দু-বার রিং হতেই কলটা রিসিভ করা হলো।
“সরি, ফোনটা বন্ধ ছিলো, আমিও ঘুমিয়ে ছিলাম…” ওপাশের কথা শুনে গেলো সে। “…হ্যা…গুড…” ছফার মুখে হাসি ফুটে উঠলো। “ডিটেইল জেনে নাও…ওখানে অনেকদিন ছিলো…সম্ভবত কয়েক মাস…” নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরলো। “এখনকার নাম মুশকান জুবেরি..হ্যা…জুবেরিটা হাজব্যান্ডের টাইটেল…বিয়ের আগে নিশ্চয় অন্য কোনো নাম ছিলো..তুমি মুশকান দিয়ে ট্রাই করে দেখো…এই নামের কেউ ছিলো কিনা…আমি শিওর, ওরা জানে…হূম, কেউ না কেউ তো জানেই।”
ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে করতে ফোনের ওপাশের কথাগুলো শুনে যেতে লাগলো সে।
“পুরনো স্টাফদের কাছ থেকে জেনে নাও, হ্যাঁ, ঐ সময়ে যারা ছিলো…সন্দেহ হলে রেকর্ড চেক করে দেখবে…আমি একদম ডিটেইলস চাই, হূম…আর খুব দ্রুত করবে, সব ইনফর্মেশন আমাকে মেইল করে। দেবে…ওকে…ওয়ালাইকুম সালাম।”
ফোনটা রেখে দিলো। সে জানে এখন দ্রুত তথ্য জোগাড় করা যাবে। দারুণ একটা সূত্র পেয়েছে। এটা ধরে এগিয়ে গেলেই অনেক কিছু বের হয়ে আসবে। এজন্যে আতরকে মনে মনে ধন্যবাদ দিলো সে। লোকটা আসলেই কাজের। সে যতোটুকুই করেছে সেটুকুই যথেষ্ট। টের পেলো খুব খিদে পেয়েছে। নাস্তা করেই লোকটাকে ফোন দেবে।
ঘর থেকে বের হতেই অদ্ভুত একটা খেয়াল চাপলো তার মাথায়। শেষবারের মতো রবীন্দ্রনাথ-এ গিয়ে নাস্তা করলে কেমন হয়?
.
অধ্যায় ২০
এতোদিন ধরে যে ডাকের অপেক্ষয় ছিলো সেই ডাক পেয়েও আতর আলীর মনে কোনো খুশি নেই। কেনজানি মনে হচ্ছে এই ডাক সেই ডাক নয়।
সামান্য একজন ইনফর্মার সে। একে ওকে দিয়ে ডেকে পাঠালেই সুরসুর করে থানায় গিয়ে হাজির হতো, কিন্তু না, ওসিসাব তাকে থানায় ডেকে নেবার জন্য এসআই আনোয়ারকে পাঠিয়েছে। জানোয়ারের বাচ্চা আর মানুষ হলো না। ঘুমিয়ে থাকা আতরকে ঝাঁকুনি দিয়ে জাগিয়ে তুলেছে। ঐ সময় ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের ঘোরে ছিলো সে। সম্বিত ফিরে পেতেই হাফ ছেড়ে বাঁচে। যাক, জীবন্ত কবরস্থ হবার চেয়ে অভদ্র পুলিশের হাতে ঝাঁকুনি খাওয়া অনেক ভালো!
এসআই আনোয়ারকে দেখে সে একটু অবাক হলেও ভয়ও পেয়ে গেছিলো। ভেবেছিলো আবার কোনো ভেজাল হয়ে গেলো কিনা। কিন্তু আনোয়ার তাকে অভয় দিয়ে বলেছে ঘটনা সেরকম কিছু নয়। ওসিসাহেব কী একটা কাজে তাকে ডেকে পাঠিয়েছে, কারণটা নাকি এসআই নিজেও জানে না।
আতর ভালো করেই জানে কথাটা মিথ্যে। ছোটোখাটো থানায় কোনো কথা গোপন রাখাটা কঠিনই বটে। এ কথা যদি কোনো কনস্টেবল বলতো তাহলে না-হয় কথা ছিলো। কিন্তু একজন এসআই জানবে না কেন, কোন দরকারে সে ইনফর্মারকে রীতিমতো বাড়ি থেকে তুলে আনছে?
