মাথা নেড়ে সায় দিলো ইনফর্মার। “যাও, তাইলে নেকি কামাও গিয়া।”
রহমান মিয়া আর কোনো কথা না বলে চলে গেলো।
ফাঁকা রাস্তায় ঘোরের মধ্যে হাঁটতে লাগলো আতর। তাহলে এ কারণেই হোটেলের ম্যানেজারের কাছ থেকে সাইকেলটা নিয়ে বেরিয়েছে সাংবাদিক। এটা আরো আগেই তার বোঝা উচিত ছিলো। ঐ লোক একটা কাজেই সুন্দরপুরে এসেছে-মুশকান জুবেরির ব্যাপারে খোঁজ-খবর নেয়া। সুতরাং সে যদি কোনো কারণে কোথাও গিয়ে থাকে তবে সেটা ঐ মহিলার ব্যাপারেই হবে।
আর কিছু না ভেবে হাটার গতি বাড়িয়ে দিলো সে। শীতের রাত যতো বাড়ে ততোই বাড়ে কুয়াশার তেজ। রাতের এ সময়টাতে ভারি কুয়াশা পড়ছে। আতরের গায়ে পাতলা একটা সোয়েটার। দুই হাত বুকের কাছে ভাঁজ করে শীতের প্রকোপ থেকে রক্ষা পাবার চেষ্টা করলো। পায়ের স্যান্ডেল ভেদ করে শীতের হিমবাতাস ঢুকে পড়ছে, তার চেয়ে বেশি ঢুকে পড়ছে লুঙ্গি দিয়ে।
দ্রুতগতিতে হেঁটে কয়েক মিনিটের মধ্যেই রবীন্দ্রনাথের সামনে চলে এলো। হোটেলটা বন্ধ থাকলেও জ্বলজ্বলে সাইনে বিরাট আর ভারিক্কি নামটা নির্জন মহাসড়কের পাশে প্রকটভাবে ফুটে উঠছে বার বার। সেদিকে তাচ্ছিল্যভরে চেয়ে একদলা থুতু ফেললো আতর। রবীন্দ্রনাথকে অতিক্রম করে মহাসড়ক থেকে নেমে গেলো ছোট্ট রাস্তায়। এই রাস্তাটা চলে গেছে। জমিদার বাড়ির দিকে। তার আশংকা সাংবাদিক ঐ ডাইনির বাড়িতে গিয়ে বিপদে পড়েছে। ফালুর ঘরে যা দেখেছে তা তো মামুলি কিছু নয়। এরকম একটা ছেলে, যে কিনা কবর থেকে লাশ তুলে নিজের ঘরের খাটের নীচে রেখে দেয়, তার সাথে মুশকান জুবেরির যে সম্পর্কই থাকুক সেটা নিশ্চয় ভালো কিছু নয়।
আতরের আরো মনে হলো, জমিদার বাড়িতে তার ঢোকার কাহিনীটা বলার পরই হয়তো সাংবাদিক এরকম সাহস দেখানোর কথা চিন্তা করেছে। গোরখোদক ফালু কেন ঐ মহিলার বাড়িতে ঢুকলো সেটা হয়তো খতিয়ে দেখার জন্য তার মতোই দেয়াল টপকে ঢুকে পড়েছে জমিদার বাড়িতে। কিন্তু শহরের লোকটার কোনো ধারণাই নেই ঐ ডাইনি কতোটা ভয়ঙ্কর।
জমিদার বাড়ির সামনে এসে দর থেকে মেইনগেটের দিকে তাকালো। সে জানে না বোবা দারোয়ান গেটের পেছনে আছে কিনা। দেয়াল টপকে জমিদার বাড়ির ভেতরে ঢোকার কোনো ইচ্ছে তার নেই। সে শুধু দেখতে চায় ভেতরের অবস্থাটা। দেয়াল বেয়ে উঠে বাড়ির ভেতরটা দেখবে বলে বামদিকের সীমানা প্রাচীর ধরে কিছুটা এগিয়ে গেলো। এর আগে যেখান দিয়ে উঠেছিলো সেখানে আসতেই কিছু একটা চোখে পড়লো তার। আবছা আবছা দেখতে পাচ্ছে কিন্তু বুঝতে একটুও অসুবিধা হলো না জিনিসটা কি।
সানমুনের ম্যানেজারের সাইকেলটা সীমানাপ্রাচীরে হেলান দিয়ে রাখা আছে। এরকম জায়গায় সাইকেলটা রাখার একটাই মানে ঐ সাংবাদিক ঠিক এখান দিয়েই দেয়াল টপকে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়েছে।
হালার সাম্বাদিক করছেটা কি!
