ছোটাচ্চু চোখ ছোট ছোট করে জিজ্ঞেস করল, “কার কাছে শুনেছ?”
ফারিহাপু একটু অস্বস্তি নিয়ে বলল, “টুনি আর প্রমি আমাকে বিয়ের দাওয়াত দিতে গিয়েছিল, তারা বলছিল।”
“তারা কী বলছিল?”
“তোমার শরীরটা নাকি ভালো নাই।”
“আমার শরীর ভালো আছে।”
ফারিহাপু বলল, “ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলে?”
ছোটাচ্চু একটু গলা উঁচিয়ে বলল, “কেন খামোখা ডাক্তারের কাছে যাব?”
ফারিহাপু একটু আহত দৃষ্টিতে ছোটাচ্চুর দিকে তাকাল, তারপর কোনো কথা না বলে নিচের দিকে তাকিয়ে রইল। ছোটাচ্চু কিছুক্ষণ তার নখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “তোমার কাজ কেমন চলছে?”
“ভালো।”
ছোটাচ্চু বলল, “ভালো?”
ফারিহাপু বলল, “মোটামুটি।”
তারপর জিজ্ঞেস করল “তোমার কাজ কেমন চলছে?”
ছোটাচ্চু বলল, “মোটামুটি।”
ফারিহাপু বলল, “তোমার নতুন স্টাফ কেমন?”
“ভালো।”
ফারিহাপু বলল, “ও।”
তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “তোমার মনে হয় একবার ডাক্তারের কাছে যাওয়া দরকার।”
ছোটাচ্চু এবারে কেমন যেন রেগে গেল, বলল, “কেন তুমি একটু পরপর ডাক্তারের কথা বলছ?”
“কারণ শরীর খারাপ হলে ডাক্তারের কাছে যেতে হয়।”
“আমার শরীর খারাপ হয় নাই।”
“এই সব অসুখ তাড়াতাড়ি ধরতে পারলে ভালো করে ফেলা যায়।”
ছোটাচ্চু এবারে অবাক হয়ে বলল, “কোন সব অসুখে?”
“তোমায় যেটা সন্দেহ করছে।”
“আমায় কোনটা সন্দেহ করছে?”
ফারিহাপুর হঠাৎ করে মনে পড়ল, টুনি তাকে বলে দিয়েছিল সে যেন ছোটাচ্চুকে তার অসুখের কথা জিজ্ঞেস না করে–কিন্তু এখন মনে হয় একটু দেরি হয়ে গেছে!
ছোটাচ্চু আবার জিজ্ঞেস করল, “আমার কোনটা সন্দেহ করছে?”
ফারিহাপু বলল, “থাক। ছেড়ে দাও।”
“না। কেন ছেড়ে দেব? তোমাকে বলতে হবে।”
ফারিহাপু একটু অবাক হয়ে ছোটাচ্চুর দিকে তাকিয়ে রইল, “বলল, তুমি আমার সাথে এরকম করে কথা বলছ কেন?”
“কী রকম করে কথা বলছি?”
“রেগে রেগে। যেন আমি তোমাকে দেখতে এসে দোষ করে ফেলেছি।”
“তুমি আমাকে মোটেই দেখতে আসো নাই। তুমি পোলাপানের পুতুলের বিয়েতে এসেছ।”
ফারিহাপু ঠাণ্ডা গলায় বলল, “তুমি আমার সাথে যেরকম ব্যবহার করেছ আমার কোনোদিন তোমার সাথে কথা বলাই ঠিক না। শুনলাম খুব শরীর খারাপ তাই ভাবলাম–”
ছোটাচ্চুর হঠাৎ কেমন যেন সন্দেহ হলো, ফারিহাপুর দিকে ঘুরে বলল, “একটু পরে পরে বলছ আমার খুব শরীর খারাপ। টুনি-প্রমি কি শরীর খারাপ বলেছে?”
কাজটা ঠিক হবে কি না ফারিহাপু ঠিক বুঝতে পারল না, কিন্তু তারপরেও মাথা নাড়ল, “বলেছে।”
“কী বলেছে?”
“বলেছে–” ফারিহাপু আবার থেমে গেল।
“কী বলেছে?”
