প্রমি মাথা নাড়ল, বলল, “তোর কথা ঠিক। মেয়েদের ভিতরে মায়া বেশি। কারো অসুখ হয়েছে শুনলে মায়া অনেক বেশি হয়। ছোটাচ্চুর যদি বড় কোনো অসুখ হতো তাহলে মনে হয় ফারিহাপু নরম হয়ে যেত। কিন্তু ইচ্ছা করলেই কি বড় অসুখ বানানো যাবে?”
টুনি বলল, “না। কিন্তু—”
“কিন্তু কী?”
“সত্যি সত্যি অসুখ হতে হবে কে বলেছে? আমরা ফারিহাপুকে গিয়ে বলি ছোটাচ্চু খুবই অসুস্থ—”
“আর ফারিহাপু যদি এসে দেখে কোনো অসুখ নাই?”
টুনি মাথা চুলকে বলল, “আমরা এমন একটা অসুখের কথা বলব যেটা হলে বাইরে থেকে দেখে বোঝা যায় না। মনে হয় পুরোপুরি সুস্থ—”
একজন বলল, “পেটের অসুখ?”
টুনি মাথা নাড়ল, বলল, “উঁহু। পেটের অসুখের মাঝে সম্মান নাই। সম্মানী অসুখ হতে হবে।”
“সম্মানী অসুখ কোনটা?”
“হার্ট এটাক। ব্রেন স্ট্রোক এগুলো সম্মানী অসুখ। সব বড়লোকদের এই অসুখ হয়। গরিবের পেটের অসুখ হয়।”
“ছোটাচ্চুর হার্ট এটাক হবে? ব্রেন স্ট্রোক?”
টুনি মাথা নাড়ল, “উঁহু। এইগুলো হাসপাতালে নিতে হয়।”
“তাহলে?”
“চিন্তা করে একটা বের করা যাবে। ইন্টারনেটে গুগল সার্চ দিলেই বের হয়ে যাবে।”
প্রমি জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু ফারিহাপুর কাছে কে যাবে? কেমন করে যাবে? গিয়ে কীভাবে বলবে?”
টুনি বলল, “চিন্তা করে ঠিক করতে হবে। আমাদেরকে এমনি এমনি যেতে দিবে না, আব্দু-আম্মুকে বলার জন্যে একটা ভালো স্টোরি বানাতে হবে। তা ছাড়া–”
“তা ছাড়া কী?”
“ছোটাচ্চু উত্তর আধুনিক না কি একটা নিয়ে বকাবকি করছিল। গণ্ডগোলটা লেগেছে সেখান থেকে। সেইটাও একটু বুঝতে হবে।”
শান্ত মুখ হাঁ করে বলল, “উত্তর আধুনিক? সেটা আবার কী?”
“এক রকম কবিতা।”
“কবিতার উত্তর-দক্ষিণ আছে?”
টুনি মাথা নাড়ল, “আমি জানি না। ছোটাচ্চু বলে উত্তর আধুনিক কবিতা আছে ফারিহাপু বলে নাই–সেই থেকে গোলমাল!”
“কী আশ্চর্য!”
প্রমি চোখ কপালে তুলে বলল, “এটা আবার কী রকম কথা। থাকলে আছে না থাকলে নাই, এ জন্যে ঝগড়া করতে হবে?”
টুনি বলল, “এই হচ্ছে বড়দের সমস্যা। একজন মানুষ যখন বড় হতে থাকে তখন তাদের মাথায় ঘিলু কমতে থাকে! তুমি যখন বড় হবে তখন তুমিও আস্তে আস্তে বোকা হয়ে যাবে।”
সবাই মাথা নাড়ল, শান্ত পর্যন্ত কথাটা মেনে নিয়ে বলল, “ঠিকই বলেছিস! আমিও দিনে দিনে বোকা হয়ে যাচ্ছি। আগে মেয়েদের দেখলে মেজাজ গরম হতো। আজকাল মেয়েদের দেখলে কেমন যেন ইয়ে–”
সবাই শান্তর দিকে ঘুরে তাকাল। প্রমি চোখ পাকিয়ে বলল, “কেমন যেন কিয়ে?”
