তাই হলো। দুই-তিন মিনিট পরই ওখানে আলোর বন্যা বইয়ে দিয়ে বেরিয়ে এলো একজন। ফালুর একহাতে সেই গ্যাস-বাতি, অন্যহাতে গামছা, ওটা দিয়ে মুখে-গলায় ঘাম মুছতে মুছতে জমিদার বাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এখন তার গায়ে একটা শার্ট চাপানো। সম্ভবত ওটা খুলেই মাটি খোরা
আর ভরাটের কাজ করেছিলো, কাজ শেষে আবার পরে নিয়েছে।
ফালু ঝোপটা অতিক্রম করতেই হাফ ছেড়ে বাঁচলো ছফা। এখন জোর পুকুরটার পাশ দিয়ে এ বাড়ির বাইরে যাবার চেষ্টা করবে সে। তার ধারণা। ওদিক দিয়ে অবশ্যই বের হবার কোনো রাস্তা আছে। হয়তো তাকে আবারো দেয়াল টপকাতে হবে।
হাইজ্যাক-বাতিটা আঙিনায় রেখে খাবারের থালার পাশে বসে হাতের গামছা দিয়ে মুখ আর গলা মুছতে লাগলো ফালু। পিতলের পানিপাত্রটা যেই হাতে তুলে নিয়েছে গোরখোদক অমনি লাফ দিয়ে উঠলো ছফা। তার ঘাড়ের উপরে কিছু একটা পড়তেই শিরশির করে জ্যাকেটের কলারের ফাঁক গলে ঢুকে পড়েছে ভেতরে। নিজেকে কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না গোরখোদক সঙ্গে সঙ্গে পাত্রটা রেখে ঝোপের দিকে তাকালো। তার চোখেমুখে বিস্ময়। গ্যাস-বাতি হাতে নিয়ে মুখের কাছে তুলে ধরলো সে।
ছফা লাফ দিয়ে উঠে তার শরীরটা মুচড়িয়ে ছোট্ট প্রাণীটার হাত থেকে মুক্তি পাবার চেষ্টা করলো কিন্তু পরক্ষণেই বুঝতে পারলো একটা বড়সড় প্রাণী তাকিয়ে আছে তার দিকে! গ্যাস-বাতির উজ্জ্বল আলোয় চোখ কুচকে ফেললো সে।
“ওই! ওই! ওইহানে কে রে?” চিৎকার দিয়ে বলেই গোরখোদক ফালু গ্যাস-বাতিটা হাতে নিয়ে তেড়ে আসতে লাগলো তার দিকে।
ইতরপ্রাণীর হাত থেকে রেহাই পাবার চেষ্টা আপাতত বাদ দিয়ে। দেয়ালের প্যাসেজটার দিকে প্রাণপণে ছুটে গেলো ছফা। সে জানে মারাত্মক বিপদে পড়ে গেছে। তার পেছনে ধেয়ে আসছে এমন একজন গোরখোদক যে আজরাইলের মৃত্যুর পরোয়ানার খবর আগেভাগেই টের পেয়ে যায়। কিন্তু এ মুহূর্তে নুরে ছফার কাছে মনে হচ্ছে, লোকটা স্বয়ং মৃত্যুদূত।
.
অধ্যায় ১৩
এতোটা পথ হেঁটে এসে অনেকটাই ক্লান্ত আতর আলী। তার মাথায় কিছুই টুকছে না। হোটেল সানমুনের ম্যানেজারের কথা শুনে তার দিকে সন্দেহের চোখে চেয়ে আছে। ঐ সাংবাদিক নাকি অনেক আগেই হোটেল থেকে বের হয়ে গেছে, আর ফিরে আসে নি। ম্যানেজার অবশ্য জানে না ভদ্রলোক একজন সাংবাদিক।
ঘন্টাখানেক আগে সে নিজে একটা ভ্যানে তুলে দিয়েছে লোকটাকে, তাহলে আবার কোথায় গেলো? এতো রাতে সুন্দরপুরে একা একা ঘুরে বেড়াবে না, এখানকার কাউকে চেনেও না ঐ সাংবাদিক। তাছাড়া রাতের এ সময়ে রিক্সা পাওয়াও মুশকিলের ব্যাপার। কিন্তু ম্যানেজার যখন জানালো, শহরের ঐ ভদ্রলোক তার বাইসাইকেলটা নিয়ে গেছে তখন চিন্তায় পড়ে গেলো। সাইকেল নিয়ে যাবে কোথায়? কী এমন জরুরি কাজ পড়লো যে হঠাৎ করে এতো রাতেই বেরিয়ে পড়তে হলো?
