“টু-টুম্পাটা কে? রিংকু কে?”
প্রমি বলল, “আমাদের ছোট বোন। তাদের আসল ছেলে-মেয়ে, তাদের পুতুলের বিয়ে।”
ফারিহাপুর কয়েক সেকেন্ড লাগল বুঝতে, তখন তার চেহারাটা আবার স্বাভাবিক হলো। তারপর হি হি করে হাসতে লাগল! হাসতে হাসতে বলল, “বৃষ্টি না হলে ব্যাঙের বিয়ে দেয় বলে শুনেছি। কিন্তু পুতুলের বিয়ে–এইটা অনেক দিন শুনিনি।”
প্রমি বলল, “তোমাকে যেতেই হবে ফারিহাপু। সবাই খুব চাইছে।”
এবারে আস্তে আস্তে ফারিহাপুর মুখটা কেমন যেন দুঃখী দুঃখী হয়ে গেল। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল, তারপর একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলল, তারপর নিজের নখগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে দেখল। তারপর ওদের দিকে তাকিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করল, সেটা মোটেও হাসির মতো হলো না, তারপর টেবিলে ঠোকা দিতে দিতে বলল, “আসলে, ব্যাপারটা হয়েছে কী, আমি আসলে তোমাদের বাসায় যেতে পারব না। মানে–আসলে আমার না যাওয়াটাই ভালো।”
প্রমি আর টুনি খুব অবাক হবার ভান করল, বলল, “কেন?”
ফারিহাপু বলল, “তোমরা তো ছোট, তোমাদের ঠিক করে বোঝাতে পারব না। মানে তোমরা তো জানতে তোমাদের ছোটাচ্চু আমার খুব ভালো বন্ধু ছিল।”
দুইজনে জোরে জোরে মাথা নাডুল। ফারিহাপু বলল, “ছোট বেলার বন্ধুত্ব একরকম, যখন মানুষ বড় হয়, ছেলে আর মেয়ের যদি বন্ধুত্ব হয় তখন অনেক সময় বন্ধুত্বটা আরো একটু গভীর হয়, বড় বড় কমিটমেন্টের ব্যাপার আসে—”
ফারিহাপুর কথা আস্তে আস্তে জটিল এবং দুর্বোধ্য হতে শুরু করেছে কিন্তু টুনি আর প্রমি সব বুঝে ফেলছে সেরকম ভান করে মাথা নাড়তে থাকল। ফারিহাপু বলল, “যদি বড় কমিটমেন্টে যেতে হয় তখন আরো ডিটেইলস চলে আসে। দুজন মানুষই যদি ইন্ডিপেন্ডেন্ট হয়, ভেজ যদি খুব স্ট্রং হয় ছোটখাটো ইস্যু ক্রিটিকাল হয়ে যায়”
ফারিহাপু কী বলছে প্রমি আর টুনি কিছুই বুঝতে পারছে না কিন্তু তারা সবকিছু বুঝে ফেলছে সেরকম ভান করে আরো জোরে জোরে মাথা নাড়তে থাকল। ফারিহাপু বলল, “কিন্তু ছোটখাটো ইস্যু আসলে ছোটখাটো না, এগুলো একজন মানুষের পার্সোনালিটি দেখায়। বন্ধুত্বের বেলায় পার্সোনালিটির উনিশ-বিশে কিছু আসে যায় না। কিন্তু বড় কমিটমেন্টের বেলায় এগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষ কী গান শুনে, কার ছবি দেখে, প্রিয় লেখক কে–”
বড় মানুষদের এটা হচ্ছে সমস্যা–একবার কথা বলতে শুরু করলে আর থামতে পারে না। কাজেই ফারিহাপু কথা বলতেই থাকল, বেশিরভাগ জিনিস টুনি বুঝতে পারল না, প্রমি যেহেতু একটু বড় হয়েছে তাই সে হয়তো একটু একটু বুঝল কিন্তু ফারিহাপুর থামার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। যখন মাঝখানে একটু থামল তখন টুনি বলল, “কিন্তু আমরা ভাবছিলাম তুমি আমাদের বিয়েতে আসবে, ছোটাকে একটু দেখেও আসবে, ছোটাচ্চুর এত শরীর খারাপ–”
ফারিহাপু এবারে ইলেকট্রিক শক খাওয়ার মতো চমকে উঠল। ভয় পাওয়া গলায় বলল, “কী হয়েছে শাহরিয়ারের?”
“ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। ডাক্তারের কাছে যেতে চায় না তাই বোঝা যাচ্ছে না। ব্লাড ক্যান্সার সন্দেহ করছে।”
“ফারিহাপু একেবারে চিৎকার করে উঠল, “ব্লাড ক্যান্সার?”
টুনি বুঝল একটু বেশি হয়ে গেছে, এত কঠিন অসুখের কথা বলা ঠিক হয় নাই। কিন্তু এখন আর কিছু করার উপায় নাই–এভাবেই এগুতে হবে। সে মুখ শুকনো করে বলল, “খাওয়ার রুচি নাই, রাতে করে জ্বর ওঠে। সেই দিন–” টুনি ইচ্ছা করে থেমে গেল।
“সেই দিন কী?”
“নাহ্, কিছু না।” টুনি ইচ্ছে করে ভান করল যে, সে কিছু একটা জিনিস ফারিহাপুর কাছে লুকানোর চেষ্টা করছে।
ফারিহাপু হঠাৎ করে শোনার জন্যে ব্যস্ত হয়ে গেল, বলল, “সেই দিন কী হয়েছে বলো?”
টুনি বলল, “আমি ছোটাচ্চুর ঘরের কাছে দিয়ে যাচ্ছি–ছোটাচ্চু ঘুমিয়ে আছে, আমার মনে হলো ছোটাচ্চু ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কথা বলছে, আমার মনে হয় কথাগুলো শোনা ঠিক হয় নাই। ঘুমের মাঝে তো একজন কত কথাই বলতে পারে।” টুনি আবার থেমে গেল।
ফারিহাপু জিজ্ঞেস করল, “কী বলছিল ঘুমের মাঝে?”
“তোমার নাম।”
“আমার নাম?” ফারিহাপুর গাল দুটো মনে হলো একটু লাল হয় উঠল।
“হ্যাঁ। আর বলছিল, আমি ভুল করেছি ফারিহা, তুমিই ঠিক।”
ফারিহাপু একটু ঝুঁকে পড়ল, “তাই বলছিল? কী ভুল করেছে?”
“কথাগুলো ঠিক বুঝতে পারি নাই। মনে হলো উত্তর আধুনিক কী যেন–”
ফারিহাপু বলল, “উত্তর আধুনিক কবিতা। পোস্ট মডার্ন পোয়েট্রি।”
“হবে হয়তো।”
টুনি মুখ গম্ভীর করে বলল, “বলছিল, নাই নাই বাংলা সাহিত্যে নাই–”
“তাই বলছিল?”
“হ্যাঁ। তারপর বিড়বিড় করে কিছু খারাপ জিনিস বলল।”
ফারিহা জিজ্ঞেস করল, “কী খারাপ জিনিস?”
বলল, “ডেড। আমি ডেড। ব্রেন ডেড। বারবার বলল, ব্রেন ডেড।”
ফারিহাপু হঠাৎ গম্ভীর হয়ে চুপচাপ বসে রইল। তখন প্রমি বলল, “আমরা আজকে যাই ফারিহাপু। তোমার অফিসের সময় নষ্ট হচ্ছে।”
ফারিহাপু বিড়বিড় করে বলল, কচু অফিস। ভুয়া অফিস। ফাউ অফিস। অফিসের খেতা পুড়ি।
টুনি আর প্রমি উঠে দাঁড়াল, “আমরা যাই।”
ফারিহাপু অন্যমনস্কভাবে বলল, “ঠিক আছে যাও।”
প্ৰমি বলল, “তুমি যদি টুম্পা-রিংকুর পুতুলের বিয়েতে আসো, সবাই খুব খুশি হবে।”
টুনি বলল, “তুমি যদি চাও তাহলে আমরা ছোটাচ্চুকে ব্যস্ত রাখতে পারি, যেন তোমার সাথে দেখা না হয়।”
