“সে ভয় পেয়েছিলো কেন?”
“ও দেখছে, বেটি রাইতের বেলায় ডাইনি হইয়া যায়?”
“তাই নাকি?!” বিস্মিত হলো ছফা।
“আমি কইলাম ওর কথা বিশ্বাস করি নাই..” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে, “…পরে বুঝলাম, হাসমত মিছা কয় নাই।”
ইনফর্মারের দিকে তাকালো ছফা। লোকটার চোখমুখ খুবই সিরিয়াস। “আপনি পরে কিভাবে বুঝতে পারলেন এটা?” উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করলো সে।
আতর আলী কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বললো, “বেটি এইহানে নাড় গাঁডবার পর থিকাই হের কাম-কাইজ আমার কাছে সুবিধার মনে হইতাছিলো না। একদিন করলাম কি, সাহস কইরা রাইতের বেলায় বেটির বাড়িতে ঢুইকা পড়লাম।”
“কী বলেন? দারোয়ান ছিলো না মেইনগেটে?”
অশ্লীল হাসি দিলো ইনফর্মার। “বোবা তহন লীলা-খেলায় মশগুল!”
ভুরু কুচকে তাকালো নুরে ছফা। “মানে?”
“ঐ বোবা আর বেটির ফুটফরমাশ খাটে যে মাইয়াটা…ওগোর মইদ্যে একটা লাইন আছে, বুঝলেন?” দু-হাতের তর্জনী আঙটার মতো আর্টকে এক চোখ টিপে বললো সে।
মাথা নেড়ে সায় দিলো ছফা। বুঝতে পেরেছে সে। “কিন্তু এই খবর আপনি কিভাবে জানলেন? আর ওইদিন ওরা এসব করছে সেটাই বা বুঝতে পারলেন কিভাবে?”
মুচকি হাসি দিয়ে বলতে শুরু করলো আতর, “আমাগো টাউনে তো একটাই ডিপিনচারি..হাফিজ মিয়া চালায়…আমি একদিন রাইতের বেলা বোবারে হাফিজ মিয়ার দোকান থেইকা ফোকনা কিনতে দেখলাম…”
ফোকনা মানে যে কনডম সেটা বুঝতে পারলো ছফা।
“ আমি তো তাজ্জব…বোবা একটা আবিয়াত্তা পোলা…হে ওইটা দিয়া কী করবো? কার লগে করবো!”
ছফা উদগ্রীব হয়ে রইলো বাকি কথা শোনার জন্য।
“আমি করলাম কি, বোবার পিছন পিছন হাটা দিলাম। বোবায় জমিদার বাড়িতে গিয়া ঢুকলো কিন্তু গেট লাগাইয়া সোজা বাড়ির ভিতরে যে ঢুকছে তো ঢুকছেই, গেটে আহনের আর নাম নাই…”
“আপনি বাইরে থেকে এটা কিভাবে দেখলেন? গেটের গ্রিলগুলো তো প্লেইন-শিট দিয়ে বন্ধ করে দেয়া?”
“আরে, তহন গেটটা লোহার শিকের আছিলো..বাইরে থেইকা সব দেখা যাইতো…পরে বেটি ঢাইকা দিছে।”
“ও।” ছফা আর কিছু বললো না।
“বোবারে গেটে না দেইখা আমি দেয়াল টপকাইয়া ঢুইকা পড়লাম ঐ বাড়িতে।”
“ ছফা প্রশংসার দৃষ্টিতে তাকালো ইনফর্মারের দিকে। “বলেন কি! তারপর?”
“জানালা দিয়া অনেক ট্রাই করছিলাম কিন্তু কিছু দেখবার পারলাম না। বাত্তি জ্বালানো আছিলো না, সব দরজাও বন্ধ…খালি দোতলার একটা ঘরে বাত্তি জ্বলতাছে…তহন আমি দালানের লগে যে বড় আমগাছটা আছে ঐটার উপরে উইঠা গেলাম…” একটু থামলো সে। “আমি মনে করছিলাম বোবার লগে মনে হয় ঐ বেটির ইটিস-পিটিস আছে।”
ছফা কিছু বললো না। ইনফর্মারের জায়গা সে হলেও এরকমই সন্দেহ করতো।
“তয় গাছে উঠার পর চমকায়া গেলাম…দেহি ঐ বেটি দোতলার বারিন্দায় বইসা চেয়ারে দোল খাইতাছে আর গান শুনতাছে…হাতে একটা গেলাস…পরথমে বুঝি নাই…পরে ঠাওর কইরা দেখি রক্ত!”
