“ছোটাচ্চুর অনেক মন খারাপ, কেমন করে তার মন খারাপ দূর করা যায় সেইটা নিয়ে কথা বলছিলাম।”
“এইটা নিয়ে আবার কথা বলার কী আছে? ধইরা বিয়া দিয়ে দাও সব মন খারাপ দূর হয়ে যাবে। এটা হচ্ছে জটিল রোগের সোজা চিকিৎসা।”
এবারে কেউ কোনো কথা বলল না। ঝুমু খালা বলল, “তার তো মেয়ে ঠিক আছে! লম্বা মতন হাসি-খুশি মাইয়াটাফাজিলা না যেন কী নাম–”
“ফারিহা।”
“হ্যাঁ। ফারিহা। চাচিরে কও বিয়ার প্রস্তাব দিতে—”
প্রমি গম্ভীর গলায় বলল, “ছোটাচ্চু আর ফারিহাপুর ব্রেক-আপ হয়ে গেছে।”
ঝুমু খালার চোখ বড় বড় হয়ে উঠল, বলল, “কও কী! বেরেক আপ? মানে ছাড়াছাড়ি?”
“হুঁ।“
ঝুমু খালার মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। সে এবারে ঘরের ভেতর ঢুকে তাদের পাশে বসে পড়ল, হাতের ঝাড়টা পতাকার মতো ধরে রেখে বলল, “কী সর্বনাশা কথা! এখন কী হবে?”
প্ৰমি বলল, “সেই জন্যে আমরা সবাই বসেছি। কী করা যায় সেইটার কথা বলছি।”
ঝুমু খালার বুদ্ধির উপর শান্তর অনেক বেশি ভরসা। সে জিজ্ঞেস করল, “তোমার কোনো আইডিয়া আছে ঝুমু খালা?”
ঝুমু খালা বলল, “এইটা আইডিয়ার ব্যাপার না। মিল-মহব্বত আইডিয়া দিয়া হয় না।”
“তাহলে কী দিয়ে হয়?”
“আমাগো গেরামে জরিনি বেওয়া থাকে। কমপক্ষে একশ’ চল্লিশ বছর বয়স। চোখে দেখে না, কানে শুনে না। মাথার চুল শণের মতো
সাদা। শরীরের চামড়ায় কুঁচ পড়েছে, মুখে দাঁত নাই, খালি মাড়ি। সেই জরিনি বেওয়া পান পড়া দেয়, সেই পান পড়া যদি একবার খাওয়াতে পারো দেখবা মিল-মহব্বত কারে কয়। একটা খাওয়াবা তোমার ছোটাচ্চুরে আরেকটা খাওয়াবা ফাজিলারে–”
“ফাজিলা না। ফারিহা।”
“ঐ একই কথা।” ঝুমু খালা বলল, “যদি দুইজনরে দুইটা পান পড়া খাওয়াতে পারো দেখবা পাগলের মতো দুইজন ছুঁইটা আসবে–”
টুনি বলল, “ঝুমু খালা, আমার মনে হয় এইটা পান পড়া দিয়ে হবে না।”
ঝুমু খালা তার ঝাড়টা মেঝেতে ঠুকে বলল, “একশবার হবে। হাজারবার হবে। জরিনি বেওয়ার পান পড়া কী চিজ, তোমরা জানো না।”
টুনি বলল, “ঠিক আছে। কিন্তু আমরা তো জরিনি বেওয়ার কাছে যেতে পারব না। আমাদের অন্য কিছু করতে হবে।”
ঝুমু খালা মেনে নিল। মাথা নেড়ে বলল, “সেইটা ভুল বলো নাই। সেইটা সত্য কথা। অন্য সিস্টিম করতে হবে।” সবাই দেখল ঝুমু খালা ঝাডুটা সামনে শুইয়ে রেখে অন্য সিস্টিম চিন্তা করতে শুরু করেছে।
এই বাসার ছেলেমেয়েরী ঝুমু খালার কথাবার্তা, চিন্তা-ভাবনাকে খুব গুরুত্ব দেয়। তাই সবাই কোনো শব্দ না করে ঝুমু খালাকে চিন্তা করতে দিল। ঝুমু খালা চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ চিন্তা করে চোখ খুলে বলল, “তোমাদের ছোটাচ্চুর মনরে কেমন করে নরম করা যাবে সেইটা এখন বলতে পারব না। তবে—”
সবাই ঝুঁকে পড়ল, “তবে?”
