আতরের বিশ্রী হাসিটা আরো প্রকট হয়ে উঠলো চাঁদের আলোয়। “বুঝলেন না?” তারপর কোনো জবাবের আশা না করেই বলতে লাগলো, “এমপিসাব এহন ঐ বেটিরে শাদী করবার চায়।”
“আপনাদের এমপি কি বিবাহিত না?”
হা-হা-হা করে হাসলো পুলিশের ইনফর্মার। “ঘরে বউ থাকলে কি ব্যাটমানুষ আর বিয়া করবার চাইবো না?”
এ কথার কোনো জবাব দিলো না ছফা।
“হূনেন, আমাগো এমপির বাপ-দাদারা সবতে তিন-চাইরটা কইরা বিয়া করছে..এহন সে যদি বাপ-দাদার ইজ্জত রাখতে চায়, তারে তো কমসে কম দুইটা বিয়া করনই লাগে, নাকি?”
কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে আবার সে বললো, “এমপি যে ঐ মহিলাকে বিয়ে করতে চায় এটা কি এখানকার সবাই জানে?”
“সবাই জানবো কেমনে? এতো ভিতরের খবর তো সবৃতে জানোনের কথা না।”
“ঐ মহিলা কি এই বিয়েতে রাজি হচ্ছে না?” রবীন্দ্রনাথের ভেতরে প্রাইভেট রুম থেকে গম্ভীর মুখে এমপির বের হয়ে যাওয়ার দৃশ্যটা ভেসে উঠলো ছফার চোখে।
“ঐ বেটি এতো সহজে রাজি হইবো নি…আজব!”
“কেন রাজি হবে না?”
“আরে, ঐ বেটি ভালা কইরাই জানে বাকি জায়গা-জমি খাওনের ধান্দায় এমপিসাব হেরে দুই নম্বর বিবি বানাইবার চাইতাছে।”
“এতো জমির মালিক হবার পরও এমপি আরো চাইছে?”
আতর এমনভাবে তাকালো ছফার দিকে যেনো সে দিন-দুনিয়া সম্পর্কে যথেষ্ট আনাড়ি। “পুলিটিশিয়ানগো খিদা কুনোদিন শেষ হয় না..বুঝলেন। হেরা কব্বরে গেলেও খাই-খাই করে।”
মুচকি হাসলো ছফা। আজব একটা দেশ। সে এখন পর্যন্ত এমন কোনো জায়গায় যায় নি যেখানকার লোকজন রাজনীতিবিদদের পছন্দ করে, তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বলে, অথচ যুগ যুগ ধরে এদেরকেই ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসিয়ে যাচ্ছে।
“আমাগো ওসিসাব কি কয় জানেন?”
“কি বলে?”
“ওসিসাব কয়, ঐ বেটি এমপিরে জাদু করছে। নাকে দড়ি লাগায়া ঘুরাইতাছে হেরে। বেটি কুনোদিনও এমপিরে বিয়া করবো না…কিনতু ডাইরেক্ট না-ও করবো না। এইটাই বেটির চালাকি।”
“হুম।” ছফা আর কিছু বললো না। তার মাথায় এখন ঘুরছে অন্য চিন্তা।
ক্ষেত পেরিয়ে একটা বসতবাড়ির পাশ দিয়ে যাবার সময় করুণ সুরে মেয়েমানুষের কান্নার শব্দ ভেসে এলো।
“বুঝলেন কিছু?” পেছন ফিরে বললো আতর।
“কি?” ছফা কিছুই বুঝতে পারছে না।
“ফালুর অ্যাডভান্স কব্বর তো এইবারও মিস হইলো না মনে হইতাছে!”
কথাটা বলার সময় ইনফর্মারের মুখে শোকের লেশমাত্র দেখা গেলো না, যেনো খুব মজার কিছু ঘটে গেছে।
আরেকটু এগোতেই এক নারীকণ্ঠের বিলাপ কানে এলো। সুরে সুরে কেঁদে চলেছে সে।
“আমি এহন কেমনে একলা থাকুম…ও তমিজের বাপ! তুমি আমারে রাটি কইরা কেমনে চইলা গেলা!”
