আরেকটা কাঠি জ্বালিয়ে ঘরটায় শকুনি নজরে দেখে নিলো সে। একজন নিঃসঙ্গ গোরখোদকের ঝুপড়িঘর যেরকম থাকার কথা তার চেয়ে বেশি কিছু নেই। কিন্তু পুলিশের সাথে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে সে, তার নাকে অন্য কিছুর গন্ধ খুব দ্রুতই ধরা পড়ে। উপুড় হয়ে চৌকিটার নীচে দেয়াশলাইয়ের জ্বলন্ত কাঠির আলোয় দেখলো। ঘুটঘুটে অন্ধকারেও জিনিসটা চিনতে পেরে ইনফর্মারের শরীরে কাটা দিয়ে উঠলো সঙ্গে সঙ্গে। একটা ময়লা চাদরে কিছু মুড়িয়ে রেখেছে কিন্তু ফাঁক-ফোকড় দিয়ে মানুষের শরীরের হাঁড় বের হয়ে আছে!
কঙ্কাল!?
একটু ভয় পেলেও বুকে সাহস নিয়ে কাপড়টা খুলে দেখার চেষ্টা করলো। লাশের আর অবশিষ্ট কিছুই নেই আছে শুধু হাঁডগোড। তাতে লেগে আছে পচা মাংসের অবশিষ্ট। কাদামাটিও হতে পারে, তবে অন্ধকারে দেয়াশলাইর কাঠির আলোয় নিশ্চিত হতে পারলো না। কাপড়টা সরিয়ে আরেকটু দেখতে যাবে অমনি ঝুপড়ি ঘরের বাইরে কারোর পায়ের শব্দ শুনে চমকে উঠলো সে। সঙ্গে সঙ্গে হাতের জ্বলন্ত কাঠিটা ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিলো।
ফালু?
পায়ের শব্দটা এখন ঝুপরি ঘরের দরজার খুব কাছে চলে এসেছে। আতর কিছু বুঝে ওঠার আগেই দরজার ফাঁক-ফোকর দিয়ে টর্চের আলো এসে পড়লো ঘরের ভেতরে। নিমেষে তার শরীরের রক্ত হিম হয়ে গেলো।
*
ঘুটঘুটে অন্ধকারে একটি পুরনো দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ছফা। এ মুহূর্তে কিংকর্তব্যবিমূঢ় শব্দটিই তার বেলায় বেশি প্রযোজ্য। জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করার চেষ্টা করলো। অন্য অনেকের মতো সে কুসংস্কারগ্রস্ত নয়, ভুত-প্রেত, জিন-পরীতেও তার বিশ্বাস নেই। একজন যক্তিবাদী মানুষ হিসেবে সে জানে জগতে যুক্তির বাইরে কিছুই নেই; কিছু ঘটেও না। তার অভিজ্ঞতা বলে, সমস্ত রহস্য আর অব্যাখ্যাত ব্যাপারগুলো আসলে সাময়িক বিভ্রম। অজ্ঞানতা। এক সময় রহস্য ভেদ করে ঠিকই সত্য জানা যায়।
দু-চোখ কুচকে সামনের দেয়ালের দিকে ভালো করে তাকালো। এখান দিয়ে অবশ্যই কোনো প্রবেশপথ আছে। মাত্র কয়েক মুহূর্ত আগের ঘটনা, তার স্পষ্ট মনে আছে ঐ মহিলা ইটবিছানো পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছিলো। সামান্যতম ডানে-বামে নয়, একেবারে সোজা।
মাথার উপরে ঘন ডালপালা থাকার কারণে চাঁদের আলো বাঁধা পড়েছে, ফলে জায়গাটা ঘুটঘুটে অন্ধকার, স্পষ্ট করে কিছু দেখার উপায় নেই। তবে ইটবিছানো পথটি যে দেয়ালের দিকেই চলে গেছে সেটা বুঝতে পারলো। মুশকান জুবেরির মতো তার হাতে টর্চলাইট থাকলে বুঝতে পারতো সামনে আসলে কি আছে।
সামনের দিকে একটু এগিয়ে অন্ধের মতো দেয়ালটা হাতরাতে চাইলে কিনতু নাগাল পেলো না। আরেকটু সামনে বাড়লো, এবারও তার হাত দেয়ালটা স্পর্শ করলো না। বিস্ময়ে থমকে দাঁড়ালো ছফা। টের পেলো নিঃশ্বাস বেড়ে গেছে। ইটবিছানো পথের উপরে দাঁড়িয়ে রইলো কয়েক মুহূর্ত। মোবাইলফোন বের করে ডিসপ্লের আলো জ্বালাতে পারছে না নিজের উপস্থিতি চাউর হবার ভয়ে। তাই অন্ধকারে চোখ সয়ে আসার জন্য একটু অপেক্ষা করলো, আর সেটা হতেই ধরতে পারলো দৃষ্টি বিভ্রমের কারণটা।
