“পুকরের দক্ষিণ দিকে যে ডোবাটা আছে ওইটা সাঁতরাইয়া পার হইতে পারবেন না? পানি কইলাম খুব বেশি নাই…কচুরিপানা দিয়া ভইরা আছে।”
দীর্ঘশ্বাস ফেললো ছফা। ইনফর্মকে কিভাবে খুলে বলে ঐ ডোবাতে ভয়ঙ্কর সব প্রাণী ঘুরে বেড়াচ্ছে। “ওখান দিয়ে সাঁতরে যাওয়া যাবে না। অন্য কোনো উপায় আছে কিনা বলেন।”
“ক্যান? ওইখান দিয়া সমস্যা কি?”
“অনেক সমস্যা আছে..ওখান দিয়ে আমি কেন, কেউই সাঁতরে পার হতে পারবে না।”
“কন কি?” বোঝাই যাচ্ছে ইনফর্মার অবাক হয়েছে কথাটা শুনে।
“আর কোনো উপায় নেই?”
“এটটু খাড়ান!” ফিসফিসিয়ে বললো আতর।
“কি হয়েছে?” চাপাকণ্ঠেই জানতে চাইলো ছফা।
“একটা গাড়ি আইসা থামছে গেটের সামনে!”
“কি?!” আৎকে উঠলো ছফা। পুলিশ নাকি? হতে পারে। মহিলা নিজে কিছু না করে পুলিশ ডেকে এনেছে। এজন্যেই কি তাকে বাড়ির মধ্যে পেয়েও কিছু করে নি মুশকান জুবেরি?
৪. ফোনটা কানে চেপে রেখে
অধ্যায় ১৬
ফোনটা কানে চেপে রেখেই আতর দেয়ালের সাথে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
জমিদার বাড়ির সামনে একটা গাড়ি এসে থেমেছে এইমাত্রহেডলাইট দুটোর উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত হয়ে আছে মেইনগেটের সামনের অংশ। দারোয়ান গেটের তালা খুলে দিচ্ছে। একটু পরই ঘরঘর শব্দ করে ভারি গেটটা খুলে গেলো।
“আরে না, পুলিশ না,” ফোনের অপরপ্রান্তে থাকা ছফাকে বললো সে। “বেটির মালগাড়ি।”
কাভার্ডভ্যানটা এখনও হেডলাইটের আলো জ্বালিয়ে রেখেছে। মেইনগেটটা পুরোপুরি খুলে গেলে আস্তে করে ভেতরে ঢুকে পড়লো ওটা। গাড়ি ঢুকে যাবার পরও দারোয়ান গেটটা টেনে পুরোপুরি লাগালো না, একটু ফাঁক করে রাখলো।
“মালগাড়ি?” ফোনে বলে উঠলো ছফা।
“হ। বেটির এই গাড়িটা হোটেলের মালপত্র টানে।” আতরের চোখ মেইনগেট থেকে সরছে না। একটু দূর থেকে দেখলেও সে বুঝতে পারলো গেটটা পুরোপুরি বন্ধ করা হয় নি। “ঐ গেটটা কইলাম খোলা আছে। এহন আপনে চান্স নিবার পারেন।”
অপরপ্রান্তে ছফা অবাক হলো। “গেট খোলা আছে কেন?”
“গাড়িটা আবার বাইর হইবো এটটু পর।” আতর এটা জানে। এর আগেও রাতের বেলায় এখান দিয়ে যাতায়াতের সময় দেখেছে এই গাড়িটা বাড়ি থেকে বের হচ্ছে। কৌতূহলী হয়ে সে পরদিনই মুশকান জুবেরির হোটেলের এক বাবুর্চির কাছে জানতে চেয়েছিলো। ঐ লোকটার সাথে বেশ ভালো খাতির ছিলো তার। গতবছর সে হোটেলের চাকরি ছেড়ে টাউনের শেষ মাথায় নিজেই একটা হোটেল দিয়ে বসে কিন্তু ডাইনিটার মতো সুস্বাদু আর জাদুকরী খাবার বানাতে পারে নি। সেই লোক আতরকে বলেছিলো, মাঝরাতে জমিদার বাড়ি থেকে পরদিনের সমস্ত মাল-মসলা আর কাঁচা খাবার নিয়ে আসা হয়।
“ঐ গাড়িটা মালপত্র নিয়া..ধরেন, পনেরো-বিশ মিনিটের মইদ্যে বাইর হয়া যাইবো।”
ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে কোনো কথা ভেসে এলো না। সম্ভবত, সাংবাদিক ভাবছে মালপত্র নিয়ে গাড়িটা চলে গেলেই বা কী?
