মুশকান জুবেরি, তুমি আসলে কী করো?
.
অধ্যায় ১৯
আতর এমন একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে যে ঠিক অচেনা যেমন মনে হচ্ছে না তেমনি পরিচিত বলেও জোর দিয়ে বলতে পারছে না। রাতের কুচকুচে অন্ধকারে চারপাশটা ভুতুরে হয়ে আছে। এখন ঠিক কটা বাজে সেটাও বলতে পারছে না। হাতের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে ফেললো মনে মনে। সে তো কখনই হাতঘড়ি পরে না।
ভুরু কুচকে সামনের দিকে তাকালো, কিন্তু ভারি কুয়াশার চাদর ভেদ করে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না, তারপরও কী এক অজানা আতঙ্কে তার বুকটা লাফাচ্ছে। নিজেকে ভর্ৎসনাই করলো। সে তো কখনও এতোটা ভীতু ছিলো না! শার্টের গলা দিয়ে বুকে থুতু দিলো। সাহস করে কয়েক পা সামনের দিকে এগিয়ে গেলো সে। এখন কানে একটা ভোতা শব্দ শুনতে পাচ্ছে।
ধুপ! ধুপ! ধুপ!
নির্দিষ্ট বিরতি দিয়ে হচ্ছে শব্দটা। সেই শব্দের উৎসের দিকে এগিয়ে গেলো আতর। আশ্চর্যের ব্যাপার, এতো ভারি কুয়াশা পড়া সত্ত্বেও তার মোটেও শীত লাগছে না। কয়েক পা সামনে এগোতেই কুয়াশার চাদর ফিকে হয়ে আসতে শুরু করলো। থমকে দাঁড়ালো সে। বুকের হৃদস্পন্দনটাও থেমে গেছে যেনো। একটু আগে যেভাবে হাতুড়িপেটা করছিলো সেটা আর হচ্ছে না।
তার সামনে একটা গর্ত!
ঠিক এরকম একটা গর্তেই সাংবাদিক পড়ে গেছিলো। আর সেটা খুরে রেখেছিলো ঐ হারামজাদা ফালু!
ডানে-বামে তাকালো সে। এক পা পিছিয়ে গেলো আনমনেই। তার দম এখনও আটকে আছে। মনের একটা অংশ বলছে এক্ষুণি দৌড়ে চলে যেতে। অন্য অংশটা সাহস সঞ্চয় করার তাগিদ দিচ্ছে। ভয় পেলে চলবে না। কিসের ভয়? কাকে ভয়? ফালুকে?
চিন্তাটা তার মাথায় আঘাত হানতেই উদভ্রান্তের মতো চারপাশে তাকালো। ফালু কোথায়? একটু আগেই তো ধুপ-ধুপ করে শব্দ শুনেছিলো। নিশ্চয় ফালু আশেপাশেই আছে৷ যে-ই না ঘুরে পেছনে তাকালো অমনি হাতে পায়ের রক্ত বরফের মতো জমে হিম হয়ে গেলো।
তার থেকে মাত্র কয়েক হাত দূরে কাঁধে একটা কোদাল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ফালু।
কিছু বলতে চাইলো আতর কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। ফালুর চোখ দুটো লাল টকটকে। হঠাৎ করে তার নজর গেলো গোরখোদকের অন্য হাতটায় সাদা কাফনের কাপড়!
