জমিদার বাড়ির সামনের খোলা চত্বর থেকে পেছনের জায়গাটি বেশ বড়। বাড়িটার পেছনদিকে এ-মাথা থেকে ও-মাথা পর্যন্ত পাকা আঙিনা। মাটি থেকে কমপক্ষে চারফুটের মতো উঁচু হবে ওটা।
দু-দিকের সীমানা প্রাচীরগুলো অসংখ্য বৃক্ষরাজির মধ্য দিয়ে হারিয়ে গেছে। হাসনাহেনা ফুলের গন্ধে মৌ মৌ করছে জায়গাটা। বাগানে নানান। ধরণের ফুলগাছও আছে। আবছা আবছা অন্ধকারেও কিছু সাদা-ফুল চোখে পড়লো তার। অন্ধকারে ঠাওর করতে পারলো না বাগানের শেষ সীমাটুকু। যেনো গাঢ় অন্ধকার আর গাছপালার ভীড়ে হারিয়ে গেছে।
আতর আলী তাকে বলেছে, বাড়িটার পেছনে বিশাল জলাশয় আছে। সম্ভবত বাগানটা গিয়ে মিশেছে সেই জলাশয়ে। তাহলে জোড়-পুকুরটা কোথায়? সে জানে এই বাড়িতে নারী-পুরুষের জন্য আলাদা দুটো পুকুর আছে। ওটা সম্ভবত খাল আর বাড়ির পেছন দিককার কোনো জায়গার মাঝামাঝিতে অবস্থিত।
হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ পেয়ে চমকে উঠলো ছফা। বুঝতে পারলো মূলবাড়ির ভেতর থেকে কেউ বেরিয়ে আসছে। সঙ্গে সঙ্গে বামদিকের ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে নীচু হয়ে বসে রইলো, দেখতে পেলো, টর্চ হাতে এক নারীমূর্তি এসে দাঁড়িয়েছে ভবনের পেছন দিকের আঙিনায়। চিনতে পারলো সে।
মুশকান জুবেরি!
ভদ্রমহিলা আঙিনায় এসে দাঁড়িয়ে রইলো কয়েক মুহূর্ত। যেনো বাতাসের গন্ধ নিচ্ছে! সাদা রঙের শাড়ির উপরে লাল টকটকে একটা শাল জড়িয়ে রেখেছে এখন। হাতে একটা টর্চলাইট নিয়ে ধীর পদক্ষেপে আঙিনা থেকে নেমে বাগান পেরিয়ে ঘন গাছপালা আর ঝোঁপঝাঁড়ের ভেতর দিয়ে চলে গেলো সে।
একটু পরই ছফা বেড়িয়ে এলো ঝোপের আড়াল থেকে। এরকম রাতের বেলায় মুশকান জুবেরি টর্চ হাতে কোথায় যাচ্ছে?
সতর্ক পদক্ষেপে কিন্তু অনেকটা মন্ত্রমুগ্ধের মতো টর্চের আলো অনুসরণ করে এগিয়ে গেলো ছফা। ইট বিছানো পথের উপর পড়ে থাকা শুকনো পাতায় পা পড়তেই মচমচ করে শব্দ হচ্ছে। মুশকান জুবেরি যদি হঠাৎ পেছন ফিরে দেখে তাহলে ধরা পড়ে যাবে, তাই ইট-বিছানো পথ থেকে নেমে গেলো। বেড়ালের মতো সাবধানে পা ফেলে সামনের ছোটো একটা ঝোপের আড়ালে গিয়ে বসে পড়লো সে। একটু থেমে সামনের বড় একটা গাছের আড়ালে চলে গেলো দ্রুত। মুশকান জুবেরি ধীরপায়ে শুকনো পাতা মাড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ করেই চোখের সামনে টর্চের আলোটা উধাও হয়ে গেলো। ছফা ধরে নিলো মহিলা সম্ভবত টর্চটা বন্ধ করে দিয়েছে।
থমকে দাঁড়ালো সে। কয়েক মুহূর্ত ভেবে আগের চেয়ে আরো বেশি সতর্ক হয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকারের দিকে পা বাড়ালো কিন্তু দশ কদম সামনে এগোতেই দেখতে পেলো পুরনো একটি দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। ঝোঁপ-ঝাঁড় আর গাছপালাগুলো শেষ হয়ে গেছে সেই দেয়ালের খুব কাছে এসে। মাথার উপরে গাছগুলোর ডালপালা মৃদু চাঁদের আলো আটকে দিয়েছে, ফলে জায়গাটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। মুশকান জুবেরি যেনো দেয়াল ভেদ করে হারিয়ে গেছে চোখের নিমেষে!