জমিদার বাড়ির পুবদিকে জোড়পুকুর অবস্থিত। মূল বাড়ি থেকে পুকুরটা আলাদা করা হয়েছে উত্তর-দক্ষিণ বরাবর দুটো দেয়াল দিয়ে। দেয়াল দুটো একই রেখায় অবস্থিত নয়। দক্ষিণ দিক থেকে যে দেয়ালটা এসে মিলেছে ইটবিছানো পথের কাছে, তার থেকে ছয়-সাত ফিট পরে শুরু হয়েছে দ্বিতীয় দেয়ালটি। ওটা চলে গেছে উত্তর দিকে। দুটো দেয়ালের মাঝে যে ফাঁক সেটাই কাজ করে খোলা প্রবেশদ্বার হিসেবে। কোনো দরজা না থাকলেও অন্দরবাড়ির মহিলাদের স্নান করার দৃশ্য এই প্রবেশদ্বারের সামনে। দাঁড়িয়ে দেখা সম্ভব নয়। জোড়পুকরে যেতে হলে দটো দেয়ালের মাঝখানে ছোট্ট একটা গলি দিয়ে যেতে হবে। এর ফলে রাতের অন্ধকারে বিভ্রমের সৃষ্টি হয়েছে। পুরনো দিনের এই স্থাপত্য-কৌশলে মুগ্ধ হলো ছফা। এই সহজ সরল টেকনিকটা মঞ্চে রাখা বিশাল আকারের হাতি ভ্যানিশ করার জাদুতে ব্যবহার করে থাকে জাদুকরেরা।
ছোট্ট গলিটিতে ঢুকে পড়তেই বেশ কিছুটা দূরে উজ্জ্বল আলোর উৎস চোখে পড়লো তার। জোড়পুকুরটার শান বাঁধানো ঘাটের আগে বেশ কিছুটা খালি জায়গা আছে, সেখানে উজ্জ্বল আলোর একটি বাতি জ্বলছে। চিনতে পারলো সে। দেখতে অনেকটা বড়সর হারিকেনের মতো হলেও এর আলো বেশ উজ্জ্বল। ছোটোবেলায় তারা এটাকে গ্যাস-বাতিও বলতো। এক সময় গ্রামে-গঞ্জে বেশ জনপ্রিয় ছিলো এটা। জিনিসটার নাম অনেক চেষ্টা করে মনে করতে পারলো না নুরে ছফা। যাহোক, তার দৃষ্টি আটকে রইলো একজন বলশালী আর মাঝারিগগাছের যুবকের দিকে, তারা দু-জন দাঁড়িয়ে আছে একটা গর্তের পাশে। মুশকান জুবেরি তাদের সামনে দাঁড়িয়ে কী যেনো বলছে। হাতের টর্চটা দিয়ে কিছু একটা দেখাচ্ছে গর্তের নীচে। গর্তের পাশেই আলগা মাটির স্তূপ, একটা কোদাল, বেলচা আর ভাঁজ করা চটের ছালা পড়ে আছে। গতটা আকারে কবরের চেয়ে সামান্য বড় হবে।
ছফা টের পেলো তার কপালে ঘাম জমতে শুরু করেছে। হৃদস্পন্দন থমকে আছে যেনো। দেয়ালের প্যাসেজটার পাশেই বড় একটা গাছের নীচে তিন-চার ফুট উঁচু ঘন ঝোপের আড়ালে মূর্তির মতো বসে রইলো সে। উজ্জ্বল আলোয় পরিস্কার দেখতে পাচ্ছে খালি গায়ের গোরখোদক ফালু ময়লা জিন্স প্যান্ট হাটু পর্যন্ত গুটিয়ে রেখেছে। তার সারা শরীর আর মুখ ঘেমে একাকার। হাপাচ্ছে সে। কবর খুরে পরিশ্রান্ত এখন। কপালের ঘাম হাত দিয়ে কেঁচে ফেললো একবার। নিজের খোরা গর্তের তাকিয়ে কী যেনো দেখছে। তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মাঝারিগোছের যুবকের দৃষ্টিও সেদিকে। তার মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছে না। সম্ভবত এটাই বোবা দারোয়ান। মুশকান জুবেরি মাথা নেড়ে সায় দিয়ে কী যেনো বললো তাকে। সঙ্গে সঙ্গে গোরখোদক ছেলেটাকে নিয়ে চটের ছালাটা মেলে ধরলো সে, দু-দিকে দুটো প্রান্ত ধরে উপুড় হয়ে গর্তের নীচে বিছিয়ে দিলো ওটা।
