“কিন্তু আমাগো ঘামাইতে হয়,” গম্ভীর কণ্ঠে বললো ওসি। “জি, স্যার?”
“কে কোন উদ্দেশ্যে আসলো, কইখেকা আসলো, কার কাছে আসলো..সব জানতে হয় আমাগো। সব বুঝতে হয়। নইলে আইন-শৃঙ্খলা মেইনটেইন করা খুব টাফ হয়া যায়।”
“তা তো ঠিকই, স্যার। পুলিশ না জানলে কি চলে,” স্বাভাবিক কণ্ঠেই বললো ইনফর্মার।
“কিন্তু এই লোকটা কে, সেই ব্যাপারে আমরা কিছুই জানি না। কি জন্যে সে সুন্দরপুরে আসছে তাও অজানা।”
আস্তে করে ঢোক গিলে পাশে বসা আনোয়ারের দিকে তাকালো আতর। এসআইর চোখেমুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। মরা ইলিশমাছের মতো নির্বিকার তাকিয়ে আছে তার দিকে।
“কইলাম না, জমি কিনতে আইছে।”
আতরের কথায় মাথা দোলালো ওসি। “আগেই বলছি, তোমারে এখনও আমরা নিজের লোক ভাবি। যতো ঝগড়াঝাটিই হোক না কেন, তুমি আমাদেরই লোক। আজ বাদে কাল তুমি আমাদের সাথেই আবার কাজ করবা।”
আতরের চোখে খুশির ঝিলিক দেখা গেলো। ওসির মুখ থেকে এ-কথা শোনার জন্য সে মুখিয়ে ছিলো এতোদিন। বিগলিত হয়ে সে বললো, “স্যার, আমিও কইলাম নিজেরে আপনাগো লোকই ভাবি।”
আবারো মাথা দোলালো ওসি। “মনে হয় না। তা-ই যদি হইতো তুমি এইসব জমি-জিরাতের গল্প আমদানি করতা না।”
কাচুমাচু খেলো ইনফর্মার। “হাছাই কইতাছি, ওই লোক জমি কিনবার আইছে…আপনে তো জানেনই আমি জমির দালালি করি মাঝেমইদ্যে। ওই লোরে এইখানে-ওইখানে জমি দেখাইতাছি কিন্তু হের পছন্দ হইতাছে না।”
ওসি বাঁকাহাসি হাসলো। “রাইত-বিরাইতে জমি দেখাইলে পছন্দ হইবো। কেমনে, অ্যাঁ? জমি দেখাইতে হয় দিনের বেলায়।”
আতর চোখের পলক ফেলতে ভুলে গেলো। তার মিথ্যেগুলো যখন ধরা পড়ে যায় তখন সাময়িক অসহায় বোধ করে। এ মুহূর্তে যারপরনাই অসহায়। বোধ করতে শুরু করলো সে।
“এরপর থেইকা দিনের বেলায় জমি দেখাইবা, তাইলে পছন্দ হইবো…আর ঐ লোকেরে বলবা, জমি দেখতে চাইলে দেয়াল টপকাইয়া সামনের গেট দিয়া যেন কারোর বাড়িতে ঢুকে। খাস জমি কিনতে চাইলে চোর-বাটপারের মতো ফুচকি-ফাচকি মারার দরকার নাই। ভেজাল জমি কিনতে চাইলে অবশ্য অন্য কথা।”
বজ্রাহত হলো ইনফর্মার। তার মুখে কোনো রা নেই। আজকের দেখা দুঃস্বপ্নের মতোই নির্বাক হয়ে গেলো, বুঝতে পারলো আর কোনো মিথ্যে না বলাই তার জন্য মঙ্গলজনক হবে। আস্তে করে মাথাটা নীচু করে ফেললো সে।
তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠলো ওসির মুখে। আনোয়ারের দিকে তাকালে সে কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেললো আস্তে করে।
মুখ তুলে তাকালো ইনফর্মার। “স্যার, আমারে মাফ কইরা দেন, দু-হাত জোর করে চোখমুখ যতোটা সম্ভব করুণ করার চেষ্টা করলো। “আমার ভুল হইয়া গেছে।”
“হুম।” আবারো বাঁকাহাসি দেখা গেলো ওসির মুখে। এসআই আনোয়ারের দিকে তাকিয়ে বললো, “ইনফর্মেশনগুলা লেইখা নাও।”
ডেস্কের উপরে রাখা প্যাড আর কলমের দিকে হাত বাড়ালো আনোয়ার।
“এইবার বলো, ঐ লোকের নাম কি?”
