সত্যি বলতে আতর একটু ভয়ই পেয়ে গেলো। ভুত-প্রেতের ব্যাপারে তার বিশ্বাস একটু অদ্ভুত রকমের-থাকলেও থাকবার পারে! জমিদার বাড়ির গেট খোলার শব্দ শুনতে পাচ্ছে সে। তার মনে হচ্ছে ফালু বুঝি এখনই চলে আসবে এখানে। সে যে এখানে লুকিয়ে আছে সেটা কেউ জানে না, তারপরও মনের মধ্যে এই ভয়টা কাজ করছে।
ঢোক গিললো ইনফর্মার। ফালুর ভারি পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছে। সে কি এখানেই আসছে?!
আস্তে আস্তে ভারি পায়ের শব্দটা মিইয়ে গেলে হাফ ছেড়ে বাঁচলো। তার পকেটে ফোন আছে, পাঁচ-ছয় টাকার মতো ব্যালান্সও আছে তাতে কিন্তু সাংবাদিককে ফোন দিতে পারছে না। ওসির হাতে চরথাপ্পড় খাবার সময় ফোনটা তার হাতে ছিলো, ছিটকে মাটিতে পড়ে ডিসপ্লেটা নষ্ট হয়ে গেছে। এখন শুধুমাত্র ইনকামিং ফোন রিসিভ করতে পারে। টাউনের এক মোবাইল মেকানিককে দেখিয়েছিলো, দুমুখ ছেলেটা বলেছে, টাকা খরচ করে এই সস্তা ফোন ঠিক না-করিয়ে নতুন আরেকটা কিনলেই ভালো হয়। কিন্তু নতুন ফোন কিনতে যে টাকা লাগবে সে-টাকা কই? থানায় যেতে পারে না বলে ইনকাম অনেক কমে গেছে, নইলে এই কানা-ফোন নিয়ে কে ঘুরে বেড়ায়!
কী করবে বুঝতে না পেরে কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ বসে রইলো আতর। গাঁজার নেশা পুরোপুরি কেটে গেছে, আরেকটা স্টিক আছে পকেটে, ওটা ধরাবে কিনা বুঝতে পারলো না, এমন কি এখান থেকে ফিরে যাবার সিদ্ধান্তটাও নিতে পারছে না সে। সাংবাদিক যদি ডাইনির বাড়িতে ঢুকে কোনো বিপদে পড়ে থাকে তাহলে তার কীই বা করার আছে, শুধু শুধু বাড়ির আশেপাশে ঘুরঘুর করা ছাড়া?
অবশেষে ঠিক করলো টাউনে ফিরে যাবে। এখানে সাইকেলটা এভাবে পড়ে থাকলে চোর-বাটপারের খপ্পরে পড়ে যেতে পারে, তারচেয়ে ভালো হবে ওটা নিয়েই ফিরে যাওয়া, তাহলে টাউনে যেমন হেঁটে যেতে হবে না তেমনি বেচারা ম্যানেজারেরও একটা সম্পত্তি রক্ষা পাবে।
সাইকেলের হ্যান্ডেলটা যে-ই না ধরতে যাবে অমনি একটা কথা মনে পড়ে গেলো তার। সাইকেলটা রেখে পকেটে হাত ঢোকালো সে।
*
ছফা প্রথমে ভেবেছিলো ইনফর্মার আতর যে-রকম জ্বলজ্বলে চোখ দেখেছিলো এই বাড়িতে ঢু মেরে সেও বুঝি ঠিক একই জিনিসের দেখা পেতে যাচ্ছে অবশেষে। কিন্তু না, তাকে কয়েক সেকেন্ডের দমবন্ধ করা উত্তেজনা থেকে মুক্তি দিলো চোখ দুটোর মালিক নিজেই!
লেজ গুটিয়ে হারামজাদা পালিয়ে গেলো।
হাফ ছেড়ে বাঁচলো সে। সম্ভবত একটা শেয়াল ভগ্নপ্রায় মন্দিরে বাসা বেঁধেছে।
পুকুর পাড়ে চলে এলো আবার। এখান থেকে বের হওয়াটা তার জন্য যে খুব কঠিন তা নয়। পকেটে মোবাইলফোন আছে, বেশি সমস্যা হলে বাধ্য হয়ে ওটাই ব্যবহার করতে হবে কিন্তু তাতে করে…
ছফার চিন্তায় ব্যাঘাত ঘটিয়ে তার ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠলো। এখানে ঢোকার আগেই রিংটোন অফ করে ভাইব্রেট মোড়ে দিয়ে রেখেছিলো। মন্দির থেকে একটু সরে নীচু হয়ে বসে পড়লো সে, পুকুরের ওপাড় থেকে কেউ যেনো তাকে দেখতে না পায় সেজন্যে।
ডিসপ্লেতে কলার-আইডি দেখে বিষম খেলো।
আতর আলী??
