টুনি দরজায় দাঁড়িয়ে একটা বড় নিঃশ্বাস নিয়ে ভিতরে ঢুকে খুবই হাসি-খুশি গলায় ডাকল, “ছোটাচ্চু!”
ছোটাচ্চু একটু চমকে উঠে টুনির দিকে তাকাল, বলল, “কে? টুনি?”
কিছুই যেন হয়নি, সবকিছু যেন ভালোভাবে চলছে সেরকম ভান করে টুনি ছোটাচ্চুর বিছানার দিকে এগিয়ে গেল, বলল, “কী হয়েছে জানো ছোটাচ্চু?”
ছোটাচ্চুর মুখ দেখে বোঝা গেল কী হয়েছে। সেটা নিয়ে ছোটাচ্চুর এতটুকু আগ্রহ নাই, মাছের মতো গোল গোল চোখ করে টুনির দিকে তাকিয়ে রইল।
টুনি তার গলার মাঝে অনেকখানি উত্তেজনা নিয়ে বলল, “টুম্পার ছেলের সাথে রিংকুর মেয়ের বিয়ে।”
টুম্পার বয়স দশ রিংকুর আট, তাই তাদের ছেলে এবং মেয়ের বিয়ের খবরটি শুনে ছোটাচ্চুর ভুরু কুঁচকানো উচিত ছিল। ছোটাচ্চু ভুরু কুঁচকাল না, কথাটা মেনে নিয়ে বলল, “ও।” তারপর আবার বইটার দিকে তাকাল, পড়ার ভান করতে লাগল।
টুনি হাল ছাড়ল না, বলল, “টুম্পার ছেলে মানে বুঝেছ তো? টুম্পার একটা ছেলে পুতুল আছে, নাম রাজা।”
ছোটাচ্চু বলল, “ও।”
টুনি বলল, “রিংকুর মেয়ে পুতুল। নাম কী জানো?”
যে কোনো মানুষের বলা উচিত “রানি।” ছোটাচ্চু কিছু না বলে মাছের মতো তাকিয়ে রইল। টুনি নিজেই বলল, “বিনু।”
ছোটাচ্চু বলল, “ও।”
টুনি বলল, “ফ্যামিলির প্রথম বিয়ে সেই জন্যে সবার খুব উৎসাহ। প্রথমে পান-চিনি তারপর গায়ে হলুদ। তারপর আকত–সবার ইচ্ছা যে তুমি হবে উকিল বাবা।”
অন্য যে কোনো সময় হলে ছোটাচ্চু উকিল বাবা হওয়া কিংবা না হওয়া নিয়ে অনেক রকম কথা বলত, আজকে কিছুই বলল না। মাছের মতো চোখ করে তাকিয়ে রইল। টুনি তবু হাল ছাড়ল না, বলল, “বিয়েতে কাকে কাকে দাওয়াত দিব সেটার লিস্ট করেছে। বাইরে থেকে কাকে কাকে দাওয়াত দিবে জানো?”
ছোটাচ্চু জানার কোনো আগ্রহ দেখাল না, চোখের পাতি না ফেলে টুনির দিকে তাকিয়ে রইল। টুনি মুখে একটা সরল ভাব ধরে রেখে বলল, “বাইরে থেকে দাওয়াত দিবে ফারিহাপুকে—”
ছোটাচ্চু একেবারে ইলেকট্রিক শক খাওয়ার মতো করে চমকে উঠল, প্রথমবার চোখের পাতি ফেলল, পিটপিট করে বলল, “কী বললি?”
“আর মনে করো শায়কা খালাকে দাওয়াত দিতে পারি–”
“আগে কার নাম বলেছিস?”
টুনি কিছুই বুঝে না এরকম ভান করে বলল, “কেন? ফারিহাপু।” ছোটাচ্চু বলল, “ফা-ফা-ফা–”
“হ্যাঁ। ফারিহাপু।”
ছোটাচ্চু কিছুক্ষণ মুখ হাঁ করে টুনির দিকে তাকিয়ে রইল, টুনি একটু অবাক হওয়ার ভান করে বলল, “কোনো সমস্যা ছোটাচ্চু?”
ছোটাচ্চু খুব জোরে জোরে মাথা নেড়ে বলল, “না, না, কোনো সমস্যা নাই।” তারপর হঠাৎ করে মাথা নাড়ানো থামিয়ে বলল, “ফারিহা?”
