“ফালু নিজের খাটের নীচে লাশ রাখে ক্যান?” তাড়া দিয়ে বললো আতর। “লাশ লইয়া হে করেটা কী!”
এ প্রশ্নেরও জবাব দিলো না ছফা। নিজের চোখের সামনে এরচেয়েও বড় কিছু ঘটতে দেখেছে সে।
“ঐ ডাইনির লগে ফালুর কি সম্পর্ক?”
“ফালু আসলে ওর ঘরে কি রেখেছে-কেন রেখেছে সেটা আগে জানতে হবে,” গম্ভীরকণ্ঠে বললো।
ফ্যাকাশে মুখে তাকালো আতর। সে ভেবেছিলো নুরে ছফা তার কাছ থেকে ফালুর ঘটনা শুনে বিনাবাক্যে সব বিশ্বাস করবে।
ছফা দেখলো লোকটার চোখেমুখে এখনও বিস্ময়ের অভিব্যক্তি মিইয়ে যায় নি। এই ইনফর্মারকে যতোটুকু বলেছে তাতেই সে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। এখন তার মনে হচ্ছে ওকে কিছু না বললেই বেশি ভালো হতো। হয়তো ভয় পেয়ে নিজেকে গুটিয়ে নেবে পুরোপুরি, তাকে আর সাহায্য করার সাহস দেখাবে না। পরক্ষণেই তার মনে হলো, এতে এমন কোনো সমস্যাও হবে না। সম্ভবত মুশকান জুবেরির ব্যাপারে খুব বেশি সাহায্য করার ক্ষমতা রাখে না এই লোক। তাকে যেটুকু সাহায্য করার তা ভালোমতোই করেছে। এরচেয়ে বেশি কিছু করার সাধ্য নেই তার।
“আপনেরে মুঠির মইদ্যে পায়াও কিছু করলো না?!” ইনফর্মার বিস্ময়ের ঘোরের মধ্যেই প্রশ্নটা করলো।
“আপনার সাথেও কিন্তু একই কাজ করেছিলো মহিলা,” মনে করিয়ে দিলো সে।
“হ, তাও তো ঠিক।” আতর আলী আরো বেশি ধন্দে পড়ে গেলো। “আপনেরে আমি কইছিলাম না ঐ বেটি একটা ডাইনি…এইবার দেখলেন তো!”
মাথা নেড়ে সায় দিলো সে। “ডাইনি কিনা জানি না তবে মহিলার অনেক গোমড় রয়েছে। আমাকে এর সবটা জানতে হবে।”
ছফার দিকে ভুরু কুচকে চেয়ে রইলো আতর। “এইসব জাইনা কী করবেন? পেপারে লিখবেন? লিখা কী হইবো?” মাথা দোলালো সে। “কিছু হইবো না। আমাগো এমপি ঐ বেটির ভাউড়া হয়া গেছে…দেখবেন, বেটি বিপদে পড়লেই হমুন্দিরপুতে আইসা হাজির হইবো।”
“মা” ছফাও এটা হিসেরের মধ্য রেখেছে। যখনই জানতে পেরেছে এমপর সাথে মহিলার সম্পর্কের কথা তখনই সে বুঝে গেছিলো ব্যাপারটা মোটেও সহজ হবে না, এক পর্যায়ে এমপি জড়িয়ে পড়তে পারে।
“আমাগো এমপি কইলাম মানুষ ভালা না.” চাপাকণ্ঠে বললো আতর। “মানুষ মাইরা নদীতে ভাসাইয়া দেওয়া হের বাপ-দাদাগো খাইসলত আছিলো…গেণ্ডিগোলের সময় হের বাপে পিচকমিটি করছে…বহূত মানুষ মারছে। এমপিও কম যায় না। কয়টারে গুম করছে…মাটির নীচে পুইতা মারছে, জানেন?”
