ছোটাচ্চু আবার বলল, “কোথা থেকে এই দুই নম্বরি কাজকর্ম শিখেছিস? আমি কিছু বলি নাই দেখে বেশি লাই পেয়ে গেছিস? খুন করে ফেলব সবগুলোকে। মাথা টেনে ছিঁড়ে ফেলব–আমার সাথে রংবাজি? আমার সাথে গিরিংবাজি? আমার সাথে মামদোবাজি?”
ছোটাচ্চু টানা চিৎকার করতে থাকল, শেষ পর্যন্ত যখন দম নেবার জন্যে একটু থেমেছে তখন টুনি দুর্বলভাবে বলল, “ছোটাচ্চু তুমি এত রাগ হচ্ছে কেন? তোমার কপাল ভালো যে আমরা অরিজিনাল প্যানে যাই নাই। দুই নম্বর প্ল্যানটা নিয়েছি।”
ছোটাচ্চু একেবারে হকচকিয়ে গেল, বলল, “অরিজিনাল প্যান? সেটা আবার কী?”
“অরিজিনাল প্ল্যানটা আরো ডেঞ্জারাস ছিল। ঝুমু খালার প্ল্যানগুলো সবসময় ডেঞ্জারাস হয়।”
“ঝুমু খালা? এর মাঝে ঝুমু খালা কোত্থেকে এসেছে?”
টুনি বলল, “এইসব ব্যাপারে ঝুমু খালা খুব ভালো প্ল্যান দিতে পারে।”
ছোটাচ্চু গরম হয়ে বলল, “একটু পরিষ্কার করে বলবি, কোন সব ব্যাপার?”
টুনি ঠাণ্ডা গলায় বলল, “না বোঝার কী আছে? তুমি না এত বড় ডিটেকটিভ, তুমি বুঝতে পারছ না কোন সব ব্যাপার?”
ছোটাচ্চু এবারে কেমন যেন থতমত খেয়ে গেল, ব্যাপারটা কী বুঝে গেল, তখন তাদের দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করতে লাগল। যার অর্থ এখন প্রতি-আক্রমণ করার সময় হয়েছে, টুনি প্রথমে প্রতি আক্রমণ শুরু করল, বলল, “তোমরা বড় মানুষেরা ঝগড়া করবে আর আমাদের সেটা সামলাতে হবে?”
আরেকজন বলল, “তোমরা জানো আমরা তোমাদের জন্যে কত কষ্ট করেছি?”
আরেকজন বলল, “এত বড় হয়েছ, এখনো ছোট বাচ্চাদের মতো ঝগড়া করো, তোমাদের লজ্জা করে না?”
ছোট একজন বলল, “ছোট বাচ্চারা মোটেই ঝগড়া করে না। বড় মানুষেরা ঝগড়া করে।”
আরেকজন বলল, “ঝগড়া করেছ তো করেছ, এখন মিটমাট করে ফেলবে না?”
আরেকজন বলল, “একজন ছেলে দেবদাস আরেকজন মেয়ে দেবদাস।”
“ঝগড়া করার কোনো কারণ আছে? উত্তর না কি দক্ষিণমুখী কবিতা নিয়ে ঝগড়া।”
“কবিতা উত্তরমুখী হলে হবে, দক্ষিণমুখী হলে হবে–তোমরা সেটা নিয়ে কেন ঝগড়া করবে?”
শান্ত বলল, “দুনিয়া থেকে কবিতা জিনিসটাই উঠিয়ে দেওয়া দরকার। দুনিয়ার সব ঝামেলা করে কবিতা। সব কবিদের ধরে ফাঁসি দিয়ে দেওয়া দরকার।”
কবিতা কখন ঝামেলা করল এবং কবিদের ফাঁসি দিয়ে সেই সমস্যা কীভাবে মেটানো যাবে সেটা কেউ বুঝতে পারল না, এবং সেটা নিয়ে কেউ মাথা ঘামাল না। প্রতি-আক্রমণের সময় এগুলো নিয়ে মাথা ঘামাতে হয় না, সবাই মিলে হইচই চিৎকার করতে থাকে।
হঠাৎ করে রিনরিনে গলায় গুচ্ছু বলল, “এখনই একজন আরেকজনকে ধরে চুমু খাও”
ছোটাচ্চু চোখ বড় বড় করে গুড়ুর দিকে তাকাল, বলল, “এই পাজি ছেলে, তুই চুমু খাওয়ার কী বুঝিস?”