৩. আতর আলী
অধ্যায় ১১
আতর আলী হা করে চেয়ে আছে মাটির দিকে। গর্ত বলে কিছু নেই সেখানে! অথচ একটু আগেই এখান দিয়ে যাবার সময় বেচারা সাংবাদিক সদ্য খোরা কবরে পড়ে নাস্তানাবুদ হয়েছিলো।
চারপাশে তাকিয়ে হাটু গেড়ে বসে পড়লো সে। ফালুর সদ্য খোরা ‘অ্যাডভান্স’ কবরটি সুন্দর করে ভরাট করে ফেলা হয়েছে। এমনভাবে সেটা করা হয়েছে যেনো সহজে বোঝা না যায়, কিন্তু আতরের চোখে স্পষ্ট ধরা পড়ছে কবর ভরাট করার লক্ষণগুলো। আলগা মাটি ফেলে ভরাট করার চিহ্ন এখনও রয়ে গেছে। ফালু চেষ্টা করেছে এই কবরটা খোরার কোনো চিহ্ন যেনো না থাকে। কিন্তু কেন?
উঠে দাঁড়ালো আতর।
ফালুকে সে এতোদিন নিতান্তই তারছেঁড়া পোলা হিসেবে দেখে এসেছে। ওর ব্যাপারে তার শ্যেনদৃষ্টি কখনওই পড়ে নি। এখন মনে হচ্ছে। ছেলেটা বোবা-ডাকাইত! ভালোমানুষের ছদ্মবেশে অগোচরে কিছু একটা করছে, আর সেটা সাংঘাতিক কিছুই হবে। ওর নিশ্চয় বিরাট কোনো গোমড় আছে। ঐসব গ্রামবাসীর জন্য তার করুণা হলো যারা মনে করে ফালু একজন কামেল লোক, স্বয়ং আজরাইলের সঙ্গে তার খাতির রয়েছে, জান কবচের খবর আগেভাগে টের পেয়ে যায় সে, তাই সুন্দরপুরে কেউ মারা যাবার আগেই কবর খুরে রাখে। আজও তাই করেছিলো, তারপর তমিজের বাপও পা পিছলে গুয়ের গাড়ায় পড়ে মরলো, সবই ঠিক আছে কিনতু বুড়োর লাশ দাফন করার আগে কবরটা কেন ভরাট করে ফেলা হলো? তাহলে ফালুর ‘অ্যাডভান্স’ কবর খোরার উদ্দেশ্যটা কি ছিলো?
এইসব প্রশ্ন মাথায় নিয়েই আতর আলী আবারো চলে এলো গেরিখোদকের ঝুপড়ি ঘরের সামনে। এবার আর কোনো হাঁক-ডাক দিলো না, দরজা দিয়েও চেষ্টা করলো না, সোজা চলে গেলো ঘরের বামদিকে। ওখানে একটা টিউবওয়েল আর ধোয়া-মোছার জন্য পাকা-জায়গা আছে। টিউবওয়েলের দিকে মুখ করে আছে ঝুপড়ি ঘরের একটি জানালা। ওটা বন্ধ থাকলেও কপাট দুটো ধাক্কা মারতেই খুলে গেলো। জানালায় কোনো শিক দেয়া নেই। অনায়াসেই ঘরের ভেতরেকে যেতে পারলো সে।
ঘুটঘুটে অন্ধকার। সেই অন্ধকার চোখে সয়ে যেতে একটু সময় নিলো। পকেটে একটা মোবাইলফোন আছে যার ডিসপ্লে কাজ করে না। অগত্যা দেয়াশলাইর কাঠি জ্বালালো আতর।
আমকাঠের একটা চৌকি, কাপড় রাখার আলনা, এককোণে পানি রাখার মাটির কলস, কিছু হাড়ি-পাতিল আর কোদাল, শাবল, টুকরি দেখতে পেলো।
