“আজকে আতর আলীকে দেখেছেন?” সিগারেটে টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বললো ছফা।
রহমান মিয়া চায়ের কাপে গুড় মেশানো থামিয়ে বললো, “না। আইজ তো দেখি নাই।”
“ওকে কোথায় পাওয়া যেতে পারে?”
“কুথায় আছে কে জানে…ওরে ফুন দেন…ওর নম্বর কি অপনের কাছে নাই?”
“ওর ফোন বন্ধ পাচ্ছি। সকাল থেকে কয়েক বার দিয়েছি…একই অবস্থা।”
চায়ের কাপটা কাস্টমারের দিকে বাড়িয়ে দিলো রহমান। “ফুনটা মনে অয় নষ্ট হইয়া গেছে।”
ছফারও তাই ধারণা। একটা সস্তা চায়নিজ ফোন ব্যবহার করে আতর। এমনিতেই ওটার অবস্থা কাহিল, ডিসপ্লে কাজ করে না, শুধু ইনকামিং কল রিসিভ করতে পারে। এখন হয়তো পুরোপুরিই অচল হয়ে গেছে।
চায়ে চুমুক দিয়ে রবীন্দ্রনাথের দিকে তাকালো। তিন-চারটা প্রাইভেটকার এসে থেমেছে। ভেতরের কাস্টমার বেশ ভালো। বলতে গেলে হাউজফুল। একটু আগে সেও ওখানে গিয়ে নাস্তা করে এসেছে। মুশকান জুবেরির রহস্য উন্মোচন করার জন্য এলেও তার সুস্বাদু খাবারে মজে গেছে সে। স্বীকার করতেই হলো, রন্ধনশিল্পী হিসেবে মহিলা অসাধারণ।
“আতরকে কোথায় গেলে পাবো, জানেন?”।
ছফার দিকে চেয়ে রইলো দোকানি। “হের তো কুনো ঠিক-ঠিকানা নাই…কই খুঁজবেন?” তারপর গুড়ের পিণ্ডের উপর থেকে মাছি তাড়িয়ে বললো, “থানায় গিয়া দেখবার পারেন। ওইখানেই তো বেশি যায়।”
সুন্দরপুর থানায় গিয়ে আতরের খোঁজ করার কোনো ইচ্ছে তার নেই, সে বরং দুপুর পর্যন্ত তার জন্য অপেক্ষা করবে। এই সময়ের মধ্যে নিশ্চয় ইনফর্মার চলে আসবে তার সাথে দেখা করার জন্য।
চায়ের বিল দিয়ে উঠে দাঁড়ালো ছফা। ঠিক করলো হোটেলেই আবার ফিরে যাবে। গোসল করে একটু বিশ্রাম নেয়া দরকার। আর যদি তাকে খুঁজতে আসে তাহলে তাকে ফোন করেই আসবে। দুপুরের খাবারটা। একসাথে খাবে দু-জনে তবে সেটা রবীন্দ্রনাথে নয়। টাউনে আরেকটা রেস্টুরেন্ট আছে, খাবারের মান অতো ভালো নয়, তবে রোজ রোজ সুস্বাদু খাবার খাওয়াটাও ঠিক হচ্ছে না।
রিক্সা-ভ্যানের জন্য সড়কের একপাশে দাঁড়িয়ে রইলো সে। দিনের এ সময়টাতে বেশ যানবাহন চলাচল করে এদিক দিয়ে, রিক্সাও চলে প্রচুর। একটা খালি রিক্সা দেখতে পেয়ে হাত নেড়ে থামালো। টাউনের কথা বলতেই রিক্সাওয়ালা রাজি হয়ে গেলো সঙ্গে সঙ্গে। ছফা লক্ষ্য করেছে, এখানকার রিক্সাওয়ালারা যেকোনো গন্তব্যে যেতেই রাজি থাকে। তাদের মুখে না শব্দটি এখন পর্যন্ত শোনে নি।
রিক্সায় উঠে বসতেই দেখতে পেলো পুলিশের একটা জিপ এগিয়ে আসছে। জিপটা এসে থামলো ঠিক তার রিক্সার সামনে। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো রিক্সাওয়ালা। একে তো পুলিশ, তার উপরে আগ্রাসী আচরণ। বেচারার চোখমুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেলো।