ঢোক গিললো আতর। “নুরে…নুরে ছফা।”
“কি?” ওসি নামটা ধরতে পারলো না। “কি সফা?”
“নুরে ছফা।” আবারও বললো ইনফর্মার।
“নুরে…ছফা…?” আনোয়ারের দিকে তাকালে সে ঠোঁট উল্টালো। “নাম তো একখান..মাশাল্লা! নুরে ছফা! নুর মানে আলো..ছফা হইলো আসলে সফা…নোয়াখালি আর চট্টগ্রামের পাল্লায় পইড়া সফার দফারফা হইয়া গেছে। মনে হইতাছে।”
আনোয়ার মুচকি হেসে নামটা টুকে নিলো নোটপ্যাডে।
“তাইলে কী দাঁড়াইলো?” কারোর জবাবের অপেক্ষা না করেই ওসি বললো, “পরিস্কার আলো? ফকফকা আলো?” এরপরই হা-হা-হা করে হেসে উঠলো সে। “আন্দাজে কইলাম আর কি, আমি আবার আরবিতে খুব কাঁচা ছিলাম।”
এসআইও সেই হাসির সাথে যোগ দিলো তবে নিঃশব্দে।
“সে কি করে?” হাসি থামিয়ে আচমকা কাজের কথায় চলে এলো ওসি।
“সাম্বাদিক”।
ভুরু কুচকে গেলো ভারপ্রাপ্ত কর্মকতার। “সাংবাদিক?”
“জি স্যার। বিরাট বড় পেপারের,সাম্বাদিক।”
“কোন পেপারের?”
“মহাকালের।”
ওসি আর এসআই দৃষ্টি বিনিময় করলো দ্রুত। মহাকাল দেশের অন্যতম প্রভাবশালী পত্রিকা। এই পত্রিকার কিছু সাংবাদিক নিজেদেরকে এমপি-মন্ত্রীও ভাবে। সব কটা বেয়াদপের হাডিড। এদেরই একজনের পোঙটামির কারণে আজ তাকে ঢাকা ছেড়ে সুন্দরপুরের মতো বদখত জায়গায় এসে ওসিগিরি করতে হচ্ছে।
হারামজাদা! মনে মনে বলে উঠলো ওসি। “সে এখানে কি করতে আসছে? ম্যাডামের পিছনে লাগছে ক্যান? তার মতলবটা কি?”
আতর একটু দ্বিধার মধ্যে পড়ে গেলো। সবটা খুলে বললে তার পাছা উদাম হয়ে যাবে, আর সেই উদাম পাছা রক্ষা করা কঠিনই হবে তখন। “ঐ হোটেলের উপরে কী জানি লিখবো…” বললো সে, “…আমারে তো সব খুইলা কয় নাই, খালি কইলো হোটেলটার খাওন-দাওনের অনেক নামডাক শুনছে…এইসব নিয়া পেপারে লিখবো।”
মুচকি হেসে মাথা দোলালো ওসি। “তাইলে তোমারে নিয়া ঘুরঘুর না কইরা ম্যাডামের সাথে সরাসরি দেখা করতাছে না ক্যান?”
গাল চুলকালো ইনফর্মার। “হ, আমিও তো পরথমে হেইটাই কইছিলাম…সে কইলো ম্যাডামের লগে দেহা করন নাকি খুব কঠিন।”
“সেইজন্যে তোমার হেল্প নিলো?”
চুপ মেরে রইলো আতর।
ওসিও কিছুক্ষণ চুপ থেকে ইনফর্মারকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো। অবশেষে বললো সে, “তুমি ওই সাংবাদিকরে নিয়া কই কই গেছো, ঠিক কইরা কও তো?”
একটু ঢোক গিলে নিলো আতর। অভিজ্ঞতা থেকে জানে, একবার মিথ্যে বলে ধরা পড়ে গেলে সত্যি না বললে লাভের ক্ষতিই হয় বেশি। তার এখন উচিত নিজের কথা ভাবা। সাংবাদিক লোকটা তাকে না জানিয়ে ঐ বাড়িতে ঢুকেছিলো। তাকে বললে সে অবশ্যই মানা করতো। লোকটার এই বাড়াবাড়ি করার কারণেই আজ তাকে বিপদে পড়তে হচ্ছে। এখন তাকে রক্ষা করতে গেলে সে নিজেই বিপদে পড়ে যাবে। দুয়েকদিনের পরিচয়ের মানুষের জন্য এভো বড় ঝুঁকি নেয়াটা ঠিক হবে না।