এতো রাতে সে কেন ফোন দেবে? তার নাম্বারই বা পেলো কোত্থেকে? যতোদূর মনে পড়ে, ইনফর্মারকে সে তার ফোন-নাম্বার দেয় নি। দ্রুত কলটা রিসিভ করতেই কণ্ঠটা ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো :
“আপনে কই? ঠিক আছেন তো?”
“আপনি…আমার নাম্বার পেলেন কোথায়?”
“তার আগে কন, আপনে কি ঐ বেটির বাড়িতে হান্দাইছেন নি?”
ছফা খুবই অবাক হলো। “আ-আপনি কি করে জানলেন আমি…মানে, আমি ঐ-”
“আপনের কি মাথা খারাপ হয়া গেছে!” ছফাকে মাঝপথে থামিয়ে দিলো ইনফর্মার, “আমি কেমনে জানলাম হেইটা জরুরি না…আগে কন, এহন কই আছেন? ঠিকঠাক আছেন তো?”
কথাটা বলার আগে ঢোক গিলে নিলো সে। “আ-আমি তো…জোড়পুকুর পাড়ে…মানে, জমিদার বাড়ির ভেতরে আটকা পড়ে গেছি।”
“কি??” বিস্মিত আতর বলে উঠলো। “ওরা আপনেরে আটকায়া রাখছে!?”
“আরে না..ধরা পড়ি নি..আমি পুকুরপাড়ে ঢুকে পড়েছি…এখন বের হতে পারছি না।”
“আপনেরে ওরা কেউ দেহে নাই? কেউ কিছু টের পায় নাই?!” ইনফর্মার খুবই অবাক।
গভীর করে দম নিয়ে নিলো ছফা। “অনেক ঘটনা আছে। সবই বলবো, তবে এখন না। আগে আমাকে এখান থেকে বের হতে হবে। এবার বলেন এখান থেকে কিভাবে বের হবো?”
“আমার ফোনে টাকা নাই….আপনে ফোন দেন। ওপাশ থেকে বললো। আতর।
“ঠিক আছে, দিচ্ছি,” কলটা কেটে দিয়ে ইনফর্মারের নাম্বারে ডায়াল করলো। রিং হতেই রিসিভ করলো সে।
“..আপনে তো ঢুকছেন দেয়াল টপকাইয়া…সাইকেলের উপর উইঠা..না?”
“হুম।” এবার বিস্মিত হলো ছফা। এই লোক এটাও জানে? কিভাবে?
“এহন তো ঐখান দিয়া বাইর হইতে পারবেন না। ফালু হারামজাদা একটু আগে বাইর হয়া গেছে…বোবারে দেখলাম গেটে আইসা বইছে।”
“আপনি কিভাবে দেখলেন?” ছফার কণ্ঠে বিস্ময় সরছেই না।
“আমি এহন ঐ সাইকেলের সামনেই আছি। এটুটু আগে দেওয়ালের উপর দিয়া বাড়ির ভিতরটা দেখছি।”
“বলেন কি?” কথাটা শুনে ছফা নতুন করে মনোবল ফিরে পেলো।
আতর চুপ মেরে রইলো কয়েক মুহূর্ত।
“হ্যালো?”
“আছি তো..ক?”
“এই বাড়ির অন্য কোনো দিক দিয়ে বের হবার রাস্তা নেই?”“
“উমম,” আতর মনে করার চেষ্টা করলো। বর্তমানে জমিদার বাড়ির ভেতরে কোথায় কি আছে সে জানে না। সেই ছোটোবেলায় যখন বাড়িটা পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে ছিলো তখন তারা বন্ধুরা মিলে মাঝেমধ্যে চোর-পলান্তি খেলতো। সেই স্মৃতি থেকে যতোটুকু জানে, বাড়ির ভেতরে জোড়পুকুর আর তার তিনদিকেই রয়েছে জলাশয়। বাইরে থেকে এখনও সেটা বোঝা যায়। তবে আগের মতো গেটটা খোলা থাকে না। কোনো ভাঙা দেয়ালও নেই যে ওখান দিয়ে বের হওয়া যাবে। মহিলা এই বাড়িটাকে শুধু মেরামতই করে নি, একেবারে দূর্গের মতো বানিয়ে ফেলেছে। “আপনে সাঁতার জানেন?” কয়েক মুহূর্ত পর জিজ্ঞেস করলো সে। “জানি..কেন?”
