“পচা মডার্ন না। পোস্ট মডার্ন।”
“একই কথা।”
ছোটাচ্চু গর্জন করে বলল, “এক কথা না।”
টুনি ছোটাচ্চুর দিকে তাকিয়ে বলল, “এখন তুমি এটা নিয়ে আমার সাথে ঝগড়া করবে?”
ছোটাচ্চু কেমন যেন থতমত খেয়ে গেল। একটু আঁ-উ করে থেমে গেল। টুনি থমথমে গলায় বলল, “ছোটাচ্চু।”
‘কী?”
“তোমাকে একটা কথা বলি?”
“বল।”
“তুমি এক্ষুনি ফারিহাপুর কাছে গিয়ে বলো তোমার ভুল হয়ে গেছে! আর কখনো তুমি ঝগড়া করবে না।”
ছোটাচ্চু গর্জন করে উঠল, বলল, ”নেভার। তুই জানিস ফারিহা আমাকে কী বলেছে? বলেছে আমি নাকি ব্রেন ডেড। কত বড় সাহস!”
টুনি ছোটাচ্চুর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, “ছোটাচ্চু। মানুষ রাগের মাথায় অনেক কিছু বলে, তুমি সব সময় রেগেমেগে আমাদের একশ’ একটা গালি দাও। তাই রাগ করে কী বলে সেইটা শুনতে হয় না। আর দুই নম্বর কথা হচ্ছে, ফারিহাপু তোমাকে যদি ব্রেন ডেড বলে থাকে ঠিকই বলেছে। তুমি আসলেই ব্রেন ডেড। তা না হলে কেউ কখনো ফারিহাপুর মতোন এরকম ফাটাফাটি একটা মেয়ের সাথে ঝগড়া করতে পারে? পারে না।”
ছোটাচ্চু গরম হয়ে বলল, “দেখ টুনি। ভালো হবে না কিন্তু টুনি টের পেল ছোটাচ্চুর গলায় বেশি জোর নেই, তাই কথা থামাল, বলল, “ফারিহাপুর সাথে ব্রেক-আপ করে তোমার কী লাভ হয়েছে? তোমার খাওয়া নাই, ঘুম নাই, তোমার চোখের নিচে কালি, তোমার মুখে বিন্দি বিন্দি দাড়ি, তোমার চুল আউলা-ঝাউলা-তুমি অফিসে যাও না, তোমার কাজকর্ম বন্ধ! আমাদের সবাই মিলে তোমাকে চোখে চোখে রাখতে হয় কখন তুমি সুইসাইড করে ফেলো–”
টুনির শেষ কথাটা অবশ্যি সত্য নয়, ছোটাচ্চু সুইসাইড করে ফেলবে সেটা তারা কখনো ভাবেনি। তারা সবাই মিলে ছোটাছুকে চোখে চোখে রাখছে সেটাও ঠিক না। কিন্তু কথা বলার সময় একটু বাড়িয়ে-চাড়িয়ে বলতে হয়, তা না হলে কথার মাঝে জোর হয় না।
টুনি ভেবেছিল ছোটাচ্চু আপত্তি করে কিছু একটা বলবে কিন্তু কিছু বলল না, ছাদের দিকে তাকিয়ে একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলল। টুনি গলার স্বর আরো গম্ভীর করে বলল, “ছোটাচ্চু, ফারিহাপু ছাড়া তুমি বাঁচবে না। আমরাও ফারিহাপু ছাড়া আর কাউকে চাই না। তাই তোমাকে আমরা দুই দিন সময় দিচ্ছি। এর মাঝে তোমাকে ফারিহাপুর সাথে মিলমিশ করে নিতে হবে।”
ছোটাচ্চু কেমন যেন ঘোলা চোখে টুনির দিকে তাকাল, তারপর বলল, “টুনি তুই ছোট, তুই বুঝবি না। বিষয়টা এত সোজা না যে বুড়ো আঙুল ছুঁয়ে আড়ি দিয়েছিলাম এখন কেনে আঙুল ছুঁয়ে ভাব করে ফেলব। বিষয়টা জটিল। মানুষের সম্পর্ক হচ্ছে কাঁচের গ্লাসের মতো, একবার ভেঙে গেলে আর জোড়া লাগে না। সুপার গ্লু দিয়ে জোড়া দেওয়ার চেষ্টা করা যায় কিন্তু সেটা শুধু আটকে রাখে জোড়া হয় না–” কথা শেষ করে ছোটাচ্চু এমন লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল যে মনে হলো বুকের ভেতর থেকে একটা সাইক্লোন বের হয়ে টর্নেডোর মতো ঘরে ঘুরপাক খেতে লাগল।
টুনি ছোটাচ্চুকে দেখে খুব মন খারাপ করে বের হলো। বড় মানুষদের মাথার মাঝে ঘিলু এত কম কেন?
