টর্চটা বন্ধ করে গভীর মনোযোগের সাথে গর্তের নীচে তাকিয়ে আছে। মুশকান জুবেরি। অবশেষে সন্তুষ্ট হয়ে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে কিছু একটা ইশারা করতেই ফালু আর ইয়াকুব কোদাল-বেলচা নিয়ে গর্তের মধ্যে আলগা মাটি ফেলতে শুরু করে দিলো।
নুরে ছফা টের পেলো তার নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে গেছে। মুশকান জুবেরি কী করছে! কাউকে কবর দিচ্ছে!? একজন নয় নিশ্চয়।
সর্বনাশ!
স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে গোরখোদক ফালু এসব কাজে খুব দক্ষ। যন্ত্রের মতো দ্রুত হাত চালিয়ে আলগা মাটিগুলো কোদালে করে নিয়ে ফেলে দিচ্ছে গর্তের মধ্যে। বোবা দারোয়ান অবশ্য ধীরগতিতে মাটি ফেলে যাচ্ছে।
মুশকান জুবেরি এখন বাগানের আশেপাশে তাকাচ্ছে। আকাশের দিকেও এক পলক তাকালো। বুকের কাছে দু-হাত ভাঁজ করে রেখেছে। তার ডানহাতে টর্চটা। গায়ে জড়ানো শাল থুতনি পর্যন্ত ঢেকে আছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে গর্ত ভরাট করার কাজে সন্তুষ্ট।
ঝোপের আড়াল থেকে গর্তের নীচে কি আছে ছফার পক্ষে সেটা দেখা সম্ভব হচ্ছে না, তবে সে জানে একটা জিনিসই থাকতে পারে ওখানে, আর এটা ভাবতেই তার গায়ে কাটা দিয়ে উঠলো। মনে হলো এরকম গভীর রাতে নির্জন এই বাড়িতে ঢোকাটা ঠিক হয় নি। কতো বড় বিপদ তার জন্যে অপেক্ষা করছে কে জানে। এরা যদি টের পেয়ে যায় তাহলে কি হবে ভাবতেই তার হাত-পা অসাড় হয়ে গেলো। বোবা দারোয়ান, গোরখোদক ফালু আর মুশকান জুবেরিকে মানুষ বলে মনে হচ্ছে না।
নিজেকে খুব সাহসী মনে করলেও এই প্রথম ছফা টের পেলো সে। দারুণভাবেই ভড়কে গেছে। এখন যদি ঐ গোরখোদক আর দারোয়ান ছেলেটা তার দিকে তেড়ে আসে তাহলে ঝোপের আড়াল থেকে উঠে দাঁড়াবার মতো শক্তি থাকবে কিনা সন্দেহ। পা দুটো খুব ভারি অনুভূত হচ্ছে। তার কাছে, বুকে চলছে হাতুড়িপেটা। গভীর করে দম নিলো সে। শ্বাসপ্রশ্বাস এলোমেলো হয়ে গেছে। নিজেকে স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করলো।
মুশকান জুবেরি বুকের কাছে হাত রেখেই দাঁড়িয়ে আছে, তার দৃষ্টি গর্তে মাটি ফেলার দিকে নেই, আশেপাশের অন্ধকারে চোখ বুলাচ্ছে। ছফা বুঝতে পারলো মহিলার মধ্যে এক ধরণের ভৌতিক সৌন্দর্য আছে। উজ্জ্বল গ্যাস বাতির আলোয় তার চোখ দুটো কেমন জানি দেখাচ্ছে তবে আতর আলীর বর্ণনামতো সেই চোখ মোটেই জ্বলজ্বল করে জ্বলছে না। ইনফর্মার সম্ভবত ভয় পেয়ে দৃষ্টি বিভ্রমের শিকার হয়েছিলো।
গর্তটা প্রায় ভরাট হয়ে উঠেছে। ফালুর শরীর দিয়ে দরদর করে ঘাম ছটলেও বিরাহীনভাবেই সে মাটি ফেলে যাচ্ছে কোদাল দিয়ে। তার সাথে পাল্লা দিয়ে পারছে না বোবা ইয়াকুব।
ছফা দেখতে পেলো মুশকান জুবেরি তার মুখটা সামান্য উঁচু করে গভীর করে নিঃশ্বাস নিচ্ছে।
বাতাসের গন্ধ নিচ্ছে?!
