জমিদার অলোক বসুর বাড়িটিও ঠিক সেভাবে নিরাপদ করে রাখা। হয়েছে। তবে ছফার বিশ্বাস হচ্ছে না, এটা জমিদার অলোকনাথ কিংবা তার বাপ-দাদাদের কাজ। তার দৃঢ় বিশ্বাস, রহস্যময়ী মুশকান জুবেরি বাড়ির তিনদিকে ঘিরে থাকা জলাশয়ে কুমীর চাষ শুরু করেছে নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা গড়ে তোলার জন্য। হয়তো বাড়িটার চারপাশে নীচু ভূমি কিংবা জলাশয় ছিলো আগে থেকেই, মহিলা ওটার সদ্ব্যবহার করেছে মাত্র।
ভালো করে তাকালো চারপাশে। পশ্চিমদিক বাদে জোড়পুকুরের তিনদিকই উঁচু ঢিবি দিয়ে ঘেরা। গ্রামের ছেলে হিসেবে ছফা জানে এটা করা হয় বন্যার হাত থেকে পুকুরকে রক্ষা করার জন্য। বিশেষ করে নীচু জমি, যেগুলো বন্যার পানিতে তলিয়ে যায় সেখানকার পুকুরের চারপাশ এভাবে উঁচু টিবি দিয়ে সুরক্ষিত করা হয়। জমিদার বাড়িটি বেশ উঁচুতে বানানো হয়েছে বলে জোড়পুকুরের পশ্চিম দিকটায় টিবি দেবার দরকার পড়ে নি।
পুকুর পাড়ের তিনদিকই সারি সারি নারকেল, সুপারিসহ আরো অসংখ্য গাছে ঘেরা। ছফা পুকুরপাড়ের ঢালের নীচ দিয়ে এগোতে লাগলো। তার বামদিকে সমান্তরালে কাঁটাতারের বেড়া চলে গেছে, ওপাশের প্রাণীগুলো এখনও দাপাদাপি করছে অল্পপানিতে। পুকুরের দক্ষিণ দিকটা ঘন গাছপালায় পরিপূর্ণ। ঝোপের সংখ্যাও বেশি। দেখে মনে হচ্ছে এই অংশটা পরিত্যক্ত কোনো জায়গা। অন্ধকারে দেখতে পেলো কালচে একটা টিবি পুকুরপাড় থেকে দক্ষিণ দিকে হেলে আছে। খুব কাছে যেতেই চোখে পড়লো গাছগাছালির ফাঁকে ভগ্নপ্রায় একটা দালান। ভালো করে তাকালো সে। বুঝতে পারলো একটা পুরনো মন্দির।
এটা তার আগেই বোঝা উচিত ছিলো। এরকম জমিদার অবশ্যই বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে মন্দির বানাবে। এরাও তাই করেছে। তবে দীর্ঘদিন অযত্নে থেকে মন্দিরটা এখন ভগ্নসতুপ ছাড়া আর কিছু না। সেই ভগ্নসতুপের চারপাশে বেড়ে উঠেছে আগাছা, ঝোঁপঝাঁড়, এমনকি বড় বড় গাছ-গাছালি। যুদ্ধের পর জমিদারের সব সম্পত্তি বেহাত হয়ে যাওয়ার কারণে মন্দিরটা আর ব্যবহার করা হয় নি সম্ভবত। আর মুশকান জুবেরি কয়েক বছর আগে বাড়িটা রেস্টোরেশন করলেও মন্দিরের কিছু করে নি। যে মন্দিরে নিয়মিত প্রার্থনা করা হবে না সেটা অচিরেই বেহাল দশায় পরিণত হবে।
ভগ্নস্তূপটার সামনে শুধু ঝোঁপ-ঝাঁড়ই গজায় নি, বড় বড় গাছপালা জন্মে প্রায় ঢেকে রেখেছে স্থাপনাটি। মাথার উপরে ঝুঁকে আসা গাছের ডালপালা আর ঝোঁপ-ঝাঁড় সরিয়ে ভগ্নপ্রায় মন্দিরের ভেতরে ঢুকে পড়লো সে। সাপখোরের ভয় করছে না শীতকাল বলে। এ-সময়ে ওইসব জঘন্য আর বিপজ্জনক প্রাণীরা শীতনিদ্রায় থাকে।