“বলেছে তোমার ব্লাড ক্যান্সার হয়েছে।”
“ব্লা-ড-ক্যা-ন্সা-র!!” বলে ছোটাচ্চু একটা গগনবিদারি চিৎকার দিল। ঘরের বাইরে জানালার নিচে উবু হয়ে বসে টুনি ছোটাচ্চু আর ফারিহাপুর কথাগুলো শোনার চেষ্টা করছিল, ছোটাচ্চুর এই গগনবিদারি চিৎকার শুনে সে বুঝে গেল তাদের এই বিশাল পরিকল্পনা (কিংবা ষড়যন্ত্র) ফাঁস হয়ে গেছে।
ফারিহাপু একটু অবাক হয়ে বলল, “কী হয়েছে? তোমার ব্লাড ক্যান্সার হয় নাই?”
“ব্লাড ক্যান্সার কেন–আমার ব্লড ডিসেন্ট্রিও হয় নাই।”
“তাহলে যে বলল—”
“আর কী কী বলেছে ঐ মিচকি শয়তান ঐ পিছলা পাঙাস মাছ?”
“বলেছে তুমি ঘুমের মাঝে আমার নাম ধরে ডাকাডাকি করো—”
ছোটাচ্চু গরম হয়ে বলল, “আর কী বলেছে?”
“বলেছে যে তুমি বলেছ বাংলা সাহিত্যে পোস্ট মডার্ন পোয়েট্রি নাই–”
ছোটাচ্চু হুংকার দিয়ে বলল, “আমি বলি নাই।”
“তুমি ঘুমের মাঝে বলেছ।”
“আমি ঘুমের মাঝে বলি নাই।”
ছোটাচ্চু আর ফারিহাপু একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর ছোটাচ্চু একটা চাপা গর্জনের মতো শব্দ করল, বলল, “আর তুমি কি শুনতে চাও ঐ ফাজিল ডাবল ক্রস বাইম মাছ আমার কাছে কী বলেছে?”
ফারিহাপু একটু ভড়কে গিয়ে বলল, “কী বলেছে?”
“বলেছে তুমি দিন-রাত কবিতা পড়ে এখন জানতে পেরেছ যে বাংলা সাহিত্যে উত্তর আধুনিক কবিতা আছে।”
ফারিহাপু বলল, “আমি বলি নাই।”
আরো বলেছে, “আমার সাথে ব্রেক-আপ হওয়ার কারণে তোমার এত মন খারাপ যে তুমি চাকরি ছেড়ে দিচ্ছ-”
“আমি চাকরিটা ছেড়ে দিব কিন্তু অন্য কারণে।”
ছোটাচ্চু বলেছে, “আর বলেছে”
“কী বলেছে?”
“বলেছে তুমি বলেছ আমার হৃদয়টা ফাটাফাটি–”
“ফাটাফাটি?”
ছোটাচ্চু মাথা নাড়ল, তারপর দাঁত কিড়মিড় করে বলল, “ঐ পাজির পা ঝাড়া মিচকি শয়তান পিছলা পাঙাসগুলো কী করেছে দেখেছ? তুমি দেখেছ?”
ফারিহাপু মাথা নাড়ল। ছোটাচ্চু হিংস্র বাঘের মতো গর্জন করে বলল, “আজকে আমি খুন করে ফেলব। সবগুলোর মাথা টেনে ছিঁড়ে ফেলব, ধড় থেকে আলাদা করে ফেলব–” তারপর হুংকার দিয়ে ডাকল, “টুনি–প্রমি–শান্ত-কোথায় তোরা?”
প্রথমে কোনো সাড়া-শব্দ নেই। ছোটাচ্চু দ্বিতীয়বার হুংকার দেওয়ার পর আস্তে আস্তে সবাই মাথা নিচু করে ঘরের ভিতর ঢুকল। ঘরে ঢুকে মেঝের দিকে তাকিয়ে সবাই নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল।
ছোটাচ্চুর নাক দিয়ে গরম বাতাস এবং চোখ দিয়ে আগুন বের হচ্ছিল, সে বাচ্চাগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল, “তোদের এত বড় সাহস? আমাদের কাছে মিথ্যা কথা বলিস? আমাদের সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলিস? এই বয়সে এই রকম মিথ্যা কথা বলা শিখেছিস, বড় হয়ে তোদের কী হবে? হার্ডকোর ক্রিমিনাল হবি?”
কেউ কোনো কথা বলল না, বড়রা যখন রেগে যায় তখন তাদের রাগটা বের হতে দেওয়ার জন্যে সুযোগ দিতে হয়। তখন কথাবার্তা বলা ঠিক না।
