একটা ব্যাপারে সে নিশ্চিত, মুশকান জুবেরি রহস্যময়ী একটি চরিত্র। এ পর্যন্ত তার সম্পর্কে খুব সামান্যই জানতে পেরেছে, তাতেই মনে হচ্ছে মহিলার অনেক গোমড় রয়েছে। আর সেগুলো সুকৌশলে, অত্যন্ত যত্নের সাথে লুকিয়ে রাখে সে। রবীন্দ্রনাথে মহিলা যেভাবে তার দিকে তাকিয়েছিলো সেটা মনে করলো আবার সেই দৃষ্টি মোটেও স্বাভাবিক ছিলো না। চাহনিতে কিছু একটা ছিলো। অব্যক্ত, অব্যাখ্যাত কিছু। যেনো সব কিছু টের পেয়ে গেছে!
তার স্থির বিশ্বাস, মুশকান জুবেরির সমস্ত গোমড় লুকিয়ে আছে দুটো জায়গায়-যেখান থেকে এসেছে আর এই সুন্দরপুরে যেখানে সে থাকে, ঐ জমিদার বাড়িতে। বাড়িটা দূর্গের মতোই। বিশ্বস্ত লোকজন ছাড়া কেউ ঢুকতে পারে না ওখানে। তার ধারণা রবীন্দ্রনাথে তেমন কোনো রহস্য নেই, তবে ওটার অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে হয়তো। প্রতিদিন অসংখ্য লোকজন আসে খাওয়া-দাওয়া করতে-এমন জায়গায় আর যা-ই হোক রহস্য থাকবে না। রবীন্দ্রনাথ সম্ভবত মহিলার একটি অ্যালিবাই! কিংবা নিছক পাগলামি।
ছফা নিশ্চিত, মুশকান ঢাকা থেকে এসেছে। এর পক্ষে বেশ যুক্তিও আছে তার কাছে। প্রথমত, মি. জুবেরি দীর্ঘদিন ঢাকার একটি হাসপাতালে ছিলেন। অন্তত মহিলার দাবিমতো তাদের বিয়ে হবার সময়কালে। মুশকানের সাথে যদি জুবেরির আদৌ দেখা হয়ে থাকে-রমাকান্তকামারের মতো ছফারও এ ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে-তাহলে সেটা ঢাকাতেই। হয়েছে। দ্বিতীয়ত, মুশকানের সাথে ক্ষমতাসীন এমপির খুব ভালো সম্পর্ক। আর কে না জানে, ওরকম হোমরাচোমরারা যে যেখানেই থাকুক, তারা ঢাকাতেই পড়ে থাকে। এই দেশটা ঢাকাকেন্দ্রীক। ঐ মহিলা যদি ঢাকা থেকে এসে থাকে তাহলে খুব দ্রুতই অনেক কিছু জানা যাবে।
আরেকটা ব্যাপার নিয়ে চিন্তিত, সে এখানে কেন এসেছে, কি করতে এসেছে সেটা ঐ মহিলার পক্ষে জানা অসম্ভব। তার আচরণে এমন বাড়াবাড়ি কিছু ছিলো না যে মহিলা সন্দেহ করবে। এখন পর্যন্ত এক আতর আলী ছাড়া এখানকার কারো সাথে সে মেশেও নি। যার-তার কাছ থেকে মহিলার ব্যাপারে জানতেও চায় নি। এখানে আসার পর থেকে প্রতিটি পদক্ষেপ খুবই সতর্কতার সাথে ফেলেছে। রমাকান্তকামার তার ব্যাপারে মহিলাকে কিছু বলবে সে সম্ভাবনাও ক্ষীণ। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে মুশকানের সাথে মাস্টারের সম্পর্ক নেই। তারপরও মহিলা কিছু একটা টের পেয়ে গেছে।
স্বজ্ঞা?
নাকি প্রজ্ঞা?
