একজন জিজ্ঞেস করল, “কার জন্মদিন?”
“আমার!”
প্রমি বলল, “তোমার জন্মদিনের এখনো ছয় মাস বাকি।”
শান্ত বলল, “তাতে কী আছে? একটুখানি মিথ্যা কথা বললে আমি কিছু গিফট পেতাম। সবাই মিলে তোরা যে পরিমাণ মিথ্যা কথা বলছিস তার তুলনায় এইটা কোনো মিথ্যাই না–”
টুনি বলল, “শান্ত ভাইয়া, আমরা শুধু মিথ্যা কথা বলার জন্য এইগুলো করছি না। আমরা অনেক বড় একটা প্রজেক্ট হাতে নিয়েছি–”
সবাই মাথা নাড়ল, বলল, “তা ঠিক।”
“কাজেই খুব সাবধানে কাজ করতে হবে। পুতুলের বিয়েটা ঠিকভাবে করতে হবে, যেন ছোটাচ্চু আর ফারিহাপু ধরতে না পারে, এটা মিছিমিছি।”
প্রমি বলল, “ধরতে পারবে না, আমি দেখব সব কিছু যেন ঠিক করে হয়।”
টুনি বলল, “যখন ফারিহাপু আর ছোটাচ্চু এক জায়গায় আসবে তখন খুব কায়দা করে আমাদের সবার সরে যেতে হবে, যেন তারা দুইজন একলা একলা থাকে, নিজেরা নিরিবিলি কথা বলতে পারে–”
সবাই মাথা নাড়ল, বলল, “ঠিক আছে।”
একজন জানতে চাইল, “যদি ফারিহাপু না আসে?”
টুনি বলল, “আসবে। ব্লাড ক্যান্সারের কথা কি এমনি এমনি বলেছি!”
.
টুনির ধারণা সঠিক, পরদিন বিকালবেলা ফারিহাপু এসে হাজির হলো। নীল রঙের একটা শাড়ি পরে এসেছে, কপালে টিপ, চুলে বেলী ফুলের মালা। তাকে যা সুন্দর দেখাচ্ছে সেটা আর বলার মতো না। বাচ্চারা তাকে ঘিরে লাফাতে লাগল, একজন বলল, “ফারিহাপু, তোমাকে যা সুন্দর লাগছে!”
ফারিহাপু একটু লজ্জা পেল, বলল, “বিয়েতে এসেছি তো তাই একটু সেজে এসেছি।”
“খুব ভালো করেছ, দেখছ না আমরাও সেজেছি!” কথাটা সত্যি, বাচ্চারাও সেজে এসেছে, আর কিছু থাকুক কী না থাকুক, সব মেয়েদের মুখে কটকটে লাল লিপস্টিক।
ফারিহার হাতে একটা মিষ্টির প্যাকেট, সেটা বাচ্চাদের হাতে দিয়ে বলল, “পুতুলের জন্যে কী গিফট আনব বুঝতে পারছিলাম না, তাই এই মিষ্টির প্যাকেটটা এনেছি, পুতুল খেতে পারবে তো?”
টুম্পা বলল, “আমাদের পুতুল সব খেতে পারে!”
ফারিহাপুর সাথে যখন কথাবার্তা হচ্ছে তখন টুনি সটকে পড়ে ছোটাচ্চুর ঘরে হাজির হলো। ছোটাচ্চু তার ঘরে নার্ভাসভাবে বসে আছে। টুনি গিয়ে অবাক হয়ে বলল, “কী হলো ছোটাচ্চু? তুমি বিয়েতে যাবে না?”
‘যাব।”
“তাহলে রেডি হয়ে নাও। এই ময়লা টি-শার্ট পরে যেতে পারবে। একটা পাঞ্জাবি না হলে ফতুয়া পরতে হবে।”
“পরছি।” ছোটাচ্চু একটু ইতস্তত করে বলল, “ইয়ে, মানে ফা-ফারিহা কি এসেছে?”
টুনি ছোটাচ্চুর কথার উত্তর না দিয়ে বলল, “আর তুমি শেভ করো নাই কেন? তোমাকে দেখতে সন্ত্রাসীর মতো লাগছে।”
ছোটাচ্চু গালে হাত বুলিয়ে বলল, “হ্যাঁ করছি।”
তারপর আবার জিজ্ঞেস করল, “ফারিহা কি এসেছে?”
