ছোটো-বড় কবরগুলো এড়িয়ে সে চলে গেলে কিছুক্ষণ আগে যেখানে সদ্য খোরা এক কবরে নুরে ছফা নামের সাংবাদিকটি পড়ে গেছিলো। আকাশের চাঁদ দক্ষিণ-পশ্চিমে হেলে পড়লেও বেশ ভালো আলো ছড়াচ্ছে, সেই আলোয় স্পষ্ট দেখতে পেলো দৃশ্যটি।
সদ্য খোরা কবরটি নেই।
.
অধ্যায় ১০
অপূর্ণ চাঁদ দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে হেলে পড়েছে। রাত এগারোটাই সুন্দরপুরের জন্য গভীর রাত। চারদিক নেমে এসেছে সুনশান নীরবতা, সেইসাথে ভারি হয়ে আসছে কুয়াশার চাদর। চারপাশ ঘোলাটে। ঠাণ্ডা বাতাস হাঁড়ে কাঁপন না ধরালেও গায়ে এসে লাগছে বেশ।
সাইকেলটা থামিয়ে জ্যাকেটের বোতামগুলো লাগিয়ে নিলো ছফা। হোটেল রুম থেকে বের হবার পর পথে কোনো রিক্সা না পেয়ে ম্যানেজারের বাই-সাইকেলটা ধার নিয়েছে। একটা কানটুপিও পরেছে সে। তার কালো জিন্স-প্যান্ট আর মরচেপড়া রঙের গ্যাবাডিনের জ্যাকেট এরকম রাতের জন্য যে নিখুঁত ক্যামোফ্লেজ সৃষ্টি করবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিনতু তার কোনো ধারণাই নেই, রাতের এমন সময়েও একটু দূর থেকে একজন মানুষ ঠিকই তাকে দেখে চিনতে পেরেছে।
আজ অনেকদিন পর সাইকেল চালিয়ে মাইলখানেক পথ পাড়ি দিতেই পা দুটো আড়ষ্ট হয়ে গেলো। স্কুল-কলেজের পুরোটা সময়েই সাইকেল চালাতে সে। এমনকি তিন বছর আগে যখন টের পেলো ফিটনেস আর আগের মতো নেই তখন আবারো সাইকেল চালাতে শুরু করে। তবে তার এই স্বাস্থ্য সচেতনতার জোশ ছিলো মাত্র দু-সপ্তাহ। সকালের আরামের ঘুম হারাম করার মতো স্বাস্থ্য-সচেতন মানুষ সে কখনওই ছিলো না।
রবীন্দ্রনাথের সামনে দিয়ে যাবার সময় দেখতে পেলো রেস্তোরাঁটি বন্ধ হয়ে গেছে। জ্বলজ্বলে সাইনে অদভুত নামটি দৃষ্টি আকর্ষণ করে যাচ্ছে এখনও। ওটা অতিক্রম করে আরেকটু সামনে এগিয়ে আবারো থামলো। সে নিশ্চিত, সামনের ডান দিক দিয়ে যে সরু পথটি চলে গেছে গ্রামের ভেতরে, এটা দিয়েই জমিদার বাড়িতে যাওয়া যাবে। প্যাডেল চালিয়ে সে-পথ ধরেই এগোতে লাগলো। বেশ ধীরে ধীরে প্যাডেল মারছে, সে চাইছে না তেমন কোনো শব্দ হোক কিন্তু কাঁচামাটির পথটি বড় এবড়োখেবড়ো, বার বার সাইকেল ঝাঁকি খাচ্ছে আর আপনা-আপনিই টুং-টাং করে বেজে উঠছে বেল। ডানহাতটা এমনভাবে হ্যাঁন্ডেলের উপর রাখলো যেনো বেলের উপরে আঙুলের স্পর্শ লাগে, এর ফলে ঐ টুং-টাং শব্দটা বন্ধ হয়ে গেলো।
জমিদার বাড়ির অনেকটা দূরে থাকতেই সাইকেল থেকে নেমে পড়লো সে। সাইকেল নিয়েই পায়ে হেঁটে এগিয়ে গেলো বাকিটা পথ। জমিদার বাড়ির মেইনগেটের কাছে এসে সতর্কভাবে আশেপাশে তাকালো। কেউ নেই। থাকার কথাও নয়। গেটের ভেতরে কারোর কোনো রকম উপস্থিতিও টের যাচ্ছে না। দরজার ওপাশে ঐ বোবা দারোয়ান ঘাপটি মেরে আছে কিনা কে জানে। তাকে আগে নিশ্চিত হতে হবে। মাটি থেকে একটা ঢিল তুলে নিয়ে মেইনগেট লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারলো। গ্রিলের দরজায় লেগে টুক করে শব্দ হলেও কারোর সাড়া-শব্দ পাওয়া গেলো না। তারপরও একটু সময় নিয়ে অপেক্ষা করলো সে। আরো বেশি নিশ্চিত হতে হবে। আরেকটা ঢিল ছুঁড়ে মারলেও কোনো সাড়া-শব্দ পেলো না। পরক্ষণেই আপনমনে হেসে ফেললো। বোবা তার ঢিলের শব্দ কি করে শুনবে, সে তো কানেই শোনে না!
