ফারিহাপু কোনো কথা বলল না, ছোটাচ্চু যেরকম মাছের মতো তাকিয়ে থাকে অনেকটা সেইভাবে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল। টুনি বলল, “আর যদি তোমার সাথে দেখা হয়ে যায় তুমি প্লিজ অসুখের কথা জিজ্ঞেস কোরো না।”
ফারিহাপু এবারেও কোনো কথা বলল না। টুনি একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে মুখ কালো করে বলল, “কাউকে নিজের অসুখের কথা বলতে চায় না। অসুখটা মনে হয় খুব ডেঞ্জারাস-ছোটাচ্চু মনে হয় বেশি দিন বাঁচবে না।”
.
প্রমি আর টুনি রাস্তায় নামার পর প্রমি টুনির ঘাড় খামচে ধরে বলল, “আমি জীবনে তোর মতো মিথ্যুক দেখি নাই। চোখের পাতি না ফেলে তুই এতগুলো মিথ্যা কথা কেমন করে বললি?”
টুনি বলল, “এইগুলো মিথ্যা কথা না। এইগুলো ছোটাচ্চু আর ফারিহাপুকে একত্র করার জন্যে একটা প্রজেক্ট।”
প্রমি মাথা নাড়ল, “তুই যাই বলিস, তোর মতো ডেঞ্জারাস মানুষ এই দুনিয়ায় নাই। যদি ফারিহাপু আর ছোটাচ্চু আসল ব্যাপারটা জানতে পারে তাহলে কী হবে চিন্তা করতে পারিস? তোকে তো খুন করেই ফেলবে আমাদের সবাইকেও খুন করে ফেলবে।”
টুনি বলল, “সেইটা পরে দেখা যাবে। এখন ভালো করে একটা পুতুলের বিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। বাসায় পুতুল আছে না?”
প্রমি বলল, “খুঁজলে পাওয়া যাবে সব অবশ্যি মেয়ে পুতুল, চুল কেটে ছেলে বানাতে হবে।”
.
বিকালবেলা টুনি ছোটাচ্চুর সাথে দেখা করতে গেল। ছোটাচ্চু তার সেই মোটা বইটা নিয়ে বসে আছে, খুব বেশি পড়া হয়েছে বলে মনে হয় না। টুনি আজকে বেশি ভূমিকার দিকে গেল না, সরাসরি কাজের কথায় চলে এলো, বলল, “আজ সকালে ফারিহাপুর কাছে গিয়েছিলাম।”
মনে হলো কেউ ছোটাচ্চুকে দশ হাজার ভোল্ট দিয়ে ইলেকট্রিক শক দিয়েছে! ছোটাচ্চু বিছানার মাঝে বসে থেকেই একটা লাফ দিল, প্রায় আর্তনাদ করে বলল, “কার কাছে গিয়েছিলি?”
“ফারিহাপুর কাছে।”
“কেন?”
“মনে নাই টুম্পার ছেলের সাথে রিংকুর মেয়ের বিয়ে? তুমি উকিল বাবা! ফারিহাপুকে বিয়ের দাওয়াত দিতে গিয়েছিলাম।”
ছোটাচ্চু বলল, “ফা-ফা–ফা-” কথা শেষ করতে পারল না কিন্তু টুনি অধৈর্য হলো না, চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। ছোটাচ্চু শেষ পর্যন্ত “ফারিহা” উচ্চারণ করতে পারল, বলল, “ফারিহা আসবে?”
“মনে হলো আসতে চাচ্ছে–কিন্তু তুমি আবার কী মনে করো।”
ছোটাচ্চু ব্যস্ত হয়ে বলল, “আমি আবার কী মনে করব?”
“দেখলাম খুবই মন খারাপ।”
“মন খারাপ? কী নিয়ে মন খারাপ?”
“মনে হয় তোমার সাথে ব্রেক-আপ হয়ে গেছে সেই জন্যে।”
“সত্যি?” ছোটাচ্চুর চোখ কেমন যেন জ্বলজ্বল করতে থাকে।
“হ্যাঁ।” টুনি উদাসীন একটা ভাব করে বলল, “অনেক কথা বলল।”
“কী কথা?”
