। যদিও ঘরের এককোণে চুপচাপ বসে আছে এখন।
বাম-ঠোঁটের কোণটা রুমাল দিয়ে আরেকবার মুছে নিলো ছফা। বাম চোখের নীচেও বেশ ব্যথা করছে। ভাগ্য ভালো, দু-জন কনস্টেবল দৌড়ে এসে জানোয়ারটাকে নিবৃত্ত করেছে, নইলে যে কী হতো!
“আমি জানি না আপনারা আমার সাথে কেন এমন করলেন…কেনই বা এখানে এভাবে ডেকে নিয়ে আসলেন…” বেশ শান্তকণ্ঠে বললো সে। “…আমাকে দ্রভাবে ডাকলেই আমি থানায় চলে আসতাম।”
ওসি স্থিরচোখে তার দিকে চেয়ে আছে, মুখে কিছু বলছে না।
“আমি তো কোনো চোর-বাটপার নই.কোনো অপরাধও করি নি..তারপরও..” ছফা আবারো ঠোঁট মুছলো।
“চোর-বাটপার না সেইটা কেমনে বুঝবো?” বেশ টেনে টেনে বললো ওসি।
ছফা অবিশ্বাসে চেয়ে রইলো লোকটার দিকে।
“রাইত-বিরাইতে প্রাইভেট পোপার্টির দেয়াল টপকাইয়া যে ঢুকে তারে তো চোর-বাটপার বলাই যায়, নাকি?”
বিস্ময়ে থ বনে গেলো ছফা, আতর আলীর দিকে ফিরে তাকালো। সে এখনও মাথা নীচু করে রেখেছে।
“ডাকাইত মনে করলেও তো সমস্যা দেখতাছি না,” হেসে বললো সুন্দরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।
ছফা নিশ্চিত, ইনফর্মার আতর সব বলে দিয়েছে। বাঁকাহসি হাসলো সে। এসির কথায় কোনো জবাব না দিয়ে আবারো ঠোঁট মুছতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। “আপনি যা খুশি তাই ভাবতে পারেন,” একদম স্বাভাবিক কণ্ঠে বললো ছফা।
“পলিশ যা খুশি তাই ভাবে না,” ওসিও চেয়ারে হেলান দিয়ে আয়েশ করে বললো, “যে যা পুলিশ তারে তা-ই ভাবে। চোরে চোর, ডাকাইতরে ডাকাইত!”
একটা হাই তুলে রুমালটা ডেস্কের উপর রাখলো সে। “এসব কথা বাদ দিয়ে এখন বলেন আমাকে কেন এভাবে তুলে আনা হয়েছে? কেউ কি আমার নামে ইলিগ্যাল ট্রেসপাসিংয়ের অভিযোগ করেছে? কোনো জিডি করা হয়েছে? করে থাকলে সেটা আমি দেখতে চাই।”
সাংবাদিকের এমন উদ্ধতভঙ্গি পছন্দ হলো না ওসির। “সময় হইলে সব দেখতে পাইবেন,” চিবিয়ে চিবিয়ে বললো কথাটা।
“তাহলে সময় এখনও হয় নি?” বাঁকাহাসি দিয়ে বললো ছফা।
ওসির চোখমুখ দেখে মনে হচ্ছে নিজেকে বহু কষ্টে নিয়ন্ত্রণ করছে। ঘরের এককোণে বসে থাকা এসআই আনোয়ার রাগে ফুঁসছে। জীবনে এরকম অনেক বেয়াদপ সাংবাদিক দেখেছে সে। এরা সব সময় চ্যাটাং চ্যাটাং করে কথা বলে, এমনকি প্যাদানি খাওয়ার পরও।
“মনে হইতাছে এখনও শিক্ষা হয় নাই,” ওসি রাগের মধ্যেও মুখে হাসি এঁটে বললো।
বাঁকাহাসি হেসে মাথা দোলালো ছফা। “শোনেন মি. তোফাজ্জল,” ওসির ইউনিফর্মে এই নামটাই লেখা আছে, “আপনারা কি ধরণের শিক্ষা দেবেন সেটা নিয়ে আমি মাথা ঘামাচ্ছি না। আমি শুধু জানতে চাই…” চুপ মেরে গেলো অল্পক্ষণের জন্য, “আমাকে এখানে কেন নিয়ে এসেছেন।” শেষ কথাটা বললো বেশ সিরিয়াস ভঙ্গিতে।
সুন্দরপুরের ওসি তোফাজ্জল হোসেন স্থিরচোখে চেয়ে রইলো। পুলিশে কাজ করে বলে হরহামেশাই তাকে সাংবাদিকদের সামলাতে হয়, তাদের মধ্যে অনেকেই এই ছফা নামের লোকটার মতো আচরণ করে। নিজেদেরকে এরা ধরাছোঁয়ার বাইরে মনে করে সব সময়।
“আপনার নাম ছফা, তাই না?” যেনো কাজের কথায় ফিরে যাচ্ছে এমনভাবে প্রশ্নটা করলো ওসি।
“নুরে ছফা।”
বাঁকাহাসি হাসলো ভদ্রলোক। “মি. নুরে ছফা,” দু-হাত ডেস্কের উপর রাখলো সে, “এখন বলেন, আপনি কি করেন?
আতরের দিকে চকিতে তাকালো সে। “কেন, ও এ-ব্যাপারে আপনাদের কিছু বলে নি?”
“ও কি বলছে না বলছে ভুইলা, যান এখন আমি জিজ্ঞাসা করবো আপনে জবাব দিবেন।” কাটাকাটাভাবে বললো তোফাজ্জল হোসেন।
“সাংবাদিকতা।”।
“কোন পেপারের?”
“মহাকাল।”
“এইখানে কি জন্যে আসছেন?”
“বলা যাবে না। একটা অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে এসেছি…এর বেশি কিছু বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আপনি নিশ্চয় কোনো সাংবাদিককে বাধ্য করতে পারেন না তার অ্যাসাইনমেন্টটা কি সেটা জানার জন্য?”
“অবশ্যই পারি..যদি সে তার অ্যাসাইনমেন্টের নামে বে-আইনী কাজকর্ম কইরা বেড়ায়।”
“হুম, তা অবশ্য ঠিক বলেছেন,” সহমত পোষন করলো ছফা। দেখতে পেলো ওসি একটু অবাকই হয়েছে। সেক্ষেত্রে আমি জানতে চাইবো, “আমার বিরুদ্ধে অভিযোগটা কি।”