*
বিস্ময়লাগা ভয়ের সথে ছফা দেখতে পাচ্ছে কুৎসিত কিছু প্রাণী কাঁটাতারের বেড়ার ওপাশে ছিপছিপে পানিতে নড়াচড়া করছে। প্রাণীগুলোর আকার বেশি বড় নয়। সম্ভবত শিশু অবস্থায় আছে এখন। কিন্তু ওদের মা-বাবারা নিশ্চয় জলাশয়ের মধ্যেই ঘোরাফেরা করছে!
ছফার মাথায় ঢুকছে না, এসব ভয়ঙ্কর প্রাণী এখানে কেন। এদের তো এখানে থাকার কথা নয়। সেও গ্রামের ছেলে, পনেরো-ষোলো বছর বয়স পর্যন্ত গ্রামেই থেকেছে। এসএসসি পাস করে ঢাকা শহরে চলে গেলেও গ্রামের সাথে তার সম্পর্ক এখনও অটুট, সুযোগ পেলেই গ্রামে চলে যায়, নদীতে পুকুরে সাঁতার কাটে। কই, কখনও তো এরকম জিনিস দেখে নি।
আতর বলেছিলো মুশকান জুবেরি মাছ চাষ করে, শাক-সবজি আবাদ করে, এমনকি গরুর খামারও দিয়েছে কিন্তু এই জিনিসের কথা বলে নি! আবারো বুঝতে পারলো, ইনফর্মার কতোটা অজ্ঞ এই রহস্যময়ী মহিলার ব্যাপারে। এর কারণটাও সে ধরতে পারলো-মুশকান জুবেরির সাথে এখানকার সব হোমরাচোমরাদের খাতির-মহিলার ব্যাপারে নাক গলানোর সাহস কেউ রাখে না। আতর আলী ভেবে দেখেছে, এসব ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়ে কোনো লাভ নেই, বরং ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি। এখন কিছু টাকা কামাই করার ধান্দা পেয়েছে বলে তাকে সাহায্য করছে মহিলার ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিতে।
মাত্র দশ-বারো গজ দূরে কুৎসিত প্রাণীগুলো ছিপছিপে পানিতে দাপাদাপি করলেও ছফা ওগুলোকে নিয়ে ভয় পাচ্ছে না, তার কারণ কাঁটাতারের বেড়ার জন্য ওরা তার কাছে ঘেষতে পারবে না। তবে তার ভয় হচ্ছে অন্য কারণে–এখান থেকে বের হবার রাস্তাটা কোথায় বুঝতে পারছে। না।
ক্ষয়িষ্ণু চাঁদ হেলে পড়েছে আকাশে। চারপাশে আবারো নজর দিলো সে। তার ধারণা, মহাসড়কটি এই বাড়ির দক্ষিণ দিকে। সড়ক আর বাড়ির মাঝখানে বিস্তৃর্ণ ক্ষেতসহ কিছু নীচু জমি আছে। বাড়ির সীমানাপ্রাচীরের দক্ষিণ দিকেও জলাশয় দেখেছে সে। পুবদিকের জলাশয়ের সাথে দক্ষিণ দিকের জলাশয়ের সংযোগ আছে কি? সে নিশ্চত হতে পারছে না। নিশ্চিত জানা থাকলে ওদিক দিয়েই বের হবার চেষ্টা করতো। তার কেনজানি মনে হচ্ছে জমিদার বাড়িটার তিন-দিক দিয়েই অশ্বখুড়াকৃতির জলাশয় ঘিরে রেখেছে-অনেকটা প্রাচীনকালের দূর্গের মতো। দিল্লির লালকেল্লার তিন দিকেও এরকম পরিখা খনন করা আছে। মুঘল জমানায় ওইসব পরিখাতুল্য জলাশয়ে দানবাকৃতির কুমীর ঘুরে বেড়াতো–একটা প্রাকৃতিক নিরাপত্তা বর্ম!