হাসিটা জোর করে চেপে রাখলো ছফা। মনে মনে নিজেকে ভর্ৎসনা করলো এজন্যে। কিন্তু সুর করে কাউকে কাঁদতে শুনলে নিজের হাসি চেপে রাখতে পারে না। শৈশব থেকেই এটা হয়ে আসছে। নিকটজন হারিয়ে মানুষজন যখন সুর করে বিলাপ করতে শুরু করে ছফার তখন বড় হাসি পায়। সে জানে এটা নির্মম, অসভ্যতা। পৈশাচিকও বটে।
“কতো কইতাম, আদারে-পাদারে হাগামুতা কইরো না…হ্ৰনলা না! আমার কথা তুমি হ্ৰনলা না?”
মৃত্যুর মতো করুণ ব্যাপারের সাথে হাগা-মুতার কী সম্পর্ক ভেবে পেলো সে। ভেতরে হাসির দমক আরো বেড়ে গেলো। দ্রুত পা চালিয়ে বিলাপের সুর আর বাণী থেকে নিজেকে দূরে নিয়ে যাবার চেষ্টা করলো কিন্তু আতর আলীর হাটা এখন গদাইলস্করি হয়ে গেছে। সে হাগা-মুতার সাথে মৃত্যুর সংযোগ নিয়ে মাথা ঘামাতে লাগলো।
“তমিজের বাপ এখলাস মিয়া গুয়ের গাড়ায় পইড়া মরছে মনে লয়।”
ছফা কিছু বললো না।
“..বুইড়া আবার পায়খানায় কাম সারতে ডরায়…খোলা জায়গা না হইলে বেটার হাগা বাইর অয় না। এইটা নিয়া বউ-বাচ্চারা খোটা দিতো,” একমনে বলে যেতে লাগলো আতর।
ছফা বুঝতে পারলো তমিজের বাপের এমন আচরণ করার কারণটা কি। অনেকেই ক্লয়স্ট্রোফোবিয়ায় আক্রান্ত হয়। আবদ্ধ কোনো জায়গায় বেশিক্ষণ থাকতে পারে না, দম বন্ধ হয়ে আসে, এক ধরণের ভীতি জেঁকে ধরে। গ্রামের মানুষ এসব জটিল বিষয় বোঝে না। তারা মনে করে এগুলো নিছক কোনো বাতিক।
“সারাজীবন খোলা জায়গায় আর গাছের নীচে কাম সারতো…অভ্যাস হইয়া গেছিলো আর কি।”
ছফা এই প্রসঙ্গটা পাল্টাতে চাইলো। “আচ্ছা, ঐ মহিলা…মানে মুশকান জুবেরি কি জমিদার বাড়িতে একাই থাকে?”
“না। একটা মাইয়া থাকে লগে।”
“আর কেউ না?” অবাক হলো সে। এরকম গ্রামে বিরাট একটি বাড়িতে দু-দুটো মেয়েমানুষ একা থাকে!
“বোবা ইয়াকুবও থাকে…পোলাটা দারোয়ানের কাম করে।”
“এই তিনজন? আর কেউ না?”
“জমিদার বাড়িতে এরাই থাকে, তয় বাড়ির সীমানার বাইরে চাইরদিকে বোসবাবুর অনেক জায়গাজমি আছে…ওইহানে কিছু লোকজন থাকে।”
“ওরা কারা?”
“এই ধরেন গরুর খামারের লোকজন, মাছ চাষ দেখাশোনা করে যারা..শাক-সবজি…আরো কতো কি যে করে বেটি তার কুনো ঠিক নাই
ছফা বুঝতে পারলো মহিলা জায়গা-জমিগুলোর ভালোমতোই সদ্ব্যবহার করছে।
“বেটির কইলাম সাহস আছে,” বললো আতর। চলতে চলতেই পেছনে ফিরে তাকালো সে। “সাহস না থাকলে এমুন জায়গায় আইসা নাড় গাঁড়বার পারে, কন?”
“মহিলার সাথে যে মেয়েটা থাকে সে কে? কোনো আত্মীয়?”
“আরে, না। ওই মাইয়াটাও কাম করে…ফয়-ফরমাশ খাটে আর কি।”
একটু চুপ থেকে বললো ছফা, “ঐ জমিদার বাড়িটা কি অনেক বড়?”
