“একদৌড়ে এইহানে আইসা পড়ছেন!” সাইকেলটা তার পাশে থামিয়ে বললো আতর। ঐ ড্রাইভার ভো গেটের বাইরেই যায় নাই।” “ওটা ডাইভার ছিলো?”
“হ” আতর সাইকেল থেকে নেমে পড়লো।
ছফা কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলো। বহু দূরে দেখতে পেলো জমিদার বাড়ির দিক থেকে এগিয়ে আসছে একজোড়া হেডলাইট।
কাভার্ডভ্যানটা!
আতরও দেখতে পেলো। “চলেন, গাড়িটা আহোনের আগে ফুইটা পড়ি।”
“আপনি ডাবল চালাতে পারবেন?”
“পারুম।”
ইনফর্মার সাইকেলের সিটে বসতেই তার সামনে রডের উপরে বসে পড়লো ছফা।
“সমস্যা নাই,” প্যাডেল মারার আগে বললো। “গাড়িটা আমাগো পিছনে লাগবো না…ওইটা হোটলে যাইবো।”
তাদের সাইকেলটা মহাসড়কের উপর দিয়ে নিঃশব্দে এগিয়ে যেতে লাগলো। ছফা পেছন ফিরে দেখতে পেলো কাভার্ডভ্যানটা এখনও সড়কে উঠে আসে নি। রবীন্দ্রনাথকে অতিক্রম করার সময় আলতো করে হাফ ছাড়লো সে।
*
রকিংচেয়ারে বসে দোল খেতে খেতে গভীর ভাবনায় ডুবে আছে মুশকান জুবেরি। মাঝরাত। সুন্দরপুর ঘুমিয়ে পড়েছে অনেক আগে। এমনিতেই এখানকার লোকজন নটা-দশটার পরই ঘুমিয়ে পড়ে, শীতের রাতে এই সময়টা আরেকটু এগিয়ে আসে। গত কয়েক বছর ধরে এখানে থাকলেও দেরি করে ঘুমানোর অভ্যেস তার যায় নি, তবে আজ আরো দেরি করে ঘুমাবে। এর কারণ একটা চিন্তা মাথায় গেঁড়ে বসেছে।
তার বাড়িতে অনাহূতভাবে একজন ঢুকে পড়েছিলো আজ। এমন নয় যে, এরকম ঘটনা এই প্রথম ঘটলো। সুন্দরপুরে তার আগমণের পর থেকে চার পাঁচবার এমন ঘটনা ঘটেছে। আর প্রতিবারই সে মোকাবেলা করেছে। ভিন্নভাবে, এরফলে কাজও হয়েছে দারুণ। ঐ লোকগুলো আর এই বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে ঢোকার সাহস করেনি।
ওরা সবাই ছিলো গ্রামের কৌতূহলী মানুষ, যাদের কাছে তার মতো। একজন মেয়েমানুষ স্বাভাবিক কারণেই আগ্রহের বিষয় হয়ে ওঠে। কিন্তু আজকের লোকটা সে-রকম কেউ নয়, এ-ব্যাপারে সে পুরোপুরি নিশ্চিত। লোকটাকে সে আগেই দেখেছে রবীন্দ্রনাথে। মানুষের কৌতূহলী দৃষ্টি তার চোখ এড়ায় না। একঝলক লোকটার চোখ দেখেই সে বুঝে গেছিলো নিছক খাওয়া-দাওয়ার উদ্দেশ্যে সে আসে নি। এখন প্রমাণিত হলো তার ধারণাই ঠিক। সত্যি বলতে, এরকম ঘটনার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতই ছিলো। লোকটাকে নিজের হাতের মুঠোয় পেয়েও সে তার মতো করেই সামলেছে৷ কিন্তু একটা ব্যাপার অস্বস্তি তৈরি করেছে তার মধ্যে-লোকটা কে সে জানে। এমনকি সে নিশ্চিত হতে পারছে না তার কি উদ্দেশ্য। অবশ্য কয়েক মুহূর্তের জন্য তার মনে হয়েছিলো ঐ আসাদুল্লাহ বুঝি তার শয়তানি শুরু করেছে। সে তো ইনিয়ে-বিনিয়ে বলেছেই, তাকে অসম্ভষ্ট করে সুন্দরপুরে কেউ স্বস্তিতে থাকতে পারে না। কিন্তু এখন সে নিশ্চিত, ঘটনা অন্য কিছু।
তার অদভুত আর স্বনামখ্যাত রেসটুরেন্টের ব্যাপারে অনেকেই আগ্রহী। তার তৈরি করা রেসিপিগুলোর গোমড় নিয়েও অনেকে কৌতূহলী কিন্তু এই লোকটাকে সে-রকম কিছু বলেও মনে হচ্ছে না। খাবারের প্রতি এর তেমন আগ্রহ নেই।
গভীর করে নিঃশ্বাস নিলো। আগামীকালের মধ্যেই লোকটার পরিচয় আর উদ্দেশ্য জানতে হবে তাকে। বিপদের গন্ধ পাচ্ছে সে।
রকিংচেয়ারের পাশে কফি টেবিলের দিকে হাত বাড়ালো। মোবাইলফোনটা তুলে নিয়ে একটু দ্বিধায় পড়ে গেলে যেনো, তবে সেটা কয়েক মুহূর্তের জন্য। অবশেষে একটা নাম্বারে ডায়াল করলো।
.
