কয়েক মুহূর্ত সাইকেলের সিটের উপরে দাঁড়িয়ে থেকে সবকিছু ভালো করে দেখে নিলো ছফা। সে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, তার ঠিক নীচে, ওপাশের দেয়ালজুড়ে কিছু ফুলের গাছ আর পাতাবাহার চলে গেছে ডান দিক দিয়ে। দোতলা বাড়ি পর্যন্ত। তবে ওদিক দিয়ে বাড়ির পেছন দিকে যাবার কোনো রাস্তা নেই। ওখানে একটা ঘর তোলা হয়েছে। ইটের দেয়াল আর টিনের ছাদ। এটা নিঃসন্দেহে অনেক পরে বানানো হয়েছে, সম্ভবত মুশকান জুবেরি আসার পর। ঘরটার পাশেই একটা আমগাছ। আর সম্ভবত এই গাছটায়ই উঠেছিলো। এবার বাডিটার বামদিকে ভালো করে তাকালো। দেখতে পেলো ঘাসের লনের উপর একটা মেঠো পথ। সেটা চলে গেছে বাড়ির বামদিক দিয়ে পেছনে। ছফা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে যতোটুকু দেখা যাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে ওখান দিয়েই বাড়ির পেছন দিকে যাবার রাস্তা। পুরনো দিনের এরকম প্রতাপশালীদের বাড়িতে অন্দরমহলে প্রবেশের জন্যে রাস্তা থাকাটাই স্বাভাবিক। অনেক জমিদার বাড়িতে এটা দেখেছে সে, বিশেষ করে ঘোড়াগাড়ি কিংবা রথ যাতায়াত করতে পারে এমন প্রশস্ত পথ।
এভাবে অনেকক্ষন ধরে বাড়িটা পর্যবেক্ষণ করার পর আস্তে করে ডান পা-টা দেয়ালের উপরে তুলে দিয়ে অনায়াসেই ওটার ওপর উঠে বসতে পারলো। এবার লাফ দেবার পালা। কাজটা তার জন্য সহজ। উপরের দিকে তিন ফুটের মতো দেয়াল নীচের দেয়াল থেকে কম পুরু, ফলে চার-পাঁচ ইঞ্চির একটি ধাপ তৈরি হয়ে গেছে। সেই ধাপে পা রেখে নীচু হয়ে গেলো, শরীরটা ঝুলিয়ে দিলো আস্তে করে, তারপরই ছোট্ট একটা লাফ। কাঁচামাটি আর ঘাসের উপরে পড়তেই সামান্য একটি ভোতা শব্দ হলো কেবল।
উঠে দাঁড়ালো ছফা। পাশের একটি ফুলগাছের আড়ালে চলে গেলো সে। পুরো বাড়িটা সুনশান। দূর থেকে একটা মৃদু শব্দ ভেসে এলেও বুঝতে পারলো না ওটা কিসের। একে তো শব্দটা ক্ষীণ আর ভোতা, তার উপরে ঝিঁঝি পোকার ডাক মিলেমিশে অস্পষ্ট হয়ে গেছে। এখন তাকে বাড়ির পেছনদিকে যেতে হলে দোতলা বাড়িটার সম্মুখভাগের লনের উপর দিয়ে চলে যেতে হবে বামদিকে। এটা হবে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। বাড়ির ভেতর থেকে কেউ দেখে ফেলতে পারে।
দেয়ালের পাশে একটি ফুলগাছের আড়ালে ঘাপটি মেরে বসে রইলো। সে। আতরের কাছ থেকে যতোটুকু জেনেছে, এই বাড়িতে মাত্র তিনজন মানুষ বাস করে। মুশকান জুবেরি ছাড়াও বোবা ইয়াকুব নামের এক দারোয়ান আর কাজের একটি মেয়ে থাকে। সুতরাং সাহস করে লনটা পেরোনোর সিদ্ধান্ত নিলো। একটামাত্র লালচে বাতির আলোয় চতুরটি খুব একটা আলোকিত নয়। প্রথমে এক দৌড়ে ফোয়ারার বেইসের কাছে গিয়ে নীচু হয়ে বসে পড়লো, তারপর সতর্ক দৃষ্টিতে দেখে নিলো বাড়ির সামনে থেকে কেউ দেখছে কিনা। নিশ্চিত হয়ে নিঃশব্দে দৌড়ে গেলো বাড়িটার বামদিকে।
