ম্যানেজার অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার দিকে চেয়ে রইলো।
“আগের মতো তো আর যাত্রাপালা হয় না…যাত্রাপালার মাইয়াগুলা কাম কাইজও পায় না…ওগোরে হোটেলে তুলেন…পিপড়ার মতো কাস্টমার আইবো।”
ম্যানেজার কিছু বলতে যাবে অমনি পুলিশের একটা জিপ এসে থামলো হোটেলের সামনে। আতর আর ম্যানেজার দু-জনেই জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো।
জিপ থেকে নামলো সাদাপোশাকের এক মাঝবয়সী লোক।
“ওসিসাব?!” বিস্মিত ইনফর্মার দাঁড়িয়ে পড়লো, ম্যানেজারের দিকে তাকালো সে। লোকটা আবারো বিব্রত ভঙ্গি করছে। “আপনে আগে কইবেন নাওসিসাব আইবো?” এ মুহূর্তে এরকম জায়গায় সুন্দরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকতার মুখোমুখি হতে চাইছে না। এমনিতেই এখন ওসির সুনজরে নেই, তার উপরে এরকম জায়গায় দেখা হয়ে গেলে লোকটা যতো না লজ্জায় পড়বে তারচেয়ে বেশি রেগে যাবে তার উপর।
“না, মানে–”।
হাত তুলে ম্যানেজারকে থামিয়ে দিলো সে। লোকটা এখন ডেস্ক ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। “ওসিসাব কি দোতলায় যাইবো?”
“হ।”
আতর আর দেরি না করে গজরাতে গজরাতে সোজা চলে গেলো নীচতলার টয়লেট রুমের দিকে।
*
জোড়-পুকুরের অপর পাড়ে উঁচু ঢিবির নীচে লুকিয়ে আছে ছফা। তার সারা শরীর চুলকাচ্ছে। ঘাড় থেকে পিঠ পর্যন্ত চুলকানির চোটে পুড়ে যাচ্ছে যেনো। সম্ভবত ঝোঁপে থাকা কোনো ছ্যাঙ্গা’ কিংবা ঐ জাতীয় কীট তার ঘাড় দিয়ে পিঠে ঢুকে পড়েছে। তুচ্ছ কীটটা এখনও তার পিঠের কোথাও লেগে আছে, তবে ছফা হাত ব্যবহার করে জ্যাকেটের উপর দিয়ে এমনভাবে ওটাকে পিষে ফেলেছে যে, ভর্তা না-হয়ে যায়-ই না। প্রাণীটা মরে গেলেও তার বিষ ঠিকই ছড়িয়ে দিয়েছে। ছফার ইচ্ছে করছে জ্যাকেট আর শার্টটা খুলে সামনের পুকুরের পানিতে নেমে গোসল করতে কিন্তু এ মুহূর্তে এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
ঢিবির তালুতে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে সে, তার নজর পুকুরের ওপাড়ে। গ্যাস-বাতির আলোয় দেখতে পাচ্ছে জোড়পুকুরটা আসলে দুটো পুকুর নয়, বরং ডিম্বাকৃতির বড় একটি পুকুর, তবে নারী-পুরুষের ঘাট দুটোর মাঝখানে মোটা দেয়াল চলে গেছে পানির মধ্য দিয়ে বেশ কিছুদুর। ফলে ঘাটে গোসল করতে আসা নারী-পুরুষের মধ্যে এক ধররেণর আড়াল তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। ছফার কাছে মনে হলো পুরুষ ঘাটটা ভেঙেচুরে আছে। এটা হয়তো খুব একটা ব্যবহৃত হয় না এখন।
একটু আগে যেখানে মাটিচাপা দেয়া হয়েছে সেখানে গোরখোদক ফালু হাতের বাতিটা উপরের দিকে তুলে ধরে আশেপাশে তাকাচ্ছে, খুঁজে বেড়াচ্ছে তাকে। ছফা যেখানে লুকিয়ে আছে দুর থেকে সেখানেও দেখার চেষ্টা করছে, তবে গোরখোদক পা বাড়াচ্ছে না। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে বোঝার চেষ্টা করছে তার অবস্থান।