অধ্যায় ১৮
আতর আর ছফা হোটেল সানমুনের রুমে বসে আছে। কয়েক মুহূর্ত ধরে তাদের মধ্যে কোনো কথা হচ্ছে না। একে অন্যের কাছ থেকে আজ রাতের অবিশ্বাস্য ঘটনা শোনার পর দু-জনেই বিস্মিত। তবে আতর তার অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা সবটা বললেও ছফা খুব কমই বলেছে। বিশেষ করে ফালু আর বোবা ইয়াকুব যে কিছু একটা মাটিচাপা দিয়েছে মুশকান জুবেরির উপস্থিতিতে, সেটা ইচ্ছে করেই বলে নি। সে চাচ্ছে না এ-মুহূর্তে এতো বড় একটা সত্য অন্য কেউ জেনে যাক।
“বেটি কুমীর পালে কেন?” অবিশ্বাসভরা কণ্ঠে বললো ইনফর্মার।
“আপনি এটা জানতেন না?” ছফার কণ্ঠে দ্বিগুণ অবিশ্বাস।
ঠোঁট উল্টালো আতর।
মুশকান জুবেরি কেন কুমীর পালে সেটাতে যতোটা না অবাক হচ্ছে তার চেয়ে বেশি অবাক হচ্ছে এই পুরো ব্যাপারটা আতর আলীর মতো। একজন মানুষ জানে না বলে। “বলেন কি!”
“ঐ ডাইনি তার বাড়ির ভিতরে কি করে না করে সেইটা তো বেবাকৃতে জানোনের কথা না,” সাফাই গাওয়া শুরু করলো সে। “হে মাছ চাষ করে জানতাম…মুরগি আর গরু-বকরির খামারও আছে কিন্তু…”।
ছফা কিছু বললো না। সে আগেই বুঝে গেছে, মুশকান জুবেরির ব্যাপারে এখানকার কেউই তেমন কিছু জানে না, এমন কি বিবিসি বলে খ্যাত আতর আলীও যৎসামান্যই জানে।
“ফালুর ব্যাপারটা কি করবেন?” সঙ্গত কারণেই আতর প্রসঙ্গ পাল্টাতে চাইলো। যে বিষয়ে তার জানাশোনা নেই সে বিষয় নিয়ে আলাপ করতে চাচ্ছে না।
“ফালু?” আস্তে করে বললো ছফা। একটু আগে আতরের কাছ থেকে সব শোনার পর এ-ব্যাপারটার মাথামুণডু কিছু বুঝতে পারছে না। গোরখোদক তার অ্যাডভান্স কবর নাকি লাশ ছাড়াই ভরাট করে ফেলেছে, আর তার ঘরের খাটের নীচে রেখে দিয়েছে লাশের কঙ্কাল! ঘটনা আসলেই রহস্যজনক। কিন্তু এ মুহূর্তে ঐ গোরখোদককে নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামাচ্ছে না সে। মুশকান জুবেরিই তার প্রধান লক্ষ্য। ফালুর ব্যাপারটা পরে। দেখা যাবে। কিংবা কে জানে, ঐ মহিলার রহস্য উন্মোচিত হলে তার কোনো দরকারই হয়তো পড়বে না-এক ঢিলেই দুই পাখি মারা পড়বে।
