কিচেন টেবিলসংলগ্ন সিঙ্কে দু-হাত ভালোমতো ধুয়ে নীচু হয়ে কিচেন টেবিলের নীচ থেকে একটা মাঝারি আকারের পাত্র তুলে আনলো। পাত্র ভর্তি মাংস। সেই সকাল থেকে তেতুল মিশিয়ে রেখে দিয়েছে। সে জানে, মাংসের অনেক ভেতরে ঢুকে পড়েছে তেতুলের রস। মাংস নোনতা, তেতুল টকা নোনতা আর টকের মিশ্রণ কতোটা ভালো হয় সেটা দেখার জন্যই এটা করেছে। মাংসগুলো হাত দিয়ে টিপে দেখলো। বেশ নরম হয়ে উঠেছে। নীচ হয়ে আরেকটা ছোটো পাত্র তুলে নিলো এবার। সবুজ রঙের ঘন তরলে ভরা। পুদিনা পাতার ভর্তা এটি। পাত্রটা উপুড় করে সবটা ঢেলে দিলো মাংসের পাত্রে। এবার টেবিলের নীচ থেকে একটা বোতল নিয়ে মুখটা খুলে লাল টকটকে তরল ঢালতে শুরু করলো। প্রায় আধ বোতল ঢেলে দেবার পর রেখে দিলো ওটা। দু-হাত দিয়ে পাত্রের মাংসগুলো দলাই মলাই করলো কিছুক্ষণ। এরপর পাত্রটা তুলে একটা বার্নারের উপর বসিয়ে সুইচ টিপে আগুন জ্বালিয়ে দিলো। অটো ইগনিশান বার্নার, তাই দেয়াশলাইয়ের দরকার পড়ে না। বার্নারের আগুন একেবারে কমিয়ে ঢিমেতালে করে রাখলো। আস্তে আস্তে উত্তাপ পেয়ে মাংসগুলো ধীরে ধীরে রান্না হবে। দ্রুত করলে এর যে-রকম স্বাদ আশা করছে তা কোনোভাবেই পাওয়া যাবে না। পাত্রটার উপর ঢাকনা দিয়ে ঘরের এককোণে চলে গেলো সে।
অসংখ্য জার থেকে একটা অসচ্ছ জার নামিয়ে আনলো মুশকান, রাখলো কিচেন টেবিলের উপর। এই জারের ভেতরে কি আছে বোঝা যাচ্ছে না। জারের মুখটা খুলে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। চোখেমুখে স্পষ্ট দ্বিধা। আলতো করে নীচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরলো সে। অবশেষে সমস্ত দ্বিধা ঝেড়ে জারটা আবার আগের জায়গায় রেখে দিলো।
ক্যাবিনেটে রাখা এক সাইজের অসংখ্য বোতলের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো সে। এগুলোই তার আসল সিক্রেট। রেসিপি সিক্রেট রাখাটা প্রায় অসম্ভব। তারপরও কাজটা করা যায়। পুরনো ঢাকার এক বাবুর্চির কাছ থেকে সে শিখেছিলো কিভাবে নিজের হাতের জাদু সংরক্ষণ করা যায়। লোকটা যে স্বাদের মোরগপোলাও রান্না করতো সেটা কেউ নকল করতে পারতো না। এর কারণ সে পোলাও রান্না হবার মাঝখানে বিশেষ কিছু মিশিয়ে দিতো! কি মেশাতে মুশকানকে সে জানিয়েছিলো। খাসির মাথা প্রক্রিয়া করে অল্পকিছু মসল্লার সাহায্যে গরম পানিতে সেদ্ধ করতে করতে এক ধরণের সুপ বানাতো। সাঙ্গোপনে নিজের সাগরেদসহ এবং সবার আলেক্ষ্য সেই সুপ ঢেলে দিতো মোরগপোলাওয়ে। ব্যস, অসাধারণ একটি স্বাদের জন্ম হতো। আইডিয়াটা দারুণ লেগেছিলো মুশকানের। এটাকে সে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে এখন। রবীন্দ্রনাথের রেসিপিগুলোতেও একই কৌশল খাটায় সে।