“হ্যাঁ। তুমি কি ফারিহাপুকে একটু বলে দেবে?”
ছোটাচ্চু কেমন যেন লাফ দিয়ে উঠল, বলল, “আমি?”
“হ্যাঁ। তুমি ছাড়া আর কে বলবে?”
ছোটাচ্চুর মুখ দেখে মনে হলো ছোটাচ্চু এখনো বুঝি পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পারে নাই, আবার বলল, “আমি?”
টুনি মাথা নাড়ল, বলল, “হ্যাঁ। তুমি।” টুনি এদিক-সেদিক তাকাল, বিছানার উপর ছোটাচ্চুর মোবাইল ফোনটা ছিল, সেটা হাতে নিয়ে ছোটাচ্চুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “নাও ছোটাচ্চু। ফারিহাপুকে একটা ফোন করো।”
ছোটাচ্চু আবার বসে থেকে একটা ছোট লাফ দিল, বলল, “ফোন করব? আমি? এখন?”
“হ্যাঁ। সমস্যা কী?”
“কিন্তু কিন্তু কিন্তু—”
“কিন্তু কী?”
ছোটাচ্চু বিশাল একটা নিঃশ্বাস ফেলে ছাদের দিকে তাকাল তারপর বলল, “আমি পারব না।”
“তুমি পারবে না?”
“না।”
টুনি জিজ্ঞেস করল, “কেন পারবে না ছোটাচ্চু?”
“ফারিহার সাথে আমার ব্রেক-আপ হয়ে গেছে।”
ছোটাচ্চু কী বলেছে বুঝতে টুনির কোনো সমস্যা হলো না কিন্তু তারপরেও জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?”
“ব্রেক-আপ। ফারিহার সাথে আমার আর কোনো সম্পর্ক নাই। নো কানেকশান। নাথিং।”
টুনি অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “ছোটাচ্চু।”
ছোটাচ্চু বলল, “উঁ।”
“কে ব্রেক-আপ করেছে? তুমি না ফারিহাপু?”
ছোটাচ্চু টুনির দিকে কেমন জানি ঘোলা চোখে তাকাল, তারপরে বলল, “কীভাবে কীভাবে জানি হয়ে গেল। আমি একটু বলেছি তারপর ফারিহা তারপর আবার আমি। মাথা গরম করে তখন আবার ফারিহা বলল, বাংলা সাহিত্যে এখনো উত্তর আধুনিক কবিতা লেখা হয় নাই। আমি বললাম হয়েছে—”
“কী কবিতা?”
“উত্তর আধুনিক মানে পোস্ট মডার্ন।“
“তুমি কী বললে?”
“আমি বলেছি অবশ্যই হয়েছে। ফারিহা বলেছে হয় নাই। বলেছে এইগুলো ইউরোপিয়ান ঢং ছোটাচ্চুর নাকটা কেমন যেন ফুলে উঠল, বলল, “ফারিহার কত বড় অডাসিটি।”
“কী সিটি?”
“অডাসিটি। মানে দুঃসাহস। কত বড় দুঃসাহস সে এই দেশের পোস্ট মডার্ন মুভমেন্টকে অস্বীকার করে–” ছোটাচ্চু তার নাক ফুলিয়ে মডার্ন পোস্ট মডার্ন-এর পার্থক্য নিয়ে কথা বলতে লাগল। টুনি কিছু বুঝল, বেশিরভাগই বুঝল না। ধৈর্য ধরে কথাগুলো শুনল, তারপর বলল, “ছোটাচ্চু।”
ছোটাচ্চু বলল, “উঁ।”
“তুমি মডার্ন পোস্ট মডার্ন নিয়ে ঝগড়া করে ফারিহাপুর সাথে ব্রেক-আপ করেছ? তোমার মাথার মাঝে ঘিলু বলে কিছু নাই।”
“কী বললি?”
“আমি বলেছি তুমি হচ্ছ চূড়ান্ত বোকা। ফারিহাপুর মতো সুইট মেয়ে দুনিয়াতে আছে? ফারিহাপুর মতো স্মার্ট মেয়ে দুনিয়াতে আছে? ফারিহাপুর সাথে এক মিনিট কথা বললে আমাদের মন ভালো হয়ে যায়। আর তুমি ফারিহাপুর সাথে মডার্ন পচা মডার্ন নিয়ে ঝগড়া করো–”