ওসির রুমে বসে এসব ভাবছে আতর আলী। প্রায় পাঁচ মিনিট হলো এখানে এসেছে, ওসিসাহেবের কোনো খবর নেই। আনোয়ার বলছে ওসি টয়লেটের ভেতরে আছে। আজ সকাল থেকে নাকি বেচারার পেট খারাপ। কথাটা শুনে মুচকি হেসেছে। ভেজাল খেলে পেট খারাপ হয় কিনতু সারারাত ফুর্তি করার পর কারোর পেট খারাপ হয় জানতো না! ওইসব করলেও কি বদহজম হয় তাহলে!
এসআই আনোয়ার, যেকিনা কয়েকদিন আগেও তার পার্টনার ছিলো, সে এখন ওসির রুমে বসে থাকলেও মুখে কুলুপ মেরে রেখেছে। চুপচাপ মোবাইলফোনটা নিয়ে কী সব দেখছে সে, আর এটাই আতরকে বেশি চিন্তায় ফেলে দিয়েছে।
পুলিশের মোটা বেল্টটা ঠিকঠাক করতে করতে ঘরে ঢুকলো ওসিসাহেব। আতর আর এসআই উঠে দাঁড়ালো সঙ্গে সঙ্গে।
“বসো,” আতরের উদ্দেশ্যে কথাটা বলেই নিজের ডেস্কে বসলো ভদ্রলোক। তার চোখেমুখে ক্লান্তি।
আতর বসে গেলেও আনোয়ার দাঁড়িয়ে রইলো।
“বসো,” হাত নেড়ে এসআই’র উদ্দেশ্যে বললো এবার। আনোয়ার বসে যেতেই ওসি গভীর করে দম নিয়ে নিলো। “আতর আলী, তুমি তো আমাদের নিজের লোক, যা বলবা ক্লিয়ার-কাট বলবা। ধানাই-পানাই আমার একদম পছন্দ না।”
আতর কিছু বুঝতে না পেরে ফ্যালফ্যাল চোখে চেয়ে রইলো। “আজকাল তুমি কি করতাছো, অ্যাঁ?”
ভুরু কুচকালো ইনফর্মার। ঢোক গিলে বললো, “কই, কিছু না তো?”
মাথা দোলালো ওসি। “দ্যাখো, আমার শরীরটা খারাপ। বেশি প্যাচাল পাড়নের টাইম নাই। যা বলার সোজাসুজি বলি,” একটু থামলো সে, আনোয়ারের দিকে চকিতে তাকিয়ে আবার বলতে শুরু করলো, “অচেনা এক লোকের সাথে দুই-তিনদিন ধইরা ঘুরাফিরা করতাছো…কি…মিথ্যা বলছি?”
“না, সত্যি বলছেন,” আস্তে করে বললো আতর। সাংবাদিকের সাথে তার ঘোরাফেরার কথা পুলিশ জেনে গেছে বলে একটু অবাকই হলো। তারা তো থানার ত্রিসীমানার মধ্যেও যায় নি।
“ঐ লোকটা কে? সে কি চায়?” কথাটা বলেই তার দিকে স্থিরচোখে চেয়ে রইলো ওসি।
“উনি ঢাকা থেইকা আসছেন..জমি কিনবেন..আমি ইটটু হেল্প করতাছি, স্যার।”
আনোয়ারের দিকে তাকালো ওসি, তারপর আবারো ইনফর্মারের দিকে। “এই সুন্দরপুরে জমি কিনতে আসছে?”
“হ। কিসের যেন খামার করবো। আমারে কইলো ভালা দেইহা কিছু খাসজমি দেখাইতে…আমি কইলাম সমস্যা কি.জমি তো এইহানে মেলা আছে।” মিথ্যে বলতে আতরের কোনো বেগই পেতে হলো না, সব সময়ই সে গুছিয়ে মিথ্যে বলতে পারে।
“সে তোমার খোঁজ কিভাবে পাইলো?”
দাঁত বের করে হাসি দিলো আতর। আগের কুনো পার্টির কাছ থেইকা শুনছে মনে হয়। আমি তো এইটা জিগাই নাই। এইসব নিয়া মাথা ঘামায়া আমার কী লাভ?”