মূল বাড়ির বাম দিকে যে আরেকটা দোতলা ভবন আছে সেটা এইমাত্র আবিষ্কার করলো। এই দোতলাটি খুবই ছোটো। মাত্র দুটো বড়সড় ঘর। বাইরের দিকে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় যাবার ব্যবস্থা আছে। এই ছোটো স্থাপনাটির সাথে মূল ভবনের দুরত্ব হবে বড়জোর পনেরো-বিশ ফিটের মতো। কিন্তু দুটো ভবনে যাতায়াতের জন্য দোতলার উপরে একটি প্যাসেজ রয়েছে; অনেকটা সংযোগ-সেতুর মতো। দুটো ভারি লোহার বিমের উপরে স্থাপন করা হয়েছে এই ঝুলন্ত প্যাসেজটি। ওটার ছাদ টালি দিয়ে ঢাকা, কুড়েঘরের মতো দু-দিকে ঢালু হয়ে নেমে গেছে। সম্ভবত পার্শ্বভবনটি চাকর-বাকরদের কোয়ার্টার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। মণিবের হুকুম পেয়ে দ্রুত। ছুটে আসার জন্য দোতলার সাথে এর একটি প্যাসেজ দিয়ে সংযোগ করা হয়েছে। এরকম ভবন ছফা আরো দেখেছে। সবই জমিদার আমলের বিত্ত বৈভবের বর্হিপ্রকাশ।
মাথার উপরে প্যাসেজটির দিকে তাকালো সে, তারপর নজর দিলো সামনের দিকে। ইটবিছানো একটি পথ চলে গেছে বাড়ির পেছনে। পা টিপে টিপে সেই পথ ধরে এগিয়ে গেলো। জায়গাটা বেশ অন্ধকার, ফলে তার জন্যে সুবিধাই হলো। কয়েক পা সামনে এগোতেই দেখতে পেলো বামদিকে সার্ভেন্ট কোয়ার্টারটা শেষ হতেই একটা খিলানুক্ত প্রবেশদ্বার। একেবারে ভগ্নপ্রায়। বাড়িটা মেরামত করা হলেও এটার কোনো সংস্কার করা হয় নি। খিলানের কাছে এসে ভেতরে উঁকি দিলো। অন্ধকারেও চোখে পড়লো ছোটোখাটো আঙিনার মতো একটি জায়গা। সেই খোলা জায়গাটির উত্তর পূর্ব দিক জুড়ে ইংরেজি ‘এল’ অক্ষরের মতো করে পাশাপাশি চারটি পাকাঘর। সবগুলোই জীর্ণ, বহুকালের পুরনো।
ছোটো ছোটো ঘরগুলোর উপযোগীতা কি বুঝতে বাকি রইলো না তার। জমিদার বাড়িটা সেই যুগে নির্মাণ করা হয়েছে যখন সবাই বাথরুম-টয়লেট যথাসম্ভব মূল বাড়ি থেকে দুরে রাখতো। তবে সে নিশ্চিত, মুশকান জুবেরি এগুলো আর ব্যবহার করে না। বাড়ির ভেতরে নতুন করে বাথরুম-টয়লেট বানিয়ে নিয়েছে নিশ্চয়। দেখেও মনে হচ্ছে পুরনো শৌচাগারগুলো এখন পরিত্যক্ত।
খিলানযুক্ত প্রবেশদ্বারটি অতিক্রম করে সামনের দিকে পা বাড়ালো। ইটবিছানো পথটি চলে গেছে সোজাসুজি সামনের দিকে, তবে অন্ধকারে সেটা ঠাওর করতে পারলো না, শুধু বুঝতে পারলো পথটি বহু পুরনো।
বাড়িটা রেনোভেট করার সময় এটার তেমন সংস্কার করা হয় নি। কিছুটা সামনে গিয়েই ইটের পথটি মাটির আস্তরণ আর আগাছায় ঢেকে গেছে। সেই পথের বাম দিক ঘেষে সীমানা প্রাচীর চলে গেছে, প্রাচীর আর পথের মাঝখানের জায়গাটি ঘন ঝোঁপঝাঁড়ে পরিপূর্ণ।