“হ্যাঁ। এসেছে। তাড়াতাড়ি চলো, মনে আছে, তুমি হচ্ছ উকিল বাবা!”
ছোটাচ্চু এবারে খুব তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে গেল, টুনি তখন তার হাত ধরে টেনে বিয়ের আসরে নিয়ে যায়। একটা ছোট টেবিলে বিয়ের মঞ্চ তৈরি হয়েছে, সেখানে রিংকুর মেয়ে বিনু বিয়ের সাজ পরে বসে আছে। পুতুল হওয়ার কারণে নিজে থেকে নড়তে পারে না, কেউ একজন তাকে ধরে নাড়াচাড়া করাচ্ছে। বরযাত্রী এখনো আসেনি, বরযাত্রী চলে এলেই আসল অনুষ্ঠান শুরু হবে।
ঘরের মাঝামাঝি কয়েকটা চেয়ার বসানো হয়েছে, তার একটাতে ফারিহা বসে আছে। টুনি ছোটাচ্চুর হাত ধরে তাকে টেনে এনে ফারিহাপুর কাছে আরেকটা চেয়ারে বসিয়ে দেয়। ঘরের বাচ্চা-কাচ্চারা সবাই চোখের কোনা দিয়ে ছোটাচ্চু আর ফারিহাকে লক্ষ করছে কিন্তু আগে থেকে বলে দেয়া আছে কেউ যেন তাদের দিকে সরাসরি না তাকিয়ে থাকে, তাই সবাই বিয়ের হৈ-হুল্লোড়ে ব্যস্ত আছে, এরকম ভান করতে লাগল।
ফারিহাপুর কাছে চেয়ারে বসে ছোটাচ্চু গম্ভীর মুখে ফারিহাকে বলল, “কেমন আছ?”
ফারিহাপু বলল, “ভালো।”
ছোটাচ্চু বলল, “ও।”
তারপর দুইজন আর বলার মতো কোনো কথা খুঁজে পেল না। দুইজনই মুখ শক্ত করে সামনের দিকে তাকিয়ে বসে রইল, তাদের দেখে মনে হতে থাকে তারা একজন আরেকজনকে চেনে না।
টুনি চোখের কোনা দিয়ে দুইজনকে লক্ষ করে তারপর দরজার দিকে তাকায়। সেখানে গুড্ডু দাঁড়িয়ে আছে। টুনি তাকে একটা সিগন্যাল দিল, তখন গুড্ডু ছুটতে ছুটতে ভিতরে ঢুকে চিৎকার করে বলল, “বরযাত্রী এসে গেছে। বরযাত্রী এসে গেছে।”
তাকে কী বলতে হবে আগে থেকে শেখানো ছিল কিন্তু উত্তেজনার কারণে পুরোটা বলতে পারল না, ‘গেট ধরতে হবে’ কথাটা বলতে ভুলে গেল। কিন্তু তাতে কোনো সমস্যা হলো না, সবাই হইহই করে উঠল, একজন বলল, “চল গেট ধরতে হবে।” মুহূর্তের মাঝে ঘরের সব বাচ্চারা হাওয়া হয়ে গেল। পুরো ঘরের মাঝখানে দুটো চেয়ারে ফারিহাপু আর ছোটাচ্চু বসে আছে। ঘরে কেউ নাই, শুধু টেবিলে বিয়ের সাজে বসে থাকা বিনু চোখের পাতি না ফেলে তাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল।
দুইজনের মাঝে ভয়ঙ্কর একটা অস্বস্তিকর নীরবতা, কী করবে কেউ বুঝতে পারছে না। তখন ফারিহাপু বলল, “তোমার শরীর এখন কেমন আছে?”
ছোটাচ্চু বলল, “ভালো।”
ফারিহাপু বলল, “ও, আচ্ছা।”
আবার দুইজন চুপ করে বসে রইল, কিছুক্ষণ পর ছোটাচ্চু জিজ্ঞেস করল, “তোমার শরীর কেমন আছে?”
ফারিহাপু বলল, “ভালো।”
ছোটাচ্চু বলল, “ও, আচ্ছা।”
আবার কিছুক্ষণ কেটে গেল, তখন ফারিহাপু জিজ্ঞেস করল, “শুনেছিলাম তোমার শরীরটা নাকি ভালো নাই?”