“সব কথা তো আমি বুঝি না। যেমন ধরো, উত্তর আধুনিক কবিতা।”
ছোটাচ্চু নিঃশ্বাস বন্ধ করে বলল, “কী বলেছে উত্তর আধুনিক কবিতার কথা?”
“বলছিল গত কিছুদিনু অনেক কবিতা পড়েছে–পড়ে তার মনে হয়েছে তোমার কথা ঠিক। বাংলা সাহিত্যে মনে হয় উত্তর আধুনিক কবিতা আছে।”
“তাই বলেছে?”
“হ্যাঁ। আরো বলেছে মাথা থেকে হৃদয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তোমার মাথা যেরকমই হোক তোমার হৃদয়টা নাকি ফাটাফাটি।”
ছোটাচ্চু এবারে বিছানায় সোজা হয়ে বসে বলল, “তাই বলেছে? ফাটাফাটি শব্দটা ব্যবহার করেছে?”
“ফাটাফাটি শব্দ বলেছে কি না এখন আর মনে নাই। তবে বুঝিয়েছে ফাটাফাটি। তা ছাড়া–”
“তাছাড়া কী?”
“ফারিহাপুর আজকাল কিছুই ভালো লাগে না। চাকরি ছেড়ে দেবে বলেছে।”
“চাকরি ছেড়ে দেবে? কেন?”
“তোমার সাথে ব্রেক-আপ হয়েছে বলে মনে হয়।”
ছোটাচ্চু অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে রইল, তারপর বিশাল লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। টুনি বলল, “ছোটাচ্চু তোমাকে একটা কথা বলি?”
“বল।”
“যদি সত্যি সত্যি ফারিহাপু চলে আসে তুমি কিন্তু ঝগড়া শুরু করে দিও না।”
ছোটাচ্চু মুখ শক্ত করে বলল, “আমাকে দেখে কি তাই মনে হয় যে আমি শুধু ঝগড়া করে বেড়াই?”
“না তা অবশ্যি মনে হয় না, কিন্তু একবার যখন করে ফেলেছ আবার যেন শুরু না করো সেইটা বলছিলাম।”
“ঠিক আছে।”
“আরেক একটা কথা।”
“কী কথা?”
“আমি যে তোমার সাথে ফারিহাপুর কথাগুলো বলেছি ফারিহাপু যেন সেটা না জানে। আমাদের সাথে খোলামেলা কথা বলেছে–আমরা বলেছি তোমাকে কিছু বলব না।“
“ঠিক আছে।”
ছোটাচ্চু গম্ভীর হয়ে তার মোটা বইটা কোলে টেনে নিয়ে আবার পড়ার ভান করতে লাগল, টুনি তখন সাবধানে ঘর থেকে বের হয়ে এলো।
.
সেদিন সন্ধ্যেবেলা আবার গোলটেবিল বৈঠক, আজকে অবশ্যি টুনিই কথা শুরু করল। বলল, “অনেক সাবধানে একটা ফাঁদ পাতা হয়েছে। সেই ফাঁদে ছোটাচ্চু আর ফারিহাপু দুইজনেই পা দিয়েছে–এখন খুব সাবধান!”
টুম্পা উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কীভাবে ফাঁদ পেতেছ টুনি আপু?”
“ছোটাচ্চুকে বলেছি ফারিহাপু ছোটাচ্চুর জন্যে পাগল। ফারিহাপুকে বলেছি ছোটাচ্চু ফারিহাপুর জন্যে পাগল। শুধু তাই না, ফারিহাপুকে বলেছি ছোটাচ্চু খুবই অসুস্থ, ব্লাড ক্যান্সার সন্দেহ করছে।”
“ব্লাড ক্যান্সার?” সবাই আঁতকে উঠল।
“যা। ছোটখাটো অসুখের কথা বললাম না।”
“এসে যখন দেখবে–”
টুনি থামিয়ে দিয়ে বলল, “এসে কী দেখবে কী হবে সেটা পরে দেখা যাবে। এখন টুম্পা আর রিংকুর পুতুলের বিয়েটা যেন ঠিকমতো হয়।”
শান্ত বলল, “পুতুলের বিয়ে না বলে জন্মদিনের কথা বললে হতো।”
