ছেলেটাকে থানায় ধরে এনে একটা ফেন্সিডিল আর কিছু গাঁজার পুরিয়া রিকভারি হিসেবে দেখিয়ে দিলো এসআই। ব্যস, কেস খাড়া। আসামীর কাছ থেকে নিষিদ্ধ মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। কমপক্ষে তিন-চার। বছরের জেল তো হবেই। ছেলের বাপের কাছে আতর যখন খবরটা দ্রুত পৌঁছে দিলো তখন বেচারা আলতাফ মিয়ার জান বের হবার জোগার। লুঙ্গি ব্যবসায়ি লুঙ্গির গিট দিতে দিতে উদ্বেগের চোটে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে আতরকে সঙ্গে নিয়ে। স্বভাবতই আতরের কাছে চটজলদি সমাধান চাইলো ছেলের বাপ। সেও মহা উৎসাহে বাতলে দিলো সহজ উপায় : ঐ এসআই আনোয়ারকে নগদ এক লাখ টাকা দিয়ে দিলেই কেস ডিসমিস হয়ে যাবে। রাতের মধ্যেই ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আসবে, পরিবারের সবার সঙ্গে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমাতে পারবে তার কাননের একমাত্র নন্দন!
আলতাফ মিয়া একটু গাই-গুই করে রেটটা কমাতে অনুরোধ করে তাকে। সে তো গ্রামেরই ছেলে। তার কি উচিত না একই গ্রামের মানুষকে একটু উপকার করা। সুযোগ বুঝে আতরও দান মেরে দেয়। নগদ পাঁচ হাজার টাকা বাগিয়ে এক লাখকে পঞ্চাশে নামিয়ে আনে। ওদিকে থানায় গিয়ে এসআই আনোয়ারকে বোঝাতে সক্ষম হয় বহুকষ্টে পঞ্চাশে রাজি করিয়েছে, এরচেয়ে বেশি চাইলে ছেলের বাপ বিগড়ে যেতে পারে। পঞ্চাশেই খালাস করে দেয়া উচিত। আনোয়ার জানোয়ারের মতো দৃষ্টি হেনে সন্দেহ করলেও রাজি হয়ে যায়।
যাইহোক, রাত সাড়ে দশটার মধ্যে থানার ভেতরে একরুমে ব্যাপারটা ফয়সালা করতে বসে আলতাফ মিয়া আর এসআই আনোয়ার। আতরও সেখানে উপস্থিত ছিলো, কিন্তু সব ওলট-পালট হয়ে যায় পঞ্চাশ হাজার টাকা লেনদেন করতে গিয়ে। আচমকা সেখানে হাজির হয় স্থানীয় এমপির এক ভাতিজা। ছেলেটা বয়সের চেয়ে বেশি সেয়ানা। এমপি-চাচার পাওয়ারের গরম তাকে অকালে পাকিয়ে ফেলেছে। তারা জানতে পারে, আলতাফ মিয়ার বখে যাওয়া ছেলের জানেদোস্ত এই পাকনা ছেলেটি!
কপাল খারাপ হলে যা হয়, ঐদিন রাতেই কী একটা জরুরি কাজে এমপিসাহেব সুন্দরপুরে চলে এসেছিলো। ক্ষমতাধর চাচাকে কাছে পেয়ে ভাতিজার আধ-কেজির কলিজা বেড়ে সোয়া-কেজি হয়ে যায়। থানায় ঢুকে হাতেনাতে ধরে ফেলে পঞ্চাশ হাজার টাকার লেনদেন। আলতাফ মিয়ার ছেলের তার মতো একজন বন্ধু থাকতে সামান্য এক এসআইকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়ে ম্যানেজ করতে যাবে কেন? তাহলে আর ক্ষমতাধর এমপির ভাতিজা হয়ে কী লাভ হলো!
তা তো বটেই। আলতাফ মিয়ার হাসি সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছায় তখন। যেনো পুচকে এক ত্রাণকর্তা নাজেল হয়েছে তার ছেলেকে উদ্ধার করতে। মুহূর্তে পুরো ঘটনা তালগোল পাকিয়ে গেলো। সুন্দরপুরের ওসি এসব কিছুই জানতো না। সব শুনে সেও ক্ষেপে আগুন। তাকে না জানিয়ে, ভাগ না দিয়ে দিনের পর দিন এসআই না-জানি কতো মুরগি ধরে এনে ‘ডিম খেয়েছে!