ফালু সেই কাফনের কাপড়টা তার দিকে ছুঁড়ে মারলো। সাদা কাপড়টা তার বুকে লেগে পড়ে গেলো মাটিতে। সেদিকে তাকিয়ে দেখলো না আতর। তার দৃষ্টি ফালুর দিকে। এখনও মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের করতে পারছে না।
আচমকা, তাকে একেবারে অপ্রসতুত করে দিয়ে ফালু সামনে এগিয়ে এসে তার বুকে একটা ধাক্কা মেরে বসলো। চিৎপটাং হয়ে খোলা-কবরে পড়ে গেলো সে। কবরের নীচ থেকে দেখতে পেলো উপর থেকে ফালু তার দিকে চেয়ে আছে। বদমাশটার মুখে বাঁকাহাসি।
“আমার ঘরে ক্যান গেছিলি?” ফ্যাসফ্যাসে গলায় জানতে চাইলো সে।
এর কোনো জবাব দিতে পারলো না আতর। তার গলা দিয়ে কোনো শব্দই বের হচ্ছে না। যেনো জবান বন্ধ হবার সাথে সাথে হাত-পাও অসাড় হয়ে পড়েছে। পরক্ষণেই সে টের পেলো তার উপরে মাটি ফেলা হচ্ছে! ধুপ ধাপ শব্দ করে চাক-চাক মাটি এসে পড়ছে তার উপরে।
না! শব্দহীন চিৎকার দিলো সে।
কয়েক মুহূর্তেই মাটির নীচে চাপা পড়ে গেলো আতর। হাত-পা এতোটাই অবশ হয়ে গেছে যে, কিছুই করতে পারছে না। তবে কি ঐ হারামিটা তাকে জীবন্ত কবর দিয়ে দিচ্ছে!?
হঠাৎ করে টের পেলো তার নাম ধরে কেউ ডাকছে দূর থেকে!
চিনতে পারলো না।
তারপরই একটা হাত এসে পড়লো তার ঘাড়ে। শার্টের কলারটা ধরে তাকে মাটি থেকে টেনে তুলে ফেললো এক ঝটকায়!
ধরফর করে উঠলো তার বুক। জোরে জোরে নিঃশ্বাস নেবার জন্য হাসফাস করতে লাগলো। “কে! কে!” এবার তার মুখ দিয়ে শব্দ বের হলো। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখলো একটা পরিচিত মুখ চেয়ে আছে তার দিকে।
*
ছফার ঘুম ভাঙলো দশটার একটু আগে। তারপরও বিছানায় পড়ে থাকলো কিছুটা সময়। উঠতে ইচ্ছে করছে না। গতরাতের ধকল তার শরীর সামলে উঠতে পারে নি। দু-মাইল সাইকেল চালানো। দেয়াল বাওয়া, ঘণ্টাখানেক সময় ধরে টান-টান উত্তেজনার মধ্যে থাকা, শেষে প্রাণপণে দৌড়! টের পেলো হাত-পায়ের মাংসপেশীগুলো আড়ষ্ট হয়ে আছে।
দীর্ঘদিন পর, বিশেষ করে শীতকাল চলে এলে যখন হঠাৎ করে ব্যাডমিন্টন খেলা শুরু করে, কিংবা অনেকদিন পর গ্রামের বাড়িতে গিয়ে নদী পুকুরে সাঁতার কাটে, তখন শরীরের পেশীগুলো এরকম আচরণ করে।
এবার খেয়াল হলো গতরাতের জামা না-পাল্টেই শুয়ে পড়েছিলো। বালিশের পাশে মোবাইলফোনটা হাতে তুলে নিলো সে। একেবারে ডেড হয়ে
আছে। গতরাতে সেই যে চার্জ শেষ হয়ে গেছিলো আর রিচার্জ করতে মনে নেই। কিছু একটা কথা মনে পড়তেই লাফ দিয়ে উঠে বসলো বিছানায়। তাকে নিশ্চয় অনেক বার ফোন করা হয়েছে।
ফোনটা চার্জ করতে দিয়ে সোজা চলে গেলো টয়লেটে। দ্রুত দাঁত ব্রাশ করে হাত-মুখ ধুয়ে নিলো। জামা পাল্টে নতুন একটা টি-শার্ট আর প্যান্ট পরে নিলো সে। ফোনটা চার্জে থাকা অবস্থায়ই অন করে দিলো এবার। তার ধারণাই ঠিক। ফোন চালু হবার সঙ্গে সঙ্গে চার-পাঁচটা মেসেজ চলে এসেছে। এরমধ্যে দুটো মিসকল অ্যালার্ট আর দুটো তার এক ঘনিষ্ঠজনের। ছফা আসলে এই ছেলেটার ফোনকলই আশা করেছিলো। প্রথমে এসএমএস-টাই ওপেন করে পড়লো। দেরি না করে দ্রুত কলব্যাক করলো ছেলেটাকে।