শান্ত জোরে জোরে মাথা নেড়ে বলল, “না, না-সেরকম কিছু।”
টুনি নিঃশ্বাস ফেলে নিচু গলায় বলল, “শান্ত ভাইয়ার হরমোন কিক করতে শুরু করেছে মনে হয়!”
.
পরের দিন টুনি আর প্রমি ফারিহাপুর সাথে দেখা করতে গেল। কাজটা খুব সহজ হলো না, স্কুল ছুটির পর বন্ধুর বাসায় যাওয়া, ছবি আঁকার ক্লাশ, লাইব্রেরি থেকে বই আনা, সায়েন্স খাতা কেনা–এরকম বেশ কিছু ব্যাপারকে একসাথে সাজাতে হলো। বড় মানুষেরা একটু বোকা হয়, তাই খুব বেশি কঠিন হলো না। সেই তুলনায় ফারিহাপুর অফিসটা কোথায় সেটা বের করা মোটামুটি কঠিন কাজ ছিল, ছোটাচ্চুকে না জানিয়ে কাজটি করতে হয়েছে তাই কাজটি আরো কঠিন হয়ে গিয়েছিল।
শেষ পর্যন্ত প্রমি আর টুনি ফারিহাপুর অফিসে গিয়ে হাজির হলো দুপুরবেলা। ফারিহাপু অফিসে তার চেয়ারে বসে ছাদের দিকে তাকিয়ে ছিল, টুনি আর প্রমি তার সামনে এসে দাঁড়ানোর পরও কিছুক্ষণ তাদের দেখতে পেল না! টুনি যখন গলা পরিষ্কার করে ডাকল, “ফারিহাপু”, তখন চোখ নামিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল, বলল, “আরে! তোমরা?”
টুনি বলল, “হ্যাঁ ফারিহাপু। আমরা তোমার কাছে এসেছি।”
“আমার কাছে?” ফারিহাপু টুনির কথা শুনে একটু অবাক হলো কিন্তু সেটা তাদের বুঝতে দিল না, বলল, “বসো, বসো।”
টুনি আর প্রমি সামনের চেয়ারে বসল। কীভাবে কথা শুরু করবে বুঝতে পারছিল না, ফারিহাপু অবশ্যি ভাব দেখাল যেন ছোটাছুর সাথে ছাড়াছাড়ি হবার পর ছোটাচ্চুর ভাগনি-ভাইঝির তার কাছে চলে আসা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, “তারপর, তোমাদের কী খবর?”
দুইজনে মাথা নেড়ে বলল, “ভালো। খুবই ভালো।”
“গুড। ভেরি গুড।”
টুনি জিজ্ঞেস করল, “আপনার অফিস কেমন চলছে?”
ফারিহাপু গলা নামিয়ে বলল, “ফালতু, খুবই ফালতু।”
“কেন? ফালতু কেন?”
“এইটা একটা এনজিও, গরিব বাচ্চাদের সাহায্য করার এনজিও। সাহায্য না কচু–গরিব বাচ্চাদের নিয়ে বিজনেস করে।”
“সত্যি?”
“হ্যাঁ। চাকরি ছেড়ে দেব।”
“চাকরি ছেড়ে কী করবেন?”
“আর কোনো একটা চাকরি খুঁজে বের করব।”
টুনি মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ছোটাচ্চুর আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সিতে যদি ফারিহাপু আর ছোটাচ্চু দুইজন মিলে কাজ করত, কী মজাই না হতো। দুইজনে ঝগড়া করে এখন ঘাপলা করে রেখেছে। টুনি তার চশমাটা ঠিক করে গলা পরিষ্কার করে বলল, “ফারিহাপু, আমরা তোমাকে একটা দাওয়াত দিতে এসেছি।”
ফারিহাপু একটু অবাক হয়ে বলল, “দাওয়াত?”
“হ্যাঁ।”
“কিসের দাওয়াত?”
“বিয়ের দাওয়াত।”
“বিয়ের?” ফারিহাপুর চেহারাটা হঠাৎ কেমন জানি শীতল হয়ে উঠল, ঠাণ্ডা গলায় জিজ্ঞেস করল, “কার বিয়ে?”
“টুম্পার ছেলের সাথে রিংকুর মেয়ের বিয়ে?”