আয়েশী ভঙ্গিতে বার্নারের কাছে গেলো এবার। পাত্রের ঢাকনা খুলে দেখে নিয়ে চামচ দিয়ে এক টুকরো মাংস মুখে পুরে চেখে দেখলো। ঢাকনাটা আবার পাত্রের উপরে চাপিয়ে দিয়ে বানারের আগুন একদম কমিয়ে দিলো।
ঘরের বাতি নিভিয়ে বাইরে থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিলো।
*
মানুষজনের পাদ মারার খবরও রাখে যে আতর আলী তার কোনো ধারণাই নেই গোরখোদক ফালু কেন মুশকান জুবেরির বাড়িতে যাচ্ছে।
এই মহিলার সাথে ফালুর সম্পর্কটাই বা কি সেটাও তার অজানা। ছফার কাছে অদ্ভুত ঠেকলো ব্যাপারটা, আর সেটা ইনফর্মারের কাছে একদমই লুকালো না।
“আপনি এখানকার সব খবর রাখলেও আমার মনে হচ্ছে এই মহিলার ব্যাপারে আপনার জানাশোনা একদমই কম।”
আতর আলী গাল চুলকে নিলো একটু। তার অক্ষমতা নিয়ে কথা বলছে সাংবাদিক। এদিকে আত্মপক্ষ সমর্থন করার মতোও কিছু নেই। কথাটা একদম সত্যি। এই মহিলা সম্পর্কে খুব কমই জানে, কিনতু সে যতোটুকু জানে বাকিরা তাও জানে না। ফিসফাস করে কিছু কথা বলে-দূর থেকে বাঁকাচোখে দেখে জমিদার বাড়ি আর অদভুত রেসটুরেন্টটি-এই তো। এর বেশি কিছু করার কথা তারা চিন্তাও করতে পারে না। লোকাল এমপিকে যে মহিলা আঁচলে বেঁধে রেখেছে তাকে ঘাটানোর সাহস হবে কার?
“ঐ বেটি এইখানকার না…কইখেকা আইছে তাও কেউ কইবার পারবো না…মানুষের লগে মেশেও না…” নিজের পক্ষে সাফাই গাইলো ইনফর্মার। “…খালি এমপি, ডিসি, এসপির লগে হের খাতির…হেগোরে শাড়ির নীচে রাখে…হের ব্যাপারে নাক গলানোর সাহস এই সুন্দরপুরের কারোর নাই।”
ছফা কিছু না বললো না। তারা এখন জমিদার বাড়ি থেকে একটু দূরে বিরাট একটি বটগাছের নীচে দাঁড়িয়ে আছে। এখান থেকে একটা সরু পথ চলে গেছে মেইনরোডের দিকে। এ-পথ দিয়েই মুশকান জুবেরির গাড়ি যাতায়াত করে।
“লোকজন আবার হেরে এটু ডরায়ও।”
আতরের দিকে তাকালো ছফা। “কেন?”
ইনফর্মার গলাটা নীচে নামিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বললো, “ঐ বেটি একটা ডাইনি।”
এর আগেও আতরের মুখ থেকে এ কথাটা শুনেছে সে। “আপনি ঐ মহিলাকে ডাইনি কেন বলেন, একটু খুলে বলেন তো?”
“আপনেরা শহরের মানুষ, আমাগো কথা বিশ্বাস করবেন না। মনে করবেন মুখু মাইনষের গালগপ্প।”
“না, না। আপনি বলেন। আপনার কথা অবশ্যই বিশ্বাস করবো। আপনি তো অন্য সবার মতো নন।”
মনে হলো কথাটা শুনে আতর খুশি হয়েছে। “তাইলে হূনেন, হাসমত চোরা নামের এক পোলা আছে আমাগো গেরামে…হে অনেকদিন আগে রাইতের বেলায় বেটির বাড়িতে ঢুকছিলো চুরি করবার মতলবে, কিন্তু ঐ বাড়িতে ঢুইকা সে এমন ডরন ডরাইছে…কী আর কমু?”