“কি?”
মাথা নেড়ে সায় দিলো ইনফর্মার। “গেলাসে কইরা রক্ত খাইতাছে!”
“কী বলেন?” ছফা অবিশ্বাসে বলে উঠলো। “রক্ত খাচ্ছে?!”
ঢোক গিললো আতর। “আপনে বিশ্বাস করবেন না, এরপর কি হইলো।”
“কি হলো?”
“বেটি ঘাড় ঘুরাইয়া আমার দিকে তাকাইলো! কেমতে জানি বুইঝা গেছিলো আমি গাছের উপরে থেইকা দেখতাছি।”
“মহিলা আপনাকে দেখে ফেললো?”
মাথা নেড়ে সায় দিলো ইনফর্মার। “হ।”
“তারপর কি করলো?”
“বেটি কিছুই করলো না…খালি আমার দিকে চায়া রইলো, ডাইনির মতো মিচকা হাইসা মুখ ঘুরায়া চেয়ারে দোল খাইতে খাইতে রক্ত খাইতে লাগলো আবার! যে কিছু হয় নাই!”
“কী বলেন? আপনাকে দেখেও উনি কিছুই করলেন না? চিৎকার চেঁচামেচি করলেন না?” ছফা অবিশ্বাসে বলে উঠলো। “আজব তো!”
“আরে আজবের কী দেখছেন! আসল কথা তো এহনও কই-ই নাই। আমার জায়গায় অন্য কেউ হইলে গাছ থেইকা পইড়া যাইতো ঐদিন…পাতলা পায়খানা শুরু কইরা দিতো!”
ভুরু কুচকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো ছফা।
“বাপের জন্যেও আমি এমন কিছু দেহি নাই!”
“কী দেখেছিলেন আপনি?”
“ঐ বেটি যহন আমার দিকে তাকাইছে তহন তার চক্ষু দুইটা আগুনের মতো জ্বলতাছিলো! আন্ধারে বিলাই আর শিয়ালের চোখ যিমুন জ্বলে তার চায়াও বেশি! কুনো মানুষের চক্ষু এমন কইরা জ্বলে, ক?”
ইনফর্মারের দিকে অবিশ্বাসে তাকালো ছফা। “মহিলার চোখ দুটো জ্বলছিলো?”
.
অধ্যায় ৯
সুরত আলীর হোটেলে ফিরে জামা-কাপড় না ছেড়েই মোবাইলফোনটা নিয়ে বিছানার উপরে চুপচাপ বসে আছে ছফা। ব্যাটারির চার্জ একদম শেষ। চার্জে দিয়ে জরুরি একটা ফোন করার পর থেকেই এভাবে বসে আছে সে। কিছু অব্যাখ্যাত প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তার মাথায়। তারচেয়েও বড় কথা সীমাহীন এক কৌতূহল তাকে অস্থির করে তুলেছে।
একজন গোরখোদক কেন রাতের বেলায় মুশকান জুবেরির বাড়িতে যাবে? মহিলার সাথে ঐ গোরখোদকের কি সম্পর্ক? আর আতর আলী যে ভয়ানক গল্পটা বললো সেটাই বা কতোটুকু সত্যি? যেখানে শিক্ষিত লোকজনই ভূতপ্রেতের মতো কুসংস্কারে বিশ্বাস করে, অতিপ্রাকৃত গালগল্পে। আস্থা রাখে সেখানে এই গণ্ডগ্রামের অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত লোকজন কী দেখে কী বলছে কে জানে! কিন্তু আতরের কথাগুলো তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে পারছে না। লোকটা নিরীহ কোনো গ্রামবাসী নয়, খুবই ধুরন্ধর আর টাউট টাইপের। পুলিশের সাথে তার নিত্য ওঠা-বসা। এখানকার মাদকব্যবসা থেকে শুরু করে সব ধরণের অপকর্মের সাথে জড়িত। ভয়-ডরও খুব একটা নেই।