ছফা রিক্সার সিটে বসে স্থিরচোখে চেয়ে রইলো জিপটার দিকে। গাড়ি থেকে নেমে এলো এক পুলিশ, তার ইউনিফর্মের নেমপ্লেটে লেখা আনোয়ার হোসেন। র্যাঙ্ক দেখে বুঝতে পারলো এই লোক একজন এসআই।
“ওই, রিক্সা থেইকা নাম,” ছফার দিকে আঙুল তুলে বলে উঠলো আনোয়ার নামের এসআই।
তুই-তোকারি সম্বোধন করেছে বলে সে একটু অবাকই হলো। “আপনি আমাকে বলছেন?” অবিশ্বাসে বলে উঠলো ছফা।
“হ তরেই কইতাছি। রিক্সা থেইকা নাম।”
ছফা আর কোনো কথা না বলে রিক্সা নেমে গেলো। এসআই আনোয়ার তুড়ি বাজিয়ে রিক্সাওয়ালাকে কেটে পড়ার ইশারা করতেই বেচারা সটকে পড়লো।
“ঘটনা কি আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না?” ছফার চোখেমুখে বিস্ময়।
“তর নাম নুরে ছফা, না?”
মাথা নেড়ে সায় দিলো সে। “হ্যাঁ, কিন্তু-”
কথা শেষ করার আগেই এসআই তার কলারটা ধরে টান মারলো।
“আরে, আশ্চর্য! আপনি আমার সাথে এমন করছেন কেন? ঘটনা কি?”
“মাদারচোদ্দ, থানায় নিয়া গিয়া বুঝাইতাছি ঘটনা কি।”
ছফা আর মেজাজ ঠিক রাখতে পারলো না, এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করলো। এসআই’র হাত থেকে ছুটতে পেরেই তার বুকে ধাক্কা মেরে বসলো সে। আচমকা এমন প্রতিরোধের মুখে পড়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো আনোয়ার। কয়েক মুহূর্ত বিস্ফারিত চোখে চেয়ে থাকার পর ঝাঁপিয়ে পড়লো ছফার উপরে।
*
সুন্দরপুরের এসপি মনোয়ার হোসেন ঢাকার এক কলিগের সাথে টেলিফোনে কথা বলছিলো, ঠিক তখনই পর পর দু-বার আরেকটা কল ওয়েটিং-এ ঢুকে পড়ে। মৃদু শব্দের বিপ হলেও সে খেয়াল করতে পারে নি। কলটা শেষ করে যখন ডিসপ্লে দেখলো তখনই তড়িঘড়ি করে কলব্যাক করলো।
“সরি ম্যাডাম..জরুরি একটা বিষয়ে ডিআইজি সাহেবের সাথে কথা বলছিলাম,” বিনয়ের সাথে বললো মনোয়ার হোসেন। তবে অপ্রয়োজনে এই মিথ্যেটা কেন বললো সে জানে, আর এই জানাটাই তাকে ভেতরে ভেতরে ছোটো করে দিলো নিজের কাছে।
“না, না…সরির কী আছে…” ওপাশ থেকে সুস্পষ্ট বাচনভঙ্গি আর মাদকতাপূর্ণ কণ্ঠে বলে উঠলো মুশকান জুবেরি। “আপনি ব্যস্ত মানুষ…এটা তো খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।”
বিগলিত হাসি দিলো এসপি কিন্তু যে-ই না বুঝতে পারলো তার এই নিঃশব্দ হাসি ফোনের ওপাশে যে আছে সে দেখতে পাচ্ছে না তখন থামিয়ে দিলো।
“কিছু জানতে পেরেছেন লোকটা কে…কি চায়?”
“না, মানে…” ঢোক গিলে নিলো মনোয়ার হোসেন। “..ওসিকে ফোন দেই নি…মাত্র ধরে এনেছে…একটু টাইট দিতে হবে না…না দিলে তো মুখ খুলবে না, ম্যাডাম। আপনি কোনো চিন্তা করবেন না…একটু পর আপনাকে ফোন দিয়ে জানাবো কি জানা গেলো।”
