“কি হইলো?”
ওসির তাড়া খেয়ে মুখ তুলে তাকালো সে। “খালি মাস্টরের কাছে নিয়া গেছিলাম…আর কুনোখানে যাই নাই, স্যার।”
“মাস্টার মানে?”
“মনে হয় রমাকান্ত মাস্টারের কথা বলতাছে, স্যার,” এই প্রথম এসআই আনোয়ার মুখ খুললো।
ওসি সপ্রশ্নদৃষ্টিতে আতরের দিকে তাকালে মাথা নেড়ে সায় দিলো সে। “উনার কাছে কেন গেছিলা?”
“জমিদার বাড়ির হিস্টোরি জানবার লাইগা…ওই সাম্বাদিক কইলো জমিদার বাড়ির কথা জানবার চায়…আমি তো এইসব কাহিনী জানি না… তাই মাস্টরের কাছে লইয়া গেলাম।”
“ঐ বাড়ির হিস্টোরি জাইনা সাংবাদিক কি করবো, অ্যাঁ?”
“স্যার,” আনোয়ার আবারো মুখ খুললো, “মনে হইতাছে হোটেল আর ম্যাডামরে নিয়া সাংবাদিক বিরাট কোনো রিপোর্ট করবো…ডিটেইল কিছু।”
“হূম,” মাথা নেড়ে সায় দিলো সুন্দরপুরের ওসি।
“ঐ সাংবাদিক ইনফর্মেশনের জন্য আতরে ইউজ করছে,” এসআই আরো বললো। “আমার মনে হয় না ঐ লোকের আসল মতলব কি তা আতর জানে।”
সমর্থন পেয়ে ইনফর্মার যেনো হালে পানি পেলো। “হ, স্যার…আমি বেশি কিছু জানি না…খালি জানি পেপারে লিখবো।”
“বুঝলাম…তাইলে তুমি মিথ্যা বলো কেন? জমির কাহিনী বলার দরকার কি ছিলো? এইটা কি ওই লোক তোমারে শিখায়ে দিছে?”
কথাটা যেনো তার মুখে তুলে দিলো ওসি। “জি, স্যার। হে আমারে কইছে, হে যে সাম্বাদিক এইটা যে কাউরে না কই
“জমি দেখতে আসছে…এইটাও কি ওই সাংবাদিক শিখায়ে দিছে?” প্রশ্নটা করলো এসআই আনোয়ার। তার আচরণ শত্রুভাবাপন্ন নয়।
“হ। পরথমে জমির কথা বইলা আলাপ শুরু করছে তার বাদে কয়, সে নাকি সাম্বাদিক…ঐ বে…” একটু থেমে গেলো আতর। আরেকটুর জন্যে মুখ দিয়ে ‘বেটি’ শব্দটা বের হয়ে গেছিলো। “…হোটেলটার মালিকের খবর জানবার চায়।”
“আচ্ছা,” মুচকি হাসলো ওসি। “তাইলে তো ওই সাংবাদিক একেবারে ঠিক জায়গাতেই টোকা মারছে। আমাদের আতরের মতো বিবিসি থাকতে অন্য কারো কাছে কেন যাইবো সে, অ্যাঁ?”
টিটকারিটা গায়ে মাখলো না ইনফর্মার। তাকে যে লোকে আড়ালে আবডালে বিসিসি বলে ডাকে এ নিয়ে সে বরং গর্বই করে।
“কাল রাইতে তুমি কি ওই সাংবাদিকের সাথে ছিলা?” আতর ওসির দিকে স্থির চোখে তাকালো, বোঝার চেষ্টা করলো ঘটনা কি।
“আর কোনো ধানাই-পানাই কইরো না। যা ঘটছে সত্যি সত্যি বইলা দাও। আমরা জানি কাইল রাইতে ঐ সাংবাদিক কই গেছিলো।”
“আমি হের লগে আছিলাম না, স্যার। বিশ্বাস করেন। হে একলাই গেছিলো।”
“কই গেছিলো?”
ঢোক গিললো ইনফর্মার। “ইয়ে…মাইনে…”।
“তুমি কইলাম সব জানো, আতর।”
“স্যার, আমি জানলে তো হেরে এমন আকাম করতেই দিতাম না, পুরোপুরি মিথ্যে বলার চেয়ে আধা-সত্যি বলাই ভালো হবে বলে কথাটা বললো সে।
“তাই নাকি?” ওসির চোখেমুখে প্রচ্ছন্ন সন্দেহ।
“রহমান মিয়ারে জিগায়া দেইহেন…হের কাছ থিকাই আমি জানবার পারছি সাম্বাদিক জমিদার বাড়ির দিকে গেছে।” একটা মোক্ষম অ্যালিবাই ব্যবহার করলো।
“কোন রহমান মিয়ার কথা বলতাছো?”