“আমি সিনেমায় দেখেছি।”
“কী সিনেমা দেখিস আজকাল?”
“বড়দের সিনেমা।”
“তুই বড়দের সিনেমা দেখিস? সাহস তো কম না–”
“ছোটদের সিনেমা নাই, আমি কী করব?”
টুনিও তখন সাহায্য করার জন্যে এগিয়ে এলো, বলল, “গুড্ডু যখন আম্মুর সাথে ঝগড়া করে তখনো তো আম্মু গুচ্ছুকে আদর করে চুমু খায়। সেজন্যে বলেছে।”
বাচ্চারা হঠাৎ করে লক্ষ করল ফারিহাপু মুখে আঁচল দিয়ে হাসি থামানোর চেষ্টা করছে। শুধু তা-ই না, ছোটাচ্চু খুব রেগে আছে। সেরকম ভঙ্গি করলেও মুখের মাঝে একটা চাপা হাসি উঁকি দিতে শুরু করেছে। সবাই বুঝতে পারল খুব দ্রুত বিপদ কেটে যাচ্ছে।
ফারিহাপু এতক্ষণ কথা বলে নাই, এই প্রথম কথা বলল, “তোমাদের অরিজিনাল প্ল্যানটা এখনো শোনা হয়নি।”
শান্ত বলল, “এটা না শোনাই ভালো।”
“শুনি তবুও।”
টুনি একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “তোমরা যখন ঝগড়া করেছ তখন তোমাদের যেরকম মন খারাপ হয়েছিল আমাদের তার থেকে বেশি মন খারাপ হয়েছে। তোমাদের ঝগড়া কীভাবে মিটানো যায় সেটা নিয়ে আমাদের একটা মিটিংয়ে ঝুমু খালা ছিল। ঝুমু খালা বলেছে তাদের গ্রামে একশ’ কুড়ি না হলে একশ’ চল্লিশ বছর বয়সের জরিনি বেওয়া থাকে, তার পান পড়া দুইজনকে দুইটা দিলে সাথে সাথে মিলমিশ হয়ে যাবে।”
প্রমি বলল, “কিন্তু আমরা সেই পান পড়া কোথায় পাব?”
টুনি বলল, “আমি অবশ্যি ভাবিজ, কবজ, পান পড়া বিশ্বাস করি। মনে নাই–”
টুনি কী মনে করানোর চেষ্টা করছে ছোটাচ্চু খুব ভালো করে বুঝতে পারল, তাই তাড়াতাড়ি বলল, “হ্যাঁ, মনে আছে, মনে আছে—”
“তাই আমরা অন্য কী করা যায় চিন্তা করছিলাম।”
প্রমি বলল, “ঝুমু খালা বলল, মেয়েদের মন খুব নরম হয় তাই যদি ছোটাচ্চুর কঠিন কোনো অসুখ হয় তাহলে ফারিহাপু সবকিছু ভুলে ছুটে এসে মিলমিশ করে ফেলবে।”
শান্ত বলল, “কঠিন অসুখ হচ্ছে কলেরা না হয় যক্ষ্মা। সেই রোগের জীবাণু কই পাব?”
টুম্পা বলল, “তখন ঝুমু খালা বলল, বড় অসুখ যদি না করানো যায় তাহলে ঠ্যাঙ ভেঙে দিলেও হবে।”
ছোটাচ্চু এবারে একটা চিৎকার করে উঠল, “ঠ্যাং ভেঙে দিবে?”
টুনি মাথা নাড়ল, বলল, “হ্যাঁ। সেইটা ছিল অরিজিনাল প্ল্যান। সিঁড়ির মাঝে কলার ছিলকে রেখে তোমাকে একটা ধাক্কা দিবে, কলার ছিলকের উপর পা পড়ে সিঁড়ি দিয়ে তুমি গড়িয়ে পড়বে।”
টুম্পা মনে করিয়ে দিল, “শান্ত ভাইয়া সেইটা করবে!”
টুনি বলল, “তোমার খুশি হওয়া উচিত ছিল যে, আমরা অরিজিনাল প্ল্যানটা কাজে লাগাই নাই। তার বদলে এই প্ল্যানটা কাজে লাগিয়েছি।”
