শান্ত মুখ গম্ভীর করে বলল, “জীলে ধরেছে।”
“জীন?”
ও “হ্যাঁ। ছোটাচ্চু বাসায় আসতে অনেক দেরি করে না?”
“তাতে কী হয়েছে?”
“রাস্তার মোড়ে একটা গাব গাছ আছে। অনেক রাত্রে ছোটাচ্চু যখন সেই গাব গাছের নিচে দিয়ে আসে তখন একদিন জীন ধরেছে।”
একজন আপত্তি করল, “ঐটা মোটেও গাব গাছ না। ঐটা আম গাছ।”
শান্ত বলল, “একই কথা।”
“একই কথা না।”
তখন আবার ঝগড়া লেগে গেল, তখন ঝগড়া থামাল গুড়ু। সে রিনরিনে গলায় বলল, “ছেলেদেরকে জীনে ধরে না। মেয়েদেরকে জীনে ধরে। ছেলেদেরকে ধরে পরী।”
শান্ত মেঘস্বরে বলল, “তোকে কে বলেছে?”
“ঝুমু খালা।”
এসব বিষয়ে ঝুমু খালার থেকে বড় এক্সপার্ট পৃথিবীতে নেই। তাই সবাইকে মেনে নিতেই হলো যে ছোটাচ্চুকে জীনে ধরেনি, কিছু একটা ধরে থাকলে সেটা নিশ্চয়ই পরী। শান্ত পর্যন্ত মেনে নিল, বলল, “ঠিক আছে। তাহলে পরী ধরেছে।”
একজন জানতে চাইল, “পরী ধরলে কী করতে হয়?”
“তাবিজ দিতে হয়।”
“তাবিজ কোথায় পাব?”
“আসল সোলেমানী জাদু নামে একটা বই আছে। সেই বইয়ে সব রকম তাবিজ আছে। জীন-ভূত দূর করার তাবিজ। বউ বশ করার তাবিজ। বিছানায় পিশাব বন্ধ করার তাবিজ। অদৃশ্য হওয়ার তাবিজ।”
অনেকেই চোখ বড় বড় করে বলল, “অদৃশ্য হওয়ার তাবিজ আছে?”
“আছে। খুবই জটিল।”
হঠাৎ করে ছোটাচ্চুর সমস্যা থেকে আলোচনাটা অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার দিকে ঘুরে গেল। প্রমি তখন সবাইকে ধমক দিয়ে আলোচনাটা আবার আগের লাইনে নিয়ে আসে। সে বলল, “আমার মনে হয় না ছোটাচ্চুকে জীন-পরীতে ধরেছে। কিছু একটা হয়েছে সেই জন্যে ছোটাচ্চুর মন খারাপ।”
একজন বলল, “ছোটাচ্চুর এখন মন খারাপ হওয়ার কোনো কারণ নাই। ছোটাচ্চুর প্রাণের বন্ধু হচ্ছে মাহী কাঞ্চন। সব কনসার্টে মাহী কাঞ্চন ছোটাচ্চুকে নিয়ে যায়। আগে বড় মানুষেরা ছোটাচ্চুর আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সি নিয়ে ঠাট্টা করত। এখন করে না। এখন ছোটাচ্চুর নিজের অফিস আছে। দুইজন অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিটেকটিভ রেখেছে। বড় বড় লোকজন ছোটাচ্চুর কাছে বুদ্ধি নিতে আসে। ছোটাচ্চুকে তিনবার টেলিভিশনে দেখিয়েছে–”
একজন প্রতিবাদ করল, “চারবার–“
“তিনবার।”
“চারবার–একবার সাইড থেকে–”
এটা নিয়েও ঝগড়া শুরু হতে পারত কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঝগড়া হলো, কারণ সবাই মাথা নেড়ে স্বীকার করল ছোটাচ্চুর মন খারাপ থাকার কোনো কারণ নেই। গুচ্ছ মনে করিয়ে দিল ছোটাফ্লু এর মাঝে দুইবার তাদেরকে চায়নিজ আর একবার পিতজা খাওয়াতে নিয়ে গেছে।
আরেকজন বলল, “ডিসেম্বর মাসে কক্সবাজার নিয়ে যাবে।”
আরেকজন বলল, “জাল নোটের কেসটা শেষ করলে একটা গাড়ি কিনবে বলেছে–”
অন্যদেরও কিছু না বলার ছিল কিন্তু প্রমি হাত তুলে সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “সব ঠিক আছে। ছোটাচ্চুর খুবই ভালো অবস্থা, তার মন খারাপ হওয়ার কোনো কারণ নাই। কিন্তু সত্যি কথাটা হচ্ছে, ছোটাচ্চুর মন খারাপ কেন? কেন ছোটাচ্চুর মন খারাপ? কী নিয়ে মন খারাপ?”
