কিন্তু তার পেছনে যে প্রাকৃতিক জলাশয়টি আছে ওখানে নিশ্চয় মাছ চাষ করা হয় না। ওরকম মুক্ত জলাশয়ে মাছচাষ করবে কোন বোকা! সে যতোটুক বুঝতে পারছে, পুকুরেই মাছচাষ করা হয়। তাহলে জলাশয়ে ওগুলো কি?
ছফা আস্তে করে তালু দিয়ে নীচে নেমে এলো। পুকুরের পেছন দিকটা বিস্তৃর্ণ নীচু জলাশয় চলে গেছে পুবদিকে। ক্ষয়িষ্ণু চাঁদের আলোয় ভালো করে তাকিয়ে দেখলো তার থেকে দশ-বারো হাত দূরে জলাশয়টি প্রায় পাঁচফুট উঁচু কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে পুকুরপাড় থেকে আলাদা করা হয়েছে। রাতের অন্ধকারে প্রথম দেখায় ওটা চোখে পড়ে নি।
সেই কাঁটাতারের দিকে কয়েক পা এগিয়ে গেলো সে। পানির মধ্যে যে জিনিসটা নড়াচড়া করছে সেটা যেনো উঠে আসছে কাঁটাতারের দিকে। একটু কুঁজো হয়ে ভালো করে দেখলো, সঙ্গে সঙ্গে ভিরমি খেলল সে। এগুলো কী?
.
অধ্যায় ১৪
সুরত আলীর ‘ফাইভ-স্টার হোটেলের টয়লেটে কয়েক মিনিট থেকেই আতরের বমি হবার জোগার হলো। এই হোটেলের নীচতলাটি একদম সস্তা কাস্টমারদের জন্য, ফলে এখানকার সব কিছুই জঘন্য। মশার উপদ্রব যেমন তেমনি টয়লেটের দুরাবস্থা। সুরত আলীর ভাবসাব অনেকটা এমন এসব না পোষালে একটু বেশি টাকা খরচ করে দোতলায় থাকো, কে মানা করেছে?
সস্তার তিন অবস্থা। সুয়ারেজ লাইন জ্যাম হয়ে আছে। হাগা-মুতা সব জমে আছে প্যানে। তার উপরে তিন-চারটা ব্যবহৃত কনডম ভাসছে।
ওয়াক! নাক চেপে কয়েক মিনিট পার করে দিয়ে বেরিয়ে এলো বাইরে। এই সানমুনে আর থাকা যাবে না। এমন কি এর বাইরেও নয়। ওসিসাব একটু ফুর্তি করতে এসেছে। তার ত্রি-সীমানায় থাকার ইচ্ছে নেই আতরের।
হাতে ঘড়ি নেই বলে হোটেল থেকে বের হবার সময় ম্যানেজারের ডেস্কের পেছনে দেয়াল ঘড়িটা দেখে নিলো। রাত ১২টা বাজতে বেশি বাকি নেই, অথচ সাংবাদিক এখনও হোটেলে ফিরে আসে নি। তার কাছে ব্যাপারটা মোটেও ভালো ঠেকছে না। মনের একটা অংশ বলছে, এসব নিয়ে এতো মাথা ঘামিয়ে কী লাভ? ঐ সাংবাদিককে মাত্র দু-দিন ধরে চেনে। এরকম একজনের জন্য এতো দুশ্চিন্তা করার কী আছে। আবার অন্য অংশটা খারাপ কিছুর আশংকা করে কিছুটা উতলা হয়ে উঠছে।
নিজের বাড়িতে ফিরে যাওয়াটা তার জন্য কোনো ব্যাপারই না, এখান থেকে হেঁটে গেলে পাঁচ মিনিটের পথ কিন্তু সেখানে গিয়ে কী করবে? কে আছে তার জন্য? একা মানুষ। রাতের বেলায় ঘরে ঢুকলেই মনে হয় সে দুনিয়াতে সবচেয়ে একলা। সারাদিন এটা-ওটা করে নিজের একাকীত্ব ভুলে থাকা যায় কিন্তু রাত খুবই নির্মম। তাকে সারারাত নিধুম রেখে জানিয়ে দেয়। আদতে সে বড় একা।
এমনিতেও সে রাত-বিরাতে ঘুরে বেড়ায়, যতোটুকু সম্ভব নিজের ঘরে ফিরে যাওয়াটা এড়াতে চায়। থানার সাথে ঝামেলা না-হলে রাত দুটা-তিনটা পর্যন্ত পুলিশদের সাথেই কাটিয়ে দিতো। মুরগি ধরা আর ডিম বের করার কাজে পার করে দিতো সারাটা রাত। মুরগি ধরার কাজ না থাকলে অন্য কাজে ব্যস্ত থাকতো। জুনিয়র এসআই, কনস্টেবলদের সাথে ভাং খাওয়া, বাংলা মদে চুর হওয়া, কখনও কখনও ফেরিঘাটের বেশ্যাপাড়ায় ঢুঁ মারা-সবই করতো। ভালো গাঁজা আর মদ পেলে পুরুষ মানুষের জন্য রাত কাবার করাটা কী আর এমন কঠিন কাজ। তবে আতর একটা জিনিস কখনও খায় না ফেন্সিডিল। হতে পারে সে খুবই নগন্য মানুষ, তাই বলে কাশির সিরাপ খেয়ে নেশা করবে!
এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ থমকে দাঁড়ালো সে। সম্বিত ফিরে পেয়ে দেখলো পেছন থেকে কেউ তার নাম ধরে ডাকছে।
“অ্যাতো রাইতে কই যাও?” ফিরে তাকাতেই রহমান মিয়া বললো তাকে।
“তুমি এতো রাইতে কইথেইকা আইলা?” একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো আতর। রহমান মিয়া সাধারণত রাত দশটার পরই তার চায়ের দোকান বন্ধ করে দেয়। অনেক সময় এগারোটা পর্যন্তও খোলা রাখে, কিনতু কখনও বারোটা পর্যন্ত নয়।
“গেছিলাম একটু পুবপাড়ায়। তমিজের বাপটা আৎখা মইরা গেছে…হে আবার আমার জ্যাঠার সমন্ধি হয়।”
“ও,” আর কিছু বললো না আতর। এটা সে মাস্টারের বাড়ি থেকে ফেরার পথেই জেনেছিলো।
“শহরের মানুষটারে দেখলাম কানা-রাইতে সাইকেল নিয়া বাইর হইছে…এখন আবার তুমি এতো রাইতে ঘুরাফিরা করতাছো…ঘটনা কি?”
সাইকেলের কথা বলাতে আতর ভুরু কুচকে ফেললো। “সাইকেল নিয়া কারে দ্যাখছো?”
“এই তো, এটটু আগে তোমার ঐ শহরের লোকটারে সাইকেল চালায়। যাইতে দেখলাম…পরথমে তো চিনবারই পারি নাই…পরে মুখটা দেইখা চিনবার পারলাম।”
ইনফর্মারের মনে আর কোনো সন্দেহ রইলো না, রহমান মিয়া নুরে ছফারে দেখেছে।
“আমি দোকান বন কইরা তমিজের বাপের খবরটা দিতে গেছিলাম মোখলেস আর বেপারিরে…ওগোরে খবর দিয়া ফিরা আহনের সময় দেখলাম ঐ লোক সাইকেল চালায়া যাইতাছে।”
“কই যাইতাছিলো?”
“জোড়পুকুরের দিকে যাইতে দেখলাম।”
নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরলো আতর। জোরপুকুর মানে জমিদার বাড়ি। ঐ সাংবাদিক তাহলে মুশকান জুবেরির বাড়িতে গেছে! কিন্তু কিভাবে যাবে? সে নিশ্চয় গেটের কাছে গিয়ে বলবে না, আমি একজন সাংবাদিক, মুশকান জুবেরির সাথে দেখা করতে চাই? যদি সেটা করার চিন্তাও করে এতো রাতে নিশ্চয় করাবে না?
“কি ভাবতাছো?”
রহমান মিয়ার প্রশ্নে মাথা দোলালো সে। “না, কিছু না।”
“বাড়িতে যাওনের আগে আরো কিছু আত্মীয়-স্বজনরে খবরটা দিয়া যাই…মরার খবর যতো বেশি মানুষরে জানান যায় ততো বেশি নেকি, বুঝলা?”
