“ম্যালা বড়…আগের দিনের জমিদার বিরাট বাড়ি, জোড়া পুকুর…একটা পুরুষগো লাইগা…আরেকটা মাইয়া মানুষের…” মুচকি হাসলো আতর, “বিরাট বাড়ি, বাগান, পুকুর না থাকলে কি জমিদার কওন যায়?” আবারো পেছন ফিরে তাকালো। “বাড়িটা এটু দেখবেন নাকি?”
“না। আজ থাক কাল যাবো। আজ অনেক রাত হয়ে গেছে।”
“ঐ বাড়ির সামনে দিয়াই কিন্তু যাইতে হইব…ইচ্ছা করলে দুর থেইকা একটু দেইখা নিতে পারেন?”
দ্বিধায় পড়ে গেলো ছফা। “যাওয়ার পথেই পড়বে ওটা?”
মাথা নেড়ে সায় দিলো আতর। “আমরা তো কবরস্তান দিয়া শর্টকাট না মাইরা ঘুরপথে যাইতাছি..ঐ বাড়ির সামনে দিয়াই কইলাম যাইতে হইবো।”
“ঠিক আছে…তাহলে চলেন।”
পাঁচ মিনিট পর আতর দু-পাশে ঘন ঝোপের মধ্য দিয়ে চলে যাওয়া একটি রাস্তা ধরে এগোতে লাগলো।
“এইখান থেইকা বাড়ির সীমানা শুরু.. শ্যাষ হইছে এক্কেবারে নামায় গিয়া..বিরাট বড় বাড়ি…দৌড়ায়াও শ্যাষ করবার পারবেন না।”
ছফা জানে নীচু ভূমিকে অনেক জায়গায় ‘নামা’ বলে। আতরের পাশপাশি হাটছে সে। দু-হা কিছুই বললো না। চারপাশে তাকিয়ে দেখছে। একটা মোড় নিতেই দেখা গেলো একটু দূরে বিশাল একটি গ্রিলের দরজা। পুরনো আমলে বড়-বড় বাড়িতে এরকম সদর-দরজা দেখা যেতো। তবে গ্রিলের পেছনে পাতলা টিন লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। সম্ভবত এটা করেছে। মুশকান জুবেরি। ফলে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে ভেতরের কিছু দেখা যায় না এখন।
প্রায় আট-নয় ফিটের মতো উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘেরা মূল বাড়িটা। দেয়ালগুলোর পেছনে বড় বড় গাছ আর ফাঁকে ফাঁকে দেয়াল ডিঙিয়ে বাইরে চলে আসা লম্বা ঝোঁপগুলো যেনো আরো বেশি আড়াল করে দিয়েছে অন্দরমহলটাকে। হঠাৎ মাটির দিকে চোখ যেতেই থমকে দাঁড়ালো সে।
আতরও দাঁড়িয়ে পড়লো। “আর সামনে যাইবেন না?”
ছফা বুঝতে পারলো না কী বলবে। “না…মানে…” তার চোখ এখনও মাটির দিকে।
“কী দেখতাছেন?” আগ্রহভরে জিজ্ঞেস করলো ইনফর্মার।
“মহিলার কি গাড়ি আছে?”
“হ। জমিদারের বৌ..গাড়ি না থাকলে চলে?”
একটু থেমে আবার বললো, “দুইটা গাড়ি আছে…একটা মালপত্তর টানে, আরেকটা বেটি নিজে চালায়। ক্যান, কি হইছে?”
“না। কিছু না।” মুখ তুলে তাকালো ছফা। মেইনগেট থেকে রেললাইনের মতো সমান্তরাল দুটো মেঠোপথ চলে গেছে তাদের পেছন পর্যন্ত। সে কিছু বলতে যাবে তার আগেই পেছন থেকে একটা শব্দ শুনতে পেলো। ফিরে তাকালো তারা। আবছা অন্ধকারে বোঝা গেলো না কিন্তু কেউ একজন যে তাদের দিকে হেঁটে আসছে সে-ব্যাপারে কোনো সন্দেহ। নেই। যে আসছে তার পদক্ষেপ বেশ ভারি।
আতরের একটা হাত টান দিয়ে পাশের ঝোপের আড়ালে চলে গেলো
“কি হইছে?” চাপাকণ্ঠে বললো বিস্মিত ইনফর্মার।
“এই লোকটা নিশ্চয় জমিদার বাড়িতে যাচ্ছে।”
“হ। তো কি হইছে?”
“আমি চাই না সে আমাদের এখানে দেখুক।”
আতর আর কিছু বললো না, চুপ মেরে রইলো।
একটু পরই দেখতে পেলো বলশালী এক যুবক হেলেদুলে আসছে। তাদের পাশ দিয়ে যাবার সময় যুবকের আবছা অবয়ব দেখতে পেলো তারা।
“এই পোলা এইখানে কী করতে আইছে!” যুবকের অপসৃয়মান অবয়বের দিকে তাকিয়ে থেকে ভয়ার্ত কণ্ঠে বলে উঠলো আতর।
“ছেলেটা কে?”