কয়েক ঘণ্টা ধরে তার মাথায় একের পর এক প্রশ্ন এসে ভীড় করছে, জট পাকিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে কিন্তু কোনোটারই জবাব পাচ্ছে না। ভেবেছিলো ফালুর ব্যাপারে কিছু তথ্য দিয়ে সাংবাদিককে চমকে দেবে। সে যে আসলেই একজন ইনফর্মার সেটা বুঝতে পারবে নুরে ছফা। সুন্দরপুরের সব খবর তার কাছে আছে-এমন বদ্ধমূল ধারণাটি মারাত্মক হোঁচট খেয়েছে ঐ ডাইনি আর ফালুর কারণে। হারানো গৌরব ফিরে পাবার জন্য ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে আছে।
ম্যানেজারের দিকে তাকালো। তার উপস্থিতি মোটেও পছন্দ করছে না। লোকটা, তবে সাহস করে সেটা প্রকাশও করতে পারছে না। অবাক হলো না আতর। সুন্দরপুরের অনেক মানুষই তার সাথে এমন করে। ম্যানেজারের ডেস্কের সামনে একটা চেয়ারে বসে পড়লো সে। ঠিক করলো ঐ সাংবাদিকের ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করবে।
“ইয়ে মানে,” কাচুমাচু হয়ে বললো ম্যানেজার, “সারাদিন ডিউটি কইরা এক্কেবারে টায়ার্ড হয়া গেছি…একটু ঘুমাইতাম…”
“ঘুমান…সমস্যা কি,” নির্বিকার ভঙ্গিতে বললো ইনফর্মার। এক পায়ের উপর আরেক পা তলে আরাম করে বসলো এবার।
“না, মানে…এইটা তো শহরের হোটেল না..সারারাইত খোলা রাখি …বারোটার দিকে বন্ধ কইরা দেই..”
ম্যানেজারের দিকে স্থিরচোখে তাকিয়ে ডেস্কের পেছনে দেয়াল ঘড়িটা দেখে নিলো। “বারোটা তো অহনও বাজে নাই, আপনের বারোটা বাজুক, আমি চইলা যামু।”
আতরের দ্ব্যর্থবোধক কথায় ঢোক গিললো ম্যানেজার। এই হারামজাদা মনে হচ্ছে সত্যি সত্যি তার বারোটা বাজাতে এসেছে। আর কিছু না বলে চুপ মেরে গেলো সে।
লোকটার দিকে চকিতে চেয়ে মুচকি হাসলো ইনফর্মার। সুরত আলী তার হোটেলটাকে বেশ্যাপাড়া বানিয়ে রেখেছে, রাত গম্ভীর হলেই শুরু হয় মজমা। এই ম্যানেজার যতো গোবেচারা চেহারা করেই রাখুক না কেন সে জানে, লোকটা গভীর জলের মাছ, ডুবে ডুবে জল খায়।
“ব্যবসা কিমুন চলতাছে?”
ম্যানেজার নীচু হয়ে কী যেনো করছিলো, আতরের প্রশ্ন শুনে মুখ তুলে তাকালো। “এই তো…তেমন একটা ভাল না।”
বাঁকাহাসি দিলো সে। “কন কি, ফেরিঘাটের খানকিপট্টিটা তো তুইলা দিছে. অহন তো আপনাগো বিজনেস ভালা থাকনের কথা?”
বিব্রত ভঙ্গি করলো লোকটা। “এইটা খুবই ছোটো টাউন, এইখানে ব্যবসা-বাণিজ্য সব সময়ই মন্দা থাকে।”
“হূনেন, আপনেরে একটা বুদ্ধি দেই, একটু সামনের দিকে ঝুঁকে বললো সে, “খানকিপাড়ার ভুসগি-মাগিগুলারে বাদ দিয়া নতুন কিছু নিয়া আসেন।”