হঠাৎ করে ছফার বুকের রক্ত আরেকবারের জন্য হিম হয়ে গেলো। ঝোপের আড়ালে মূর্তির মতো বসে রইলো সে। আতরের বলা গল্পটা মনে পড়ে গেলো। সঙ্গোপনে প্রার্থনা করলো এটা যেনো তার বেলায় না ঘটে। এই মুহূর্তে মুশকান জুবেরি যদি তার দিকে তাকায় সে স্থির থাকতে পারবে না। তার দু-চোখ কুচকে গেলো। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে মিসেস জুবেরির নাসারন্ধ্র ফীত হয়ে আছে। মহিলা আলতো করে দুচোখ বন্ধ করে ফেললো কয়েক মুহূর্তের জন্য, যেনো শিকারীপশু শিকারের গন্ধ পাচ্ছে। তারপরই ছফার হৃদপিণ্ডে কাঁপন ধরিয়ে ঘাড়টা না ঘুরিয়েই আড়চোখে ঝোপের দিকে তাকালো সে। তার উপস্থিতি টের পেয়ে গেছে? মহিলার মুখে বাঁকাহাসিও ফুটে উঠলো এ সময়।
ঝোপের পেছনে হতবিহ্বল হয়ে বসে রইলো নুরে ছফা। সে বিশ্বাসই করতে পারছে না মুশকান জুবেরি কী করে বুঝে গেলো সে এখানে আছে।
শুধু এটুকুই। আড়চোখে তাকানো, মুখে বাঁকাহাসি, আর কিছু করলো না রহস্যময়ী নারী। আতরের সাথেও মহিলা ঠিক এরকমই করেছিলো।
কিন্তু তাকে অপ্রস্তুত করে দিয়ে আচমকাই বোবা দারোয়ানকে হাত তুলে মাটি ফেলার কাজ থামানোর নির্দেশ দিলো মুশকান, তারপর হাতের টর্চটা তুলে ঝোপের দিকে দেখিয়ে দিতেই ছেলেটা সঙ্গে সঙ্গে বেলচা রেখে ছুটে আসতে লাগলো ঝোপের দিকে।
ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকিয়ে গেলো ছফা। বুঝতে পারছে না কী করবে!
.
অধ্যায় ১২
লুঙ্গির প্রান্ত দুটো দু-হাতে ধরে হাটুর উপরে তুলে রীতিমতো দৌড়াচ্ছে আতর।
ফালুর ঘরে যেভাবে ঢুকেছিলো ঠিক সেভাবেই জানালা দিয়ে বেরিয়ে টিউবওয়েলের পাশ দিয়ে সোজা চলে যায় কবরস্তানের দক্ষিণ দিকে। বেড়ালের মতো নিঃশব্দে পালাতে পারেনি। একটা পুরনো কবরের উপর পা পড়তেই মাটি দেবে হূমুরিয়ে পড়ে যায় সে।
“ওই? কে? কে?”
তার পড়ে যাবার শব্দ শুনে ঝুপরি ঘরের দরজার কাছ থেকে বাজখাই কণ্ঠটা বলে উঠেছিলো। টর্চের আলোও ফেলেছিলো শব্দটার উৎস আন্দাজ করে। আতর আর উঠে দাঁড়ায় নি। চুপচাপ কিছুক্ষণ শুয়ে থেকে ধোঁকা দেবার চেষ্টা করে যাতে ফালু মনে করে শিয়াল কিংবা বাঘডাস হবে হয়তো। কে না জানে, গ্রামের কবরস্তানে এদের নিত্য আনাগোনা। কবর খুরে পচা গলা লাশ খেতে এদের জুরি নেই।
আতরের ধোঁকায় কাজ হয়। গোরখোদক আর উচ্চবাচ্য না করে কয়েক মুহূর্ত পরই একটা বড়সর মাটির চাকা ছুঁড়ে মারে শব্দের উৎসের দিকে। ঢিলটা পড়ে আতরের খুব কাছেই। হারামজাদার নিশানা বলতে হবে। একটুর জনো ওটা গায়ে লাগে নি। টর্চের আলোটা সরে যেতেই শুনতে পায় বিড়বিড় করে কেউ কিছু বলছে। তবে শেয়াল আর বাঘডাশের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে দেয়া গালিগালাজগুলো আতরকে স্বস্তি এনে দেয়।
