গালাগালি থেমে যেতেই আস্তে করে উঠে দাঁড়ায় সে, অন্ধকারে পা টিপে টিপে কবরগুলো এড়িয়ে দক্ষিণ দিকে নেমে পড়ে। ওই জায়গাটা একটু নীচ, ঝোঁপঝাঁড় আর ডোবায় ভরতি। উপায়ন্ত না দেখে লুঙ্গিটা হাটুর উপরে তুলে কাদা-পানিতে নেমে পড়ে সে। কবরস্তান থেকে একটু দূরে, বিস্তৃর্ণ ক্ষেতের কাছে আসতেই জোরে জোরে দৌড়াতে শুরু করে।
মহাসড়কে আসতেই দম ফুরিয়ে গেলো আতরের। পথের পাশে থেমে একটু জিরিয়ে নিলো। পায়ে কাদা লেগে থাকার কারণে এখনও লুঙ্গিটা হাটুর উপরেই তুলে রেখেছে। অনেকক্ষণ বিরতি দিয়ে একটা-দুটা বাস-ট্রাক চলে গেলেও মহাসড়কে রিক্সার কোনো বিকার দেখা পেলো না। রাতের এ সময় টাউনেই রিক্সা পাওয়া কঠিন, এই সড়কে সারারাত বসে থাকলেও পাবে না। একটু সামনে এগিয়ে সড়কের পাশে ডোবা থেকে পা দুটো ধুয়ে নিলো, তারপর একটু জিরিয়ে নিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করলো সে।
সড়কের একপাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে আতরের মাথায় অনেকগুলো প্রশ্ন ঘুরতে লাগলো। ফালুর ঘরে চৌকির নীচে চাদরে মোড়া জিনিসটা কি সত্যি সত্যি লাশের কঙ্কাল ছিলো, নাকি এটা তার মনের ভুল? না। সে নিশ্চিত, ওটা মানুষের কঙ্কালই ছিলো। কথা হলো, ঐ হারামজাদা নিজের ঘরের খাটের নীচে লাশের হাডিউগুডিট রেখে দিয়েছে কেন?
আতরের মাথা আর কাজ করে না। এই প্রশ্নের জবাব তার জানা নেই। এমনকি আন্দাজ করতে গিয়েও হিমশিম খেলো।
*
পালিয়ে যাবার তাড়না বোধ করলেও ছফা কিছু করার আগেই দেখতে পেলো বোবা দারোয়ান তার ডানদিক দিয়ে চলে গেলো সরু প্যাসেজটার দিকে। সে মোটেও তার দিকে ছুটে আসছিলো না। ভাগ্য ভালো, ঝোপের আড়াল থেকে উঠে দৌড় দেবার আগেই বুঝতে পেরেছিলো এটা।
বোবা ভেতরের বাড়িতে চলে যাবার পর হাফ ছেড়ে বাঁচলো সে। তবে নিশ্চিত হতে পারছে না, মুশকান জুবেরি কি আসলেই ঝোপের আড়ালে তার উপস্থিতি টের পেয়ে গেছে কিনা। যদি টের পেয়ে থাকে তাহলে এমন আচরণ করছে কেন? তবে এটাও ঠিক, আতর আলীর উপস্থিতি জেনে যাবার পরও মহিলা ঠিক এমনটাই করেছিলো, কোনো রকম চিৎকার-চেঁচামেচি করে নি।
এবার তাকে অপ্রস্তুত করে দিয়ে মুশকান জুবেরি টর্চলাইটটা জ্বালিয়ে তার দিকে আলো ফেললো।
ঠিক তার উপরে নয়, তার থেকে একটু দূরে, ডানে-বামে! ঝোপের আড়াল থেকে ছফা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে মহিলার ঠোঁটে মুচকি হাসি। গোরখোদক ফালু গর্তটা প্রায় ভরে ফেলছে মাটি দিয়ে। দৃশ্যটা সে দেখতে পেয়ে একটু থেমে তাকালো ঝোপের দিকে। কিছু বললো মুশকান জুবেরিকে। মহিলা মুচকি হাসি দিয়ে মাথা দুলিয়ে জবাব দিলো। তবে কী বলছে সেটা তা দূর থেকে বোঝা যাচ্ছে না।