“আপনি কি ভয় পাচ্ছেন?” বাজিয়ে দেখার চেষ্টা করলো ছফা।
বিব্রত হয়ে ঢোক গিললো ইনফর্মার। “আরে, আমি ডরামু ক্যান..আমি তো কিছু করি নাই। আমি ডরাইতাছি আপনেরে নিয়া।”
“আমাকে নিয়ে ভয় পাবার কিছু নেই। ওরা আমার কিছু করতে পারবে না।”
ছফার আত্মবিশ্বাস দেখে মনে মনে বাঁকাহাসি হাসলো আতর। সব সাংবাদিকই এরকম ভাব করে, নিজেদের মহা ক্ষমতাধর ভাবে, কিন্তু ঠেলায় পড়লে বোঝা যায় ওদের আসলে খুব বেশি শক্তি নেই। এরা পারে শুধু দুর্বলের সাথে চোটপাট দেখাতে। হোমরাচোমরাদের খপ্পরে পড়লে হোগার কাপড় মাথায় তুলে দৌড় দেবে!
“আচ্ছা আমার ফোন নাম্বারটা পেলেন কোথায়?”
ছফার প্রশ্নে আতরের চিন্তায় ছেদ পড়লো। গাল চুলকালো সে। “এইটা তো এক্কেবারে সোজা…আপনে আইজকা ফোনে ট্যাকা ভরছেন না? ঐ ফেলেগজি শামসুর লগে আমার আবার হট টেরাম…ওর নম্বরটা তো আমার মুখস্ত…ওরে ফোন দিয়া কইলাম আপনের নম্বরটার কথা।”
“কিন্তু সে কিভাবে আমার নাম্বার জানবে? মানে, ব্যালান্স রিচার্জ করার সময় তো শুধু নাম্বার লেখা হয়..আর এতে নাম্বারের মধ্যে আমারটা-”
“ভুইলা গেছেন দেহি,” কথার মাঝখানে থামিয়ে দিয়ে বললো ইনফর্মার, “আপনে হের লাস্ট কাস্টমার আছিলেন।”
মাথা নেড়ে সায় দিলো ছফা। এবার সে বুঝতে পেরেছে। তারা যখন ফোনে ব্যালান্স ভরতে গেছিলো তখন দোকানটা বন্ধই করে দিয়েছিলো দোকানি, আতরের অনুরোধে দোকান খুলে ব্যালান্স ভরে দেয়। কিনতু তা-ই যদি হবে তাহলেও একটা প্রশ্ন চলে আসে।
“আমরা চলে আসার পর সে দোকান বন্ধ করে চলে গেছিলো না?”
ছফার প্রশ্নে মুচকি হাসলো আতর। “হ। কিনতু হে তো হিসাবের খাতা আর ফোনটা দোকানে রাখে না…বাড়িতে রাখে।”
“ও,” আর কিছু বললো না সে। ইনফর্মার যে বেশ চালাক-চতুর সেটা আরেকবার বুঝতে পারলো।
“এহন কি করবেন?”
আতরের দিকে তাকালো। “মানে?”
“কাইল সকালের কথা কইতাছি।”
“ও,” হাই তুললো একটা। রাত অনেক হয়েছে, ঘুম পাচ্ছে তার। “ঐ রেস্টুরেন্টের কোনো কর্মচারি কিংবা বাবুর্চির সাথে কথা বলা যাবে? এরকম কারোর সাথে আপনার খাতির আছে?”
একটু গাল চুলকালো ইনফর্মার। “আছে, তয় হে তো এহন কাম করে।”
“কাজ ছেড়েছে কবে?”
“তিন-চাইর মাস হইবো।”
“সমস্যা নেই। ওর সাথে কথা বললেই হবে।”
“ঠিক আছে তাইলে…আমি সকালে চইলা আসুম নে।”
“এগারোটার আগে না…আমি একটু বেলা করে ঘুমাবো। ঠিক আছে?”
“আইচ্ছা।”
আতরকে বিদায় করে দিয়ে বিছানায় অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে রইলো ছফা। শরীরটা খুব ক্লান্ত, বিছানায় শুয়ে পড়লেই ঘুম চলে আসবে হয়তো কিন্তু ঘুমাতে পারবে কিনা সন্দেহ, তার মাথায় ঘুরছে অসংখ্য প্রশ্ন। এইসব প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে ভাবতে ঘুম চলে যাবে। তার বেলায় সব সময় এমনটিই হয়।
জামা-কাপড় না পাল্টেই বাতি নিভিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো।