একটু ভেবে নিলো সে। ছেলেটা গেটের পেছনে আছে কিনা সেটা খুব সহজেই দেখা যাবে।
এবার মেইনগেটের ডানপাশের সীমানাপ্রাচীর ধরে একটু এগিয়ে গেলো ছফা। দেয়াল টপকানোর মতো ভালো জায়গা দরকার। প্রাচীরের ওপাশে বড় বড় গাছ, কিছু গাছের ডাল-পালা বাইরের দিকে ঝুঁকে আছে। আবছা অন্ধকারেই দেখতে পেলো সীমানাপ্রাচীরটা বেশ পুরনো। জায়গায় জায়গায় পলেস্তারা খসে পড়ছে। সম্ভবত মূল জমিদার বাড়িটি তৈরি করার সময়েই এটা নির্মাণ করা হয়েছিলো, তবে পাঁচ ফুট উঁচু পুরনো প্রাচীরের উপরে আরো তিন চার ফুটের নতুন দেয়াল তৈরি করা হয়েছে এখন। পুরনো প্রাচীরের পুরুত্ব বিশ ইঞ্চির নীচে হবে না, সে-তুলনায় নতুন দেয়ালের পুরুত্ব। বড়জোর দশ ইঞ্চির মতো।
একটা জায়গায় এসে দেখতে পেলো দেয়ালের উপর দিয়ে নাম-না জানা একটি গাছের ডালপালা ঝুঁকে আছে। সাইকেলটা দেয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে রেখে আস্তে করে সিটের উপর উঠে দাঁড়ালো সে। দেয়ালের উপর দিয়ে জমিদার বাড়ির ভেতরে তাকিয়ে দেখতে পেলো গেট থেকে মূল বাড়ি পর্যন্ত কাউকে দেখা যাচ্ছে না। দোতলা বাড়িটার সামনের লনের মাঝখানে একটি ফোয়ারা আছে তবে সেটা অকেজো। তারপরও পুরনো
আমলের দোতলা বাড়িটি আভিজাত্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দুই দিকে বড় বড় চারটা ফ্রেঞ্চজানালা, মাঝখানে তিন-চার ধাপের নক্সা করা সিঁড়িযুক্ত সদর দরজা। দোতলাটি ঠিক নীচের তলার মতোই তবে মাঝখানে একটা ঝুল বারান্দা আছে। সদর দরজার ঠিক উপরে এর অবস্থান। কারুকার্য করা প্রাচীরঘেরা ছাদ। সম্ভবত ভবনটি রেনোভেট করার সময় প্রথমদিকের কিছু সুক্ষম নক্সা আর কারুকাজ হারিয়ে গেছে। পুরো ভবনটি সাদা রঙে রাঙানো। সেই রঙ হলদেটে হয়ে গেছে। জানালাগুলো পুরনো আমলের হলেও সম্ভবত নতুন করে বানানো হয়েছে। কাঠের ফ্রেমগুলো দেখতে নতুন, শত বছরের পুরনো বলে মনে হচ্ছে না।
মূল বাড়ির নীচতলায় বামদিকে এবং দোতলার ডানদিকের একটি ঘরে বাতি জ্বলছে। বাইরের ঘাসের লনটি একেবারে ছিমছাম। কিছু পাতাবাহার গাছ আছে ওখানে। মেইনগেট থেকে ইট বিছানো একটি ড্রাইভওয়ে চলে গেছে মূল বাড়ির সদর-দরজা পর্যন্ত। দরজার উপরে জ্বলছে একটি লালচে বারে বাতি, সেই আলোতে কিছুটা আলোকিত হয়ে উঠেছে লনটি, তবে বিশাল জায়গার তুলনায় তা একেবারেই অপ্রতুল। পুরনো দালানের ডানপাশে টিনের চালার একটি ছোটো ঘর। দেখে মনে হচ্ছে ওটা গাড়ি রাখার কাজে ব্যবহার করা হয়।