ঝুমু খালা মুখ গম্ভীর করে বলল, “ফাজিলার মন কেমন করে নরম করা যাবে সেইটা বলতে পারি।”
“ফাজিলা না, ফারিহা।”
“একই কথা।”
টুনি জানতে চাইল, “কী রকম করে?”
“তোমার ছোটাচ্চুর একটা কঠিন ব্যারাম দরকার। কঠিন অসুখ।”
“অসুখ?”
“হ্যাঁ। যেমন মনে করো কলেরা। না হলে যক্ষ্মা।”
বাচ্চারা চমকে উঠল, “কলেরা? যক্ষ্মা?”
ঝুমু খালা মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ। যখন তোমার ছোটাচ্চু অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকবে সেই খবর যখন ফাজিলা পাবে”
“ফারিহা।”
“হ্যাঁ ফারিহা। যখন খবর পাবে তখন তার মনের মাঝে একটা দরদ হবে। তখন ঝগড়া-ঝাটি ভুলে চলে আসবে। মহব্বত ফিরে আসবে, মিলমিশ হয়ে যাবে।”
শান্তকে একটু বিভ্রান্ত দেখাল। মাথা চুলকে বলল, “কিন্তু ছোটাচ্চুর অসুখ কেমন করে বানাব? কলেরা না হলে যক্ষ্মার জীবাণু আনতে হবে?”
ঝুমু খালা বলল, “মনের মতন অসুখ পাওয়া কঠিন। তবে আরেকটা কাজ করা যায়।”
“কী কাজ?”
“ঠ্যাং ভেঙে দিতে পারলেও কাজ হয়।“
সবাই একসাথে চিৎকার করে উঠল “ঠ্যাং ভেঙে দিব?”
ঝুমু খালা মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ। ঠ্যাং ভেঙে যদি বিছানায় শোয়াইয়া রাখো, তাহলেও কাজ হবে। কলেরা না হলে যক্ষ্মার সমান কাজ হবে। জরিনি বেওয়ার পান পড়া হলো এক নম্বর। ঠ্যাং ভাঙা হলো দুই নম্বর।”
.
ঝুমু খালা চলে যাওয়ার পর সবাই কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। টুম্পা উশখুশ করে বলল, “তাহলে আমরা কি ছোটাচ্চুর পা ভাঙব?”
শান্ত বলল, “আমি চেষ্টা করতে পারি। সিঁড়ির উপর একটা কলার ছিলকা রেখে হাল্কা মতন ধাক্কা দিলে-”
প্রমি ধমক দিয়ে বলল, “তুই চুপ করবি? একজন মানুষের পা আবার কেমন করে ভেঙে দেয়? তোর কি মাথা খারাপ হয়েছে?”
শান্ত মিনমিন করে বলল, “কিন্তু ঝুমু খালা যে বলল!”
“ঝুমু খালা বললেই সেটা করতে হবে?”
“তাহলে কি কলেরা হাসপাতাল থেকে কলেরার জার্ম আনতে হবে?”
টুনি বলল, “আমার মনে হয় কী–”
সবাই টুনির দিকে ঘুরে তাকাল, জিজ্ঞেস করল, “কী মনে হয়?”
“ঝুমু খালা কথাটা ভুল বলে নাই।”
“ভুল বলে নাই?”
“না। আমাদের ক্লাশে একটা ছেলে পড়ে, তার নাম হচ্ছে খলিল। খলিলের থেকে পাজি ছেলে এখন পর্যন্ত জন্মায় নাই। ক্লাশের কেউ তাকে দুই চোখে দেখতে পারে না। সবার সাথে ঝগড়া, মারামারি। খলিল খালি দুষ্টু না, দুষ্টু আর পাজি। একদিন হঠাৎ–“
“হঠাৎ কী?”
“আমরা খবর পেলাম রিকশা একসিডেন্ট করে পা ভেঙে হাসপাতালে। তখন ক্লাশের সবাই বলতে শুরু করল, আহা বেচারা খলিল! সবাই তখন খলিলকে দেখতে হাসপাতালে গেল। তারে দেখে সবার কী যে মায়া হলো! কেউ খলিলের মাথা টিপে দেয়, কেউ হাত টিপে দেয়, কেউ বাতাস করে, কেউ দুধ খাওয়ায়—”