“স্যার, ঐ রেস্টুরেন্টের উল্টা দিকে যে চায়ের দোকানটা আছে, সেই দোকানির কথা বলতাছে,” এসআই আনোয়ার আগ বাড়িয়ে বলে দিলো।
ওসি মাথা নেড়ে সায় দিয়ে আবার জিজ্ঞেস করলো আতরকে, “রহমান মিয়ার কাছ থেইকা শুইনা তুমি কি করলা?”
ইনফর্মার একটু ঢোক গিললো। মিথ্যে বলা তার জন্য সহজ কিন্তু সত্যি মিথ্যা মিলিয়ে বলাটা একটু কঠিনই মনে হচ্ছে। কতটুকু সত্যি বলবে আর কতোটুকু মিথ্যে সেটার হিসেব করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে সে।
“রহমান মিয়ার কাছ থিকা শুনার পরই দেখি সাম্বাদিক সাইকেল চালায় আইতাছে,” অবশেষে ভালোভাবেই সত্যি-মিথ্যাটা বলতে পারলো আতর। “আমি ওরে থামাইয়া জিগাইলাম কি হইছে…সে বললো পরে কমু নে…আগে সাইকেলে ওঠেন। আমি তো বেকুব হয়া গেলাম। ঘটনা কি কিছুই বুঝবার পারলাম না।”
“তারপর তুমি কি করলা?”
“কি আর করুম..মাথামুথা কিছুই কাম করতাছিলো না…উইঠা বসলাম হের সাইকেলে।”
“হুম, এসআই আনোয়ারের দিকে তাকালো ওসি। তার মুখ দেখে মনে হচ্ছে আতরের কথায় সন্তুষ্ট। তাদের কাছে যে তথ্য আছে তা এই ইনফর্মারের কথার সাথে একেবারে মিলে গেছে। “ওই সাংবাদিক তো সুরুত আলীর হোটেলে উঠছে, না?”
“জি, স্যার।”
“সে আর কয়দিন থাকবো?”
মাথা চুলকে নিলো ইনফর্মার। “সেইটা তো আমারে কয় নাই।”
ওসি গালে হাত বুলালো। “তোমার কি মনে হইতাছে, আনোয়ার?”
“এখন তো ঘটনা একদম পরিস্কার, স্যার,” এসআই জবাব দিলো। “হুম,” মাথা নেড়ে সায় দিলো ওসি।
“ওই সাম্বাদিক যদি আমারে ডাকে তাইলে আমি কি করুম, দেহা করুম নাকি করুম না?” বেশ অনুগত সুরে জানতে চাইলো সে।
আতরের দিকে স্থিরচোখে চেয়ে রইলো ওসি। “এইটা নিয়া তোমারে আর চিন্তা করতে হইবো না। সে আর তোমারে ডাকবে না।”
কথাটা শুনে ফ্যাল ফ্যাল চোখে চেয়ে রইলো আতর আলী।
৫. গুড়ের চা
অধ্যায় ২১
রহমান মিয়া গুড়ের চা বানাতে লাগলেও তার দৃষ্টি বার বার চলে যাচ্ছে কাস্টমারের দিকে। শহর থেকে আসা এই কাস্টমারকে গতকাল রাতে সাইকেল চালিয়ে জোড়পুকুরে যেতে দেখেছে। লোকটার কাজকর্ম যথেষ্ট সন্দেহজনক। দু-তিনদিন ধরে এই এলাকায় ঘোরাফেরা করছে ঐ ভাদাইমা ইনফর্মার আতরের সাথে। কি উদ্দেশ্যে এই সুন্দরপুরে এসেছে সেটা মোটেও স্পষ্ট নয়। মুখে যদিও বলেছে ঐ হোটেলের খাবার তার ভালো লাগে নি, কিন্তু সকালের নাস্তা থেকে শুরু করে রাতের খাওয়া-দাওয়া সবই সে করে ওখানে। এই তো, তার দোকানে এসে চায়ের অর্ডার দেবার আগে ওই হোটেল থেকেই বের হতে দেখেছে।