পঞ্চাশ হাজার তো গেলোই এমনকি আতরকেও কিছুক্ষণ আগে বাগিয়ে নেয়া পাঁচ হাজার টাকা হাতজোড় করে ফিরিয়ে দিতে হলো। ওসির হাতে তিন-চারটা চরখাপ্পড় আর এমপির ভাতিজার থ্রেট’ ছাড়াও অশ্রাব্য গালিগালাজ উপরি হিসেবে জুটে গেলো তার কপালে।
আতর ভেবেছিলো কয়েকদিনের মধ্যে এসআই আনোয়ার বদলি হয়ে যাবে উচ্চারণ করতে কষ্টকর খাগড়াছড়ি কিংবা রাঙ্গামাটির কোনো অখ্যাত থানায়। কিন্তু তা হয় নি। তবে ঐদিনের পর থেকে আতরের জন্য সুন্দরপুর। থানা কপ্লেক্সে ঢোকাটা নিষিদ্ধ হয়ে যায়। ওসির কাছ থেকে পুনরায় ডাক না পেলে তার পক্ষে থানায় ঢোকা সম্ভব হবে না। এসআই আনোয়ার অবশ্য তাকে আশ্বাস দিয়েছে, কিছুদিন পর সব ঠিক হয়ে যাবে।
সুতরাং থানার কথা বললেও সাংবাদিককে হোটেলে নামিয়েই ভ্যানটা নিয়ে সে সোজা চলে যায় একরামের ডেরায়। দিন দিন তার গাঁজার ব্যবসা ফুলে-ফেঁপে উঠছে। প্রতিদিন তার কাছ থেকে একশ টাকা আর দুটো গাঁজার স্টিক নজরানা হিসেবে নেয়। সে যে থানায় ঢুকতে পারে না, ওসির কাছে। অপদস্থ হয়েছে এসব কথা যদি একরাম জানতে পারে তাহলে দু-পয়সাও দেবে না। আতরের আশংকা, খুব জলদি থানা থেকে ডাক না পেলে খবরটা চাউর হতে আর বেশি সময় নেবে না। যাইহোক, একরামের ডেরা থেকে বখরা আর দুটো স্টিক নিয়ে রওনা দেয় বড় কবরস্তানের দিকে।
এখন কবরস্তান থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে গাঁজার স্টিকে জোরে জোরে টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ছে সে। এর আগে ফালু পোলাটার দিকে তার নজর খুব একটা পড়ে নি। একজন গোরখোদকের ব্যাপারে নাক গলাতে যাবে কে? মানুষজন কবরস্তান আর গোরখোদক পারতপক্ষে এড়িয়েই চলে। ফালু কি করে, কোথায় যায়, কিভাবে থাকে সে-সব নিয়ে কোনো আজাইরা আর ভাদাইমা লোকও মাথা ঘামাবে না। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে পোলাটার দিকে নজর দেয়া দরকার ছিলো। তার অ্যাডভান্স কবর খোদা-খুদির ব্যাপারটা আমলেই নেয় নি এতোদিন। এখন তো দেখতে পাচ্ছে ঐ ডাইনির সাথে তলে তলে তার দারুণ খাতির! নিশ্চয় কোনো ব্যাপার আছে ওদের মধ্যে। আর এটা তাকে জানতেই হবে। সুন্দরপুরে এতোবড় ঘটনা ঘটবে আর আতর কিছু জানতে পারবে না তা তো হয় না।
শেষ কটা টান দিয়ে গাঁজার স্টিকটা মাটিতে ফেলে কবরস্তানের দিকে এগিয়ে গেলো সে। সাবধানে ছোটো ছোটো ঢিবির মতো কবরগুলো এড়িয়ে চলে গেলো ফালুর ঝুপড়ি ঘরের সামনে। কবরস্তানের একমাথায় বড়সড় দুটো কাঁঠাল গাছের পাশে ওটা অবস্থিত। ভেতরে কেউ আছে বলে মনে হচ্ছে না। বেড়ার ফাঁকফোকর দিয়ে ঘরের ভেতরে উঁকি মারলো। ঘুটঘুটে অন্ধকার। দরজাটা ধাক্কা দিতেই দেখলো ওটা ভেতর থেকে বন্ধ করা নেই। বাইরে দরজার কয়ড়ার সাথে ছোটো একটা টিপ-তালা ঝুলছে। নিশ্চিত হলো ফালু ঘরে নেই।
