ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে কোনো জবাব এলো না। “হ্যালো?”
সাড়া নেই।
কান থেকে ফোনটা সরিয়ে ডিসপ্লের দিকে তাকালো। নষ্ট ডিসপ্লে দেখে কিছুই বোঝা সম্ভব নয়। আবারো কানে লাগিয়ে শোনার চেষ্টা করলো সে। কোনো আওয়াজ নেই। মনে হচ্ছে না লাইনে কেউ আছে। চিন্তিত হয়ে নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরলো আতর। সাংবাদিক লাইন কেটে দিয়েছে? না, কেটে দেবার কথা নয়। হয়তো এমনিতেই লাইনটা কেটে গেছে। একটু পর আবার ফোন করবে।
কয়েক মিনিট চলে গেলেও তাকে ফোন করা হলো না। বোবা আর অন্য লোকটা এরমধ্যে দু-বার মালপত্র লোড করে গেছে। সাইকেলের সিটের উপরে দাঁড়িয়ে থেকে বিরক্ত হয়ে উঠলো আতর। ঘটনা কি বুঝতে পারছে না। সাংবাদিক নিজের দরকারেই তার সাথে যোগাযোগ করার কথা, কিনতু তার দিক থেকে কোনো সাড়া-ই নেই। বিরক্তির পাশাপাশি একটা খারাপ আশংকাও জাগলো মনে। লোকটা বের হবার চেষ্টা করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেলো না তো?
*
পুকুরপাড় থেকে দুই দেয়ালের মাঝখানের প্যাসেজ দিয়ে আবারো মূল বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়েছে ছফা। তার মেজাজ যারপরনাই খারাপ। একটু আগে আতরের সাথে কথা বলার সময়ই মোবাইলফোনটার চার্জ শেষ হয়ে গেছে! বিপদের সময় সব কিছুই বিরুদ্ধে চলে যায়, নইলে ফোনটা ঠিক এ সময় কেন এমন করবে। ছফা অবশ্য জানে ভুলটা তারই হয়েছে। খুব একটা চার্জ না দিয়েই হোটেল থেকে বের হয়ে গেছিলো। তখন তো আর বুঝতে পারে নি কোনভাবে এখানে এতোক্ষণ আটকে থাকবে।
যাইহোক, ঐ ইনফর্মার নিশ্চয় সাত-পাঁচ ভেবে যাচ্ছে কিন্তু এ মুহূর্তে ওসব নিয়ে মাথা ঘামানোর অবকাশ নেই। তাকে এখন দ্রুত এই বাড়ি থেকে বের হতে হবে। সতর্ক পদক্ষেপে বাড়িটার পেছনের বাগান পেরিয়ে গেলো সে। তাকে কেউ দেখে ফেললে কি হবে তা নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামাচ্ছে না। ওরা যা দেখার এরইমধ্যে দেখে ফেলেছে, যা বোঝার তাও বুঝে নিয়েছে।
বাড়ির পেছনে পাকা আঙিনাটার পাশ দিয়ে যাবার সময় দেখতে পেলো দোতলার একটা ঘরে বাতি জ্বলছে। ফোনটা চালু থাকলে বুঝতে পারতো দারোয়ান আর অন্য দু-জন লোকের অবস্থান কোথায়। ঝুলন্ত প্যাসেজটার নীচ দিয়ে বাড়ির সামনের অংশে আসতেই বাম দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলো কাভার্ডভ্যানটা দাঁড়িয়ে আছে মূল ভবনের সদর দরজার সামনে। ভ্যানের পেছনের দরজা খোলা, ভেতরে কিছু মালপত্রও চোখে পড়ছে৷
সীমানাপ্রাচীরের যেখানটা দিয়ে সে ঢুকেছিলো সেদিকে তাকালো। অন্ধকারে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। একটা বড় গাছের ডালপালা ঝুঁকে আছে দেয়ালের দু-দিকেই। আতর আলী যদি এখনও থেকে থাকে তাহলে সম্ভবত তাকে দেখতে পাবে। সে হাত নাড়লেও কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেলো না। আতর সম্ভবত দেয়াল থেকে নেমে গেছে। তার ফোন কেটে যাবার পর ইনফর্মার নিশ্চয় বেশিক্ষণ অপেক্ষা করে নি। এমনটি যখন ভাবছে ঠিক তখনই দেখতে পেলো দেয়ালের উপরে একটা ঝুলন্ত ডাল নড়ে উঠছে।
বুঝতে পারলো ছফা। ইনফর্মারের কাণ্ডজ্ঞান বেশ ভালো। সাহস করে। এক পা এগিয়ে গেলো সে। এখন সে পুরোপুরি উন্মুক্ত। বাড়ির ভেতর থেকে কেউ বেরিয়ে এলে তাকে দেখে ফেলতে পারে, তারপরও ঝুঁকি নিলো। গভীর করে দম নিয়ে, কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা এগিয়ে গেলো মেইনগেটের দিকে। গেটের কাছে চলে আসতেই হাফ ছেড়ে বাঁচলো। গেটটা আধভেজানো। যেটুকু ফাঁক আছে তার মধ্য দিয়ে অনায়াসেই বের হয়ে যেতে পারবে।
নুরে ছফা যে-ই না গেট দিয়ে বের হয়ে যাবে অমনি শুনতে পেলো। চিৎকারটা।
“ওই? কে?!”