একটা শিবমন্দির। আকারে বেশ ছোটো। ফলার মতো তীক্ষ্ণ চূড়াটা ভেঙে যাওয়ায় চেনা যাচ্ছে না। ভেতরের ছোটো কক্ষটি আগাছা আর মাটিতে পরিপূর্ণ। স্থাপনাটির একপাশ দিয়ে সাবধানে পা ফেলে ফেলে ছফা চলে এলো বিপরীত দিকে। হতাশ হয়ে দেখতে পেলো এটাই আসলে মন্দিরের সম্মুখভাগ, আর তার সামনে জলাশয়। নীচু এই জলাশয় চলে গেছে ডানে-বামে আর সামনের দিকে। মন্দিরের সামনের দিকে জলাশয়টি কচুরিপানায় পরিপূর্ণ। খালি চোখে দেখতে পাচ্ছে না পুকুরের পুবদিকের জলাশয়ের সাথে এটা মিশে গেছে কিনা।
খুট করে শব্দ হতেই চমকে উঠলো সে। ঐ কুমীরের বাচ্চাগুলো না তো?! জলাশয়টি যদি বিচ্ছিন্ন না থাকে তাহলে কুমীরগুলো এখানেও চলে আসতে পারে যেকোনো সময়!
দ্রুত ভাঙামন্দির থেকে বের হবার জন্য যে-ই না ঘুরে দাঁড়িয়েছে অমনি ছফার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো।
সামনের ঝোপের মধ্য থেকে একজোড়া জ্বলজ্বলে চোখ চেয়ে আছে তার দিকে!
.
অধ্যায় ১৫
আতর আলী সাইকেলের সিটের উপর থেকে নেমে পড়েছে দ্রুত। এখন দেয়ালের নীচে বসে আছে ঘাপটি মেরে।
একটু আগে দেয়ালের উপর দিয়ে দেখছিলো বাড়িটা কেমন সুনশান। মানুষজন আছে বলে মনে হয় না, কারো কেনো সাড়াশব্দ নেই, শুধু দোতলার একটা ঘর থেকে মৃদু লালচে আলো দেখা যাচ্ছে। তবে দারোয়ান। ইয়াকুবকে গেটের কাছে না দেখে সে বুঝে গেছিলো ঐ বোবা নিশ্চয় লীলাখেলায় মশগুল। তার তো গেটের পাশেই থাকার কথা। রাতের এ সময় ওখানে না থাকার একটাই মানে-কাজের মেয়েটাকে নিয়ে ওসব শুরু করে দিয়েছে। দৃশ্যটা কল্পনা করে সুড়সুড়ি পেলো না আতর, বরং ঈর্ষায় আক্রান্ত হলো!
দেয়াল টপকানোর কথা ভাবলেও দ্বিধায় পড়ে গেছিলো। স্বল্পপরিচিত কারোর জন্য এতোবড় ঝুঁকি নেয়ার কোনো মানেই হয় না। নুরে ছফা নামের সাংবাদিক তার কাছ থেকে সব শোনার পরও জেনেশুনে ঐ বাড়িতে ঢুকে পড়েছে। তার যদি কিছু হয় সেজন্যে নিজেই দায়ি হবে। লোকটার কি হয়েছে সে-সম্পর্কে অবশ্য বিন্দুমাত্র ধারণাও করতে পারছে না আতর, তবে খারাপ কিছু হয়েছে বলেই মনে করে সে, তা না-হলে অনেক আগেই ঐ বাড়ি থেকে
বের হয়ে আসতো।
সাইকেলের সিটের উপর দাঁড়িয়ে যখন এসব ভাবছিলো তখনই দেখতে পায় দারোয়ান ছেলেটা বাড়ির পেছন থেকে বেরিয়ে আসছে, আর তার পেছনে ঐ গোরখোদক।
ফালু!
সঙ্গে সঙ্গে সাইকেলের উপর থেকে নেমে দেয়ালের পাশে চুপচাপ বসে পড়ে সে। এই বাড়িতে এতোক্ষণ ধরে হারামজাদা কী করছে! তারচেয়েও বড় কথা, ফালু যদি এখানে এই বেটির বাড়িতে থেকে থাকে তাহলে কবরস্তানে তাকে কে ধাওয়া করলো?!