“ফালু!”
“ফালু?” বুঝতে না পেরে বললো ছফা।
“আমাগো কবরস্তানে গোর খুদে।”
অ্যাডভান্স কবর খুরে রাখে যে! “ও এখানে কী করতে এসেছে?” ছফাও যারপরনাই বিস্মিত হলো এবার।
.
অধ্যায় ৮
ঝড় উঠেছে তপ্ত হাওয়ায় হাওয়ায়।
মনকে সুদূর শূন্যে ধাওয়ায়
অবগুণ্ঠন যায় যে উড়ে
চক্ষে আমার তৃষ্ণা…
গুণগুণ করে গাইতে গাইতে দরজাটা ভালো করে বন্ধ করে দিলো মুশকান।
ঘরটা প্রায় অন্ধকার, তাই আলো জ্বালিয়ে দিলো, সেই আলো বড় টিমে। ঘরের চারপাশে দেয়াল জুড়ে কতোগুলো ক্যাবিনেট। কিছু ক্যাবিনেটের কপাটে কাঁচ লাগানো, ভেতরে কি আছে সবই দেখা যায়, তবে বাকিগুলোর ভেতরের জিনিস দেখার কোনো উপায় নেই। এখানে বড় বড় জারে অদভুত সব জিনিস সংরক্ষিত করা আছে। দেখলে যে কেউ ভাববে এখানে বুঝি প্রাণীদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংরক্ষণ করা হয়।
ঘরের এককোণে চমৎকার একটি কিচেন টেবিল। মার্বেল পাথরের উপরিভাগটা একদম পরিস্কার। কতোগুলো কিচেন নাইফ আর বিভিন্ন ধরণের কিচেন-সরঞ্জাম আছে টেবিলের পাশেই। বড় বড় বেশ কয়েকটি হাড়ি-পাতিল আর পাত্রও দেখা যাচ্ছে। কিচেন টেবিলের কাছেই রয়েছে দুটো। গ্যাস-বনার। একটি আদর্শ রান্নাঘর এটি। বেশ আধুনিকও বটে।
এটাই মুশকানের ল্যাবরেটরি, এখানেই সে খাবার নিয়ে গবেষণা করে। নিত্যনতুন খাবার আর স্বাদ তৈরি করার কারখানা। দিন এবং রাতের অনেকটা সময় এই ল্যাবরেটরিতেই কাটিয়ে দেয় সে। এখানেই সীমিত পরিসরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায়। কোনটার সাথে কোটা মেশাবে, কতটুকু মেশাবে, আর কতোক্ষণ ধরে মেশাবে সবই পরীক্ষা করে। ঘরে রান্না করার সব ধরণের সরঞ্জাম থাকলেও একটি পরিচিত জিনিস নেই-প্রেসার কুকার।
মুশকান কখনও প্রেসার কুকার ব্যবহার করে না। প্রেসার কুকারে করা খাবার কখনও মুখেও দেয় না সে। এই জিনিসটা তার সুক্ষম জিভের জন্য বিষ! রান্নার মতো একটি শিল্পকে প্রেসার কুকার সত্যি সত্যি খুব চাপের মধ্যে ফেলে দিয়ে চিড়ে-চ্যাপ্টা করে দেয়। এটা হলো কিলিয়ে কাঁঠাল পাকানোর মতো ব্যাপার। ফলাফল যা হবার তা-ই। স্বাভাবিক স্বাদ আর পাওয়া যায় না। ওটা হারিয়ে যায় প্রচণ্ড চাপে পড়ে! মুশকান বুঝতে পারে না মানুষ কেন এই জিনিসটা ব্যবহার করে। রান্না করা যদি এতোই ঝামেলার কাজ মনে করে। তাহলে বাইরে থেকে খাবার কিনে এনে খায় না কেন? চটজলদি খাবার উদর ভরতে পারে, কিন্তু মন ভরাতে পারে না। বাজে রান্না আর বাজে স্বাদের খাবার জিভকে ভারি করে তোলে, জিভের সমস্ত সুক্ষমতাকে ধ্বংস করে দেয়। বিভিন্ন স্বাদের পার্থক্য বুঝতে হলে জিভকে নিরন্তর সুরক্ষা করতে হয়। অবশ্য যারা খাবারকে পেট ভরার জিনিস মনে করে তাদের কথা আলাদা। এই জনপদের ইতিহাস হলো অভাব আর দুর্ভিক্ষের ইতিহাস। এখানে পেট ফুলিয়ে খাওয়াই স্বস্তির ব্যাপার।