এমন সময় বোবা দারোয়ান হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো সেখানে। গোরখোদকের সাথে হাত নেড়ে ইশারায় কথা বললো সে। ঘটনা কি জানতে চাইছে। পুকুরের অপরপাড়ের দিকে আঙুল উঁচিয়ে দেখালো ফালু।
ছফা বুঝতে পারছে তাকে এখন সটকে পড়তে হবে, তবে অপেক্ষা করলো ওই দু-জন এরপর কি করে সেটা দেখার জন্য। ওরা এদিকটায় আসতে নিলেই সে দৌড় দেবে। কিন্তু দৌড়ে যাবে কোথায়? ঘন অন্ধকারেও বুঝতে পারছে পুকুরের পুবদিকে সামান্য একটু নীচু জায়গার পরই বড়সড় জলাশয় আছে। সম্ভবত পানির ঠাঁই বেশি হবে না। সাঁতার দিতে গেলেও সেটা হবে বোকার মতো কাজ। আর পানির ঠাই কম হলে তো মহাবিপদ। এরকম জলাশয় দিয়ে দৌড়ে কতোটুকুই বা যেতে পারবে? দুই দু জন তাগড়া যুবক ঠিকই ধরে ফেলবে তাকে।
পুকুরের ওপাড়ে সিদ্ধান্তহীনতায় পড়ে যাওয়া দুই যুবকের দিকে চেয়ে রইলো সে। চকিতে বামদিকে তাকালো। চাঁদের মিয়মান আলোয় দেখতে পেলো, পুকুরের দক্ষিণ দিকে ঝোঁপঝাঁড়ের আধিক্য বেশি। বড় বড় গাছও রয়েছে প্রচুর। সম্ভবত ওখান দিয়ে এগিয়ে গেলেই এই বাড়ি থেকে বের হওয়া যাবে।
ঠিক এ-সময় পুকুরপাড়ে টর্চ হাতে চলে এলো মুশকান জুবেরি। তাকে দেখে বোবা দারোয়ান আর গোরখোদক ছেলেটা এগিয়ে গেলো। দূর থেকে ওদের কোনো কথাই বুঝতে পারছে না ছফা, এমনকি শরীরি ভাষাটাও পড়তে হিমশিম খাচ্ছে। তবে, ফালু আর দারোয়ান কেন তাকে ধরার জন্য এদিকটায় এসে পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে আছে সেটা তার মাথায় ঢুকছে না। ছফাকে আরো বেশি বিস্মিত করে দিয়ে বোবা আর গোরখোদক চুপচাপ ভেতরের বাড়িতে চলে গেলো!
মুশকান জুবেরি টর্চ হাতে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইলো সেখানে। তার স্থিরদৃষ্টি ঠিক সেখানে নিবদ্ধ যেখানে ছফা লুকিয়ে আছে। তারপরই ঘুরে চলে গেলো মহিলা।
বলতে গেলে পাঁচ মিনিটের মতো বিবশ হয়ে রইলো সে। মুশকান জুবেরিসহ এই জমিদার বাড়ির কারোর আচরণ বোধগম্য হচ্ছে না তার কাছে। এরা কি স্বাভাবিক মানুষ?
ওরা বাড়ির ভেতরে চলে যাবার পর সুনসান নীরবতা নেমে এলো জোড়পুকুর পাড়ে। যেভাবে ছিলো সেভাবেই পড়ে রইলো সে। যেনো ঘোরের মধ্যে চলে গেছে। তাকে যে এখন পিতৃপ্রদত্ত জীবনটা নিয়ে এখান থেকে পালাতে হবে সে-খেয়াল নেই। তার ঘোর কাটলো অদভুত এক শব্দে। চমকে পেছন ফিরে তাকালো। পেছনের জলাভূমিতে কিছু একটা নড়ছে।
মাছ? সম্ভবত।
মুশকান জুবেরি যে বিভিন্ন ধরণের কৃষিজ ফলনের সাথে জড়িত এটা সে জানে। ক্ষেতে শাক-সবজি, ফলমূল আর পুকুরে মাছ চাষ করে। এমন কি, নিজের বাগানের একপাশে ঔষধি গাছের সংগ্রহও রয়েছে তার। বিপুল জমির প্রায় সবটাই কাজে লাগিয়েছে মহিলা।