মাথা দোলালো ছফা। এসবের কিছুই না। এটা হলো অপরাধীর সেই চিরায়ত আচরণ-যে ভালো করেই জানে সে কি করেছে। সুতরাং অন্যদের চেয়ে বেশিই সতর্ক থাকবে সে।
একটু আগে ইনফর্মার আতরকে যখন সে বললো হোটেলে ফিরে যাবে তখন লোকটা জানালো কী একটা কাজে তাকে পাশের গ্রামে যেতে হবে। কথাটা শুনে খুশিই হয়েছিলো ছফা। ইনফর্মারকে দুশ’ টাকা ধরিয়ে দিয়ে বিদায় করতে চেয়েছিলো কিন্তু পারে নি। টাকা পেয়ে বিগলিত হয়ে একটা খালি ভ্যান-রিক্সায় তাকে তুলে দিয়ে সে নিজেও উঠে বসে, হোটেলের কাছেই নাকি সে যাবে। ফলে বাধ্য হয়ে তাকে হোটেলে ফিরে আসতে হয়।
হাতঘড়িতে সময় দেখে নিলো। এখনও খুব বেশি সময় পার হয় নি। বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালো সে। সুতীব্র কৌতূহল তাকে ঘরে আটকে রাখতে পারলো না। চার্জার থেকে মোবাইলফোনটা খুলে পকেটে ভরে বেরিয়ে গেলো সে।
*
আতর আলী থানায় যায় নি। যাবার কোনো কারণও নেই। তারপরও থানায় যাবার ভান করেছে সাংবাদিককে বুঝিয়ে দেবার জন্য যে, ইনফর্মার হিসেবে এখনও বহাল তবিয়েতে আছে সে। আদতে বেশ কিছুদিন ধরে থানার ত্রি সীমানায়ও যায় না। থানা থেকে কবে যে ডাক পড়বে তার কোনো ঠিক নেই।
কয়েক দিন আগে একটা ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছিলো সে। ভুলটা অবশ্য তার একার ছিলো না কিন্তু শাস্তিটা তাকে একাই পোহাতে হচ্ছে। কাক কাকের মাংস খায় না, পুলিশও পুলিশের দোষ খুঁজে পায় নি। পেলেও শাস্তি দেবার বেলায় ভয়ানক কৃপনতা দেখিয়েছে।
সুন্দরপুর থানার এসআই আনোয়ারের সাথে বেশ খাতির তার। দু-জুনে মিলে দীর্ঘদিন ধরেই বাণিজ্য করে আসছিলো। টাউন আর গ্রামের নিরীহ অথচ সচ্ছল পরিবারের সন্তানদের ধরে এনে টাকার বিনিময়ে থানা থেকে ছাড়িয়ে দেবার ধান্দাটা চলছিলো নির্বিঘ্নেই। প্রতিরাতে এসআই আনোয়ার হাজার-হাজার টাকা কামাচ্ছিলো আর তা থেকে সামান্য ভাগ পাচ্ছিলো। আতর। এমনও রাত গেছে, তিন-তিনটি আদম ধরে এনেছে আর সবগুলোই আতরের ইনফর্মেশনে। সে-ই খবর দিয়েছিলো, লুঙ্গি-ব্যবসা করে পুবপাড়ার আলতাফ মিয়া বেশ ভালো টাকা কামাচ্ছে; এখানে সেখানে জায়গা-জমিও কিনছে; তার কলেজ পড়ুয়া ছেলে টুকটাক গাঁজা-ফেন্সিডিলও ধরেছে খারাপ ছেলেপেলের পাল্লায় পড়ে; সুতরাং মুরগি হিসেবে ছেলেটা বেশ ভালো ডিমই দেবে!
কথামতোই এসআই আনোয়ার, যাকে তার স্বভাব-চরিত্রের জন্যে স্বগোত্রীয় পুলিশ আর পরিচিতজনেরা আড়ালে-আবডালে জানোয়ার বলে ভাকে, আলতাফ মিয়ার বখে যাওয়া ছেলেটাকে ধরে আনলো থানায়। কপাল খারাপ, ঐসময় ছেলেটার সাথে নিষিদ্ধ মাদকজাতীয় কিছু ছিলো না। বাড়ি থেকে একটু দূরে, প্রাইমারি স্কুলের মাঠে বন্ধুবান্ধব নিয়ে আড্ডা মারছিলো সে। তাতে অবশ্য সমস্যা হয় নি। কেউ নিষিদ্ধ জিনিস সঙ্গে নিয়ে ঘোরাফেরা করার আগপর্যন্ত তো সে অপেক্ষা করতে পারে না। আইনের হাত অনেক লম্বা, কিন্তু জানোয়ারের হাত শুধু লম্বা নয়, অনেক বেশি নোংরাও। সেই নোংরা হাত যার উপরে পড়বে তার পকেটে গাঁজা, ফেন্সিডিল, ইয়াবা আপনা আপনিই চলে আসবে।