কয়েক মুহূর্ত ভেবে ছফা আর কোনো ঝুঁকি নিলো না। বসা অবস্থায়ই আস্তে করে একটু পিছিয়ে গেলো, তবে তীক্ষ্ণণ নজর রাখলো মুশকান জুবেরির দিকে। এভাবে আরেকটু পেছনে সরে গিয়ে উপড় হয়ে থেকেই ঘুরে আস্তে আস্তে প্যাসেজটায় ঢুকে পড়লো, তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দ্রুত পা চালিয়ে বাড়িটার পেছন দিককার আঙিনার কাছে কাছে চলে গেলো। সে। মাত্র কয়েক গজ সামনে এগোতেই চমকে গেলো। অল্পের জন্যে মুখ দিয়ে অস্ফুট একটি আর্তনাদ বেরিয়ে যাচ্ছিলো প্রায়। কয়েক মুহূর্ত জমে রইলো বরফের মতো।
তার সামনে, মাত্র দশ গজ দূরে পাকা আঙিনার উপরে এক তরুণী। বসে আছে। তার পাশে পিতলের থালা, তাতে কিছু খাবার আর পানিপাত্র। মৃদু চাঁদের আলোতেও চকচক করছে ও দুটো। মেয়েটা বিন্দুমাত্র না চমকে পিটপিট করে তাকিয়ে আছে তার দিকে!
ছফা ভড়কে গিয়ে আস্তে করে কয়েক পা পিছিয়ে গেলো। মেয়েটা অন্ধকারে তাকে চিনতে পারছে না, কিন্তু বোঝার চেষ্টা করছে। এক পা দু পা করে বেশ কিছুটা পিছিয়ে গিয়ে একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়লো সে। ভালো করেই জানে এরপর কি হবে। মুশকান জুবেরি যেটা করে নি এই মেয়ে সেটাই করবে-তারস্বরে চিৎকার দিয়ে ‘চোর চোর’ বলে চেঁচিয়ে উঠবে এখনই।
কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে মেয়েটা কিছুই করলো না। গাছের আড়াল থেকে আস্তে করে উঁকি মেরে দেখলো ছফা। দৃশ্যটা তাকে বিস্মিত করলো আরেকবার : আঙিনায় বসে থাকা তরুণী আপন মনে মাথার চুলে বিলি কাটছে আর গুনগুন করে কোনো লোকজ গান গাইছে! যেনো একটু আগে সে কিছুই দেখে নি!
গাছের আড়ালে বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো সে। টের পেলো তার গা কাটা দিয়ে উঠেছে। চোখের সামনে ভুত দেখলেও এতোটা ভয় পেতো কিনা সন্দেহ।
এই বাড়িতে কী হচ্ছে এসব? এরা সবাই এমন কেন?!
তার এই ভাবনাটা বাধাগ্রস্ত হলো কারোর পায়ের শব্দে। চমকে পেছনে। ফিরে তাকালো সে। দুই দেয়ালের মধ্যে যে প্যাসেজটা আছে সেখান দিয়ে টর্চের আলোকরশ্মির আভা দেখতে পেলো। মুশকান জুবেরি আসছে!
কয়েক মুহূর্ত পরই ধীরপায়ে মিসেস জুবেরি বেরিয়ে এলো প্যাসেজটা দিয়ে। ডানে-বামে কোথাও না তাকিয়ে সোজা চলে গেলো বাড়ির দিকে। আঙিনায় উঠেই ঐ মেয়েটাকে কিছু বললো কিনতু সেটা বোঝা গেলো না। মেয়েটা খাবারের থালা আর পানিপাত্র রেখেই চুপচাপ উঠে মুশকান জুবেরির সাথে সাথে বাড়ির ভেতরে চলে গেলো।
ঝোপের পেছনেই বসে রইলো ছফা। গোরখোদক ফালু এখনও পুকুরপাড়ে আছে সম্ভবত সেও চলে আসরে এক্ষুণি।