সবাই এবার চুপ করে গেল, তারপর সবাই আস্তে আস্তে টুনির দিকে তাকাল। এতক্ষণ সবাই কিছু না কিছু বলেছে, শুধু টুনি একটা কথাও বলেনি। সবাই জানে এই বাস্ময় ছোটাচ্চুর সাথে সবচেয়ে বেশি সম্পর্ক টুনির, কখনো ভালো কখনো খারাপ কিন্তু কোনো একটা সম্পর্ক যে আছে তাতে কোনো সন্দেহ নাই। সবাই টুনির দিকে তাকিয়ে রইল। টুনি কিছু বলল নাউখন শান্ত জিজ্ঞেস করল, “টুনি, তুই কি কিছু জানিস, ছোটাচ্চুর কী হয়েছে?”
টুনি বলল, “উঁহু আমি জানি না। কিন্তু—
“কিন্তু কী?”
“অনুমান করতে পারি।”
একসাথে সবাই জিজ্ঞেস করল, “কী অনুমান করতে পারিস?”
টুনি তার চশমাটা নাকের উপর ঠিক করে বসিয়ে বলল, “আমার মনে হয় ছোটাচ্চুর সাথে ফারিহাপুর ব্রেক-আপ হয়ে গেছে।”
“কী হয়ে গেছে?”
“ব্রেক-আপ। ছাড়াছাড়ি। সেই জন্যে ছোটাচ্চুর মন খারাপ।”
“ছাড়াছাড়ি?” টুম্পা জিজ্ঞেস করল, “বিয়ে করলে না ছাড়াছাড়ি হয়। তাদের তো বিয়ে হয় নাই।”
প্রমি টুম্পাকে বলল, “তুই ছোট, তুই এসব বুঝবি না।”
শান্ত বলল, “ব্রেক-আপ হয়েছে তো কী হয়েছে? আবার ফিক্স-আপ হয়ে যাবে। আর না হলে সমস্যা কী? দুনিয়াতে কি আপুদের অভাব আছে? ফারিহাপু চলে গেলে মালিহাপু আসবে। মালিহাপু চলে গেলে সাবিহাপু আসবে। সাবিহাপু চলে গেলে—”
প্রমি চোখে আগুন বের করে শান্তর দিকে তাকিয়ে বলল, “চুপ কর গাধা কোথাকার। তুই ব্যাটা ছেলে মানুষ, তুই এগুলো বুঝবি না।” তারপর টুনির দিকে তাকিয়ে বলল, “টুনি, তুই সত্যিই মনে করছিস ফারিহাপুর সাথে ছোটাচ্চুর ব্রেক-আপ হয়ে গেছে?”
টুনি মাথা নাড়ল, বলল, “আমি ঠিক জানি না। কিন্তু আমার মনে হয় এইটাই কারণ।”
“তুই ঠিক জানিস?”
“না, কিন্তু বের করার জন্যে চেষ্টা করতে পারি।
সবাই তখন হইহই করে বলল, “এটা বের করো, এটা বের করো।” কাজেই গোলটেবিল বৈঠক থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো টুনি ছোটাচ্চুর কাছ থেকে বের করে আনবে ফারিহাপুর সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়াটাই ছোটাচ্চুর মন খারাপের কারণ কি না।
.
পরদিন সকালেই টুনি ছোটার ঘরে হাজির হলো। ছোটাচ্চু বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আছে, পায়ের নিচে বালিশ দিয়ে পা দুটো উঁচু করে রেখেছে। কোলে একটা মোটা বই, উঁকি দিয়ে বইয়ের নামটা পড়ার চেষ্টা করল, পড়তে পারল না, মনে হলো কঠিন জ্ঞানের একটা বই। মাথার কাছে ল্যাপটপে একটা গান বাজছে খুবই করুণ স্বরে। সেখানে একজন গান গাইছে, ‘এই জীবন রেখে কী হবে মরে গেলেই ভালো’ সেই রকম একটা গান।