“আপনে এই চান্সে বাড়ি থেইকা বাইর হয়া যান,” আর তার কথা শেষ করলো।
“কিভাবে?”
“আমি দেওয়ালের উপরে উইঠা আপনেরে ডাইরেকশন দিমু…ক্যাঠায়। কোনখানে আছে কমু…আপনে বাও বুইঝা আগাইবেন, বুঝলেন?”
অপর প্রান্তে নুরে ছফা কতোটা বুঝতে পারলো কে জানে।
“হ্যালো? বুঝছেন?” সাংবাদিক চুপ মেরে আছে বলে তাড়া দিলো সে।
“হ্যাঁ, হ্যাঁ, আছি,” তড়িঘড়ি বললো ছফা, “কিন্তু ঐ মহিলা আর কাজের মেয়েটা…ওরা তো দেখে ফেলতে পারে?”
“আপনে না কইলেন হেরা আপনেরে দেখছে?”
আতরের মোক্ষম প্রশ্নে কয়েক মুহূর্তের জন্য জব্দ হয়ে গেলো ছফা। “হ্যাঁ, মানে, তা দেখেছে কিন্তু…”
“তাইলে আর পবলেম কি..জলদি বাইর হয়া যান। আমি সাইকেলের উপরে উঠলাম…আপনে বাও বুইঝা আগাইতে থাকেন…?”
“ঠিক আছে।”
আতর ফোনটা বুক পকেটে রেখে সাইকেলের সিটের উপর দাঁড়িয়ে পড়লো। দেয়ালের উপর দিয়ে তাকালো বাড়িটার ভেতরে। ফোনটা আবার ডানকানে চেপে ফিসফিসিয়ে বলে যেতে লাগলো ছফাকে :
“গাড়িটা কইলাম বাড়ির সামনের দিকে যে দরজাটা আছে সেইখানে রাখছে.ড্রাইভার নিয়া দুইজন…একজন বাড়ির ভিতরে গেলো…ড্রাইভার গাড়িতেই আছে।”
“ঐ বোবা ছেলেটা কোথায়?” অপরপ্রান্ত থেকে চাপাকণ্ঠে জানতে চাইলো ছফা।
“হে তো গেটে নাই..দেহা-ও যাইতাছে না…” তীক্ষ্ণণ চোখে বাড়িটার চারপাশে তাকালো ইনফর্মার। “মনে লয় মলপত্তর টানার কামে হাত লাগাইতাছে।” কয়েক সেকেন্ড পরই তার কথার সত্যতা পাওয়া গেলো। বোবা দারোয়ান আর অন্য একটা ছেলে দু-হাতে কিছু মালপত্র নিয়ে বেরিয়ে এলো বাড়ির ভেতর থেকে। কাভার্ডভ্যানের পেছনের দরজা খোলাই আছে, ওরা দু জন হাতের মালগুলো গাড়ির ভেতরে রেখে আবার চলে গেলো বাড়ির ভেতরে। এই পুরো ব্যাপারটা ফোনের মাধ্যমে ছফাকে জানিয়ে দিলো আতর।
“তাহলে বোবা ছেলেটা মালপত্র লোড করার কাজে ব্যস্ত?”
“হ, ছফার প্রশ্নে জবাব দিলো সে। “টাইম নষ্ট না কইরা আগাইতে শুরু করেন। হেরা হেগো কাম করতাছে, আপনে আপনের কাম করেন।”
“ঠিক আছে।”
কানে ফোন চেপে রেখে বাড়িটার ভেতরে কড়া নজর রাখলো ইনফর্মার। কাভার্ডভ্যানের ড্রাইভার নিজের সিটে বসে আছে এখনও। বোবা আর অন্য লোকটা বাড়ির ভেতরে যাবার পর আর বের হয়ে আসে নি।
“আগান,” তাড়া দিলো আতর। “একদম ক্লিয়ার আছে। বোবা আর। হোটেলের পোলাটা ভিতরে ঢুকছে…”