.
অধ্যায় ১৭
মাঝরাত, চারপাশে বেশ অন্ধকার, তার উপরে গ্রামের এবড়োখেবড়ো পথ, সেই পথ দিয়ে প্রাণপণে দৌড়াতে গিয়ে ছফার অবস্থা কাহিল হয়ে গেলো।
জমিদার বাড়ির মেইনগেট থেকে এক দৌড়ে মহাসড়কে চলে আসাটা চাট্টিখানি কথা নয়। তাকে উদ্দেশ্য করে চিৎকারটা দিতেই সে আর এক মুহূর্ত সময়ও নষ্ট করে নি, পেছনে কে ধাওয়া দিলো সেদিকেও খেয়াল করে নি। ভো-দৌড় বলতে যা বোঝায় সে তাই করেছে। জমিদার বাড়ি থেকে অনেক দূরে আসার পর ক্ষণিকের জন্যে পেছনে ফিরে তাকিয়েছিলো, কাউকে দেখে নি। দৌড়ানোর সময়ও তার মনে হয়েছিলো কেউ তার পিছু নেবে না। এতোক্ষণের অভিজ্ঞতায় বুঝে গেছে, এই বাড়ির লোকগুলো স্বাভাবিক আচরণ করে না। সবাই যা করে এরা করে তার ঠিক উল্টোটা। নিজের বাড়িতে অনাহূত একজনকে আবিষ্কার করার পর কেউ এরকম অদ্ভুত আচরণ করবে?
অবিশ্বাস্য!
সড়কের উপর এসে থামলো সে। দম ফুরিয়ে হাফাচ্ছে। হাটুর উপরে দু হাত রেখে উপুড় হয়ে দম নিতে লাগলো। ইচ্ছে করছে কালো পিচের রাস্তায় বসে পড়তে। বহু কষ্টে বুকের লাফানোটা স্বাভাবিক করতে পারলো। টের পেলো পা দুটো কেমন আড়ষ্ট হয়ে গেছে। তার পায়ের মাংসপেশিগুলো এরকম ভো দৌড়ের জন্য মোটেও অভ্যস্ত নয়। বিগত পাঁচ বছরে এরকম দৌড়াতে হয়েছে বলে মনে করতে পারলো না।
সড়কের দিকে তাকালো। একেবারে ভুতুড়ে। মানুষজন তো দূরের কথা রিক্সা-ভ্যানও দেখা যাচ্ছে না। এখন তাকে দু-মাইল হেঁটে হোটেলে ফিরে যেতে হবে, ভাবতেই গা গুলিয়ে উঠলো। টুং-টাং শব্দ শুনে পেছনে ফিরে তাকালো সে। সড়ক থেকে নেমে যাওয়া কাঁচা রাস্তাটা দিয়ে একটা সাইকেল আসছে তার দিকে।
সোজা হয়ে দাঁড়ালো ছফা, হাফ ছেড়ে বাঁচলো।