.
সেদিন বিকালে আবার একটা গোলটেবিল বৈঠক শুরু হলো, আগের মতোই সবাই মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসেছে। সবার মুখ একটু গম্ভীর, একটু আগে টুনির মুখ থেকে সবাই পুরোটুকু শুনেছে।
অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে শান্ত বলল, “অবস্থা ঘনঘটিয়াস।”
ঘনঘটিয়াস শব্দটার অর্থ কেউ জানে না, ধরে নিল এর অর্থ গুরুতর। কেউ কোনো কথা বলল না। তখন শান্ত আবার বলল, “এখন কী হবে?”
টুম্পা বলল, “এখন ছোটাচ্চু সন্ন্যাসী হয়ে যাবে। বিশ বছর পর ফিরে আসবে। তখন ছোটাচ্চুর এই এই লম্বা চুল আর দাড়ি থাকবে।”
গুড্ডু ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, “সত্যি?”
টুম্পা মাথা নাড়ল, বলল, “সত্যি। আমি পড়েছি।”
গুড্ডু বলল, “কোথায় পড়েছ?”
টুম্পা উত্তর দেবার আগেই শান্ত বলল, “কোথায় আবার–স্কুলের বাথরুমের দেওয়ালে।”
টুম্পা মুখ শক্ত করে বলল, “না। আমি এইটা বাথরুমের দেওয়ালে পড়ি নাই। আমি পড়েছি-”
প্রমি হাত তুলে বলল, “তোরা থামবি? সারাক্ষণ ফালতু কথাবার্তা।”
শান্ত বলল, “মোটেও ফালতু কথাবার্তা না।”
“এখন কী করা যায় সেটা বলবি কেউ?”
সবাই আবার টুনির দিকে তাকাল, একজন জিজ্ঞেস করল, “কী করা যায় বলবি?”
টুনি চশমাটা নাকের উপর ঠিক করে বসিয়ে বলল, “আমি শুধু ছোটাচ্চুর কথাটা শুনেছি। ফারিহাপুর কথা শুনি নাই। দুইজনের কথাই শুনলে কী করা যায় সেটা চিন্তা করা যেত।”
প্রমি জিজ্ঞেস করল, “ফারিহাপুর কথা কেমন করে শুনবি? ফোনে কথা বলবি?”
টুনি মাথা নাড়ল, বলল, “উঁহু। এইসব কথাবার্তা টেলিফোনে হয় না, সামনাসামনি করতে হবে।”
“কীভাবে করবি?”
“জানি না।”
ছোটাচ্চুর সাথে কথা বলাটা সহজ ছিল, সোজাসুজি তার ঘরে চলে গেছে। ফারিহাপুর কাছে তারা কেমন করে যাবে? কে যাবে? কী বলবে?
ঠিক তখন এই ঘরটাতে ঝুমু খালা উঁকি দিল, এতজনকে এভাবে বাস থাকতে দেখে সন্দেহের গলায় বলল, “ব্যাপারটা কী? তোমাদের মতলবটা কী?”
শান্ত বলল, “আমাদের কোনো মতলব নাই।”
“খামোখা মিছা কথা না বলে সত্যি কথাটা কও। মতলবটা বদ মতলব কি না এইটা বললেই হবে।”
টুম্পা মুখ শক্ত করে বলল, “মোটও বদ-মতলব না। আমরা ছোটাচ্চুকে নিয়ে কথা বলছি।”
ঝুমু খালা জিজ্ঞেস করল, “কী কথা?”
