মাহী কাঞ্চন এই কথাগুলোও শুনল বলে মনে হলো না, থরথর করে কাঁপতেই থাকল। ছোটাচ্চু বলল, “কাঞ্চন ভাই, এখন আর ভয় নাই। চলেন হাঁটি, মানুষজন পেয়ে যাব। আপনাকে দেখলেই সবাই পাগল হয়ে যাবে।”
মাহী কাঞ্চন দাঁড়িয়েই রইল, ছোটাচ্চু তখন তাকে ধরে টেনে টেনে নিতে থাকে। চোখ জ্বালা করছে বলে চোখ খুলে দেখতে পারছে না, তার মাঝে কষ্ট করে মাঝে মাঝে চোখটা একটু খুলে আন্দাজ করার চেষ্টা করল কোন দিকে যাচ্ছে। ছোটাচ্চু জানে যে কোনো দিকে একটু হাঁটলেই মানুষজন, দোকানপাট কিছু একটা পেয়ে যাবে। মাহী কাঞ্চনের জন্যে হঠাৎ করে তার কেমন যেন দুশ্চিন্তা হতে থাকে, এই মানুষটি নিশ্চয়ই কখনো এরকম ভয়ঙ্কর অবস্থায় পড়েনি।
হঠাৎ করে মাহী কাঞ্চন দাঁড়িয়ে গেল, তারপর বলল, “গান!”
ছোটাচ্চু অবাক হয়ে বলল, “কীসের গান?”
মাহী কাঞ্চনের কাঁপুনি হঠাৎ করে কমে আসে, প্রথমবার সে পরিষ্কার শান্ত গলায় বলল, “আমার গান।”
“আপনার গান?”
“হ্যাঁ, নিশি রাইতে চান্দের আলো-” বলেই গুনগুন করে সে গানটা দুই লাইন গেয়ে ফেলল, সাথে সাথে ছোটাচ্চুর গানটা মনে পড়ে যায়, কতবার শুনেছে! এই গানটা গেয়েই মাহী কাঞ্চন রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এখন হঠাৎ করে মাহী কাঞ্চন এই গানটার কথা বলছে কেন? ছোটাচ্চু জিজ্ঞেস করল, “এই গানটার কী হয়েছে?”
“বাজাচ্ছে।”
“কে বাজাচ্ছে?”
“জানি না। শুনতে পাচ্ছ না?”
ছোটাচ্চু তখন কান পেতে শোনার চেষ্টা করল এবং হঠাৎ মনে হলো সত্যিই দূর থেকে খুব অস্পষ্টভাবে গানটা শোনা যাচ্ছে। আশেপাশে কোথাও গানটি বাজছে। ছোটাচ্চু বলল, “চলেন যাই, কোথায় গান বাজছে দেখি। মানুষজন পাওয়া যাবে সেখানে।”
মাহী কাঞ্চন বলল, “চলো।”
মাহী কাঞ্চন তাকে আপনি করে বলত, হঠাৎ তুমি করে বলতে শুরু করেছে! ছোটাচ্চু অবশ্যি কিছু মনে করল না, প্রায় তার সমবয়সী কিংবা এক-দুই বছর বড় হতে পারে, তুমি করে ডাকতেই পারে। ছোটাচ্চু মাহী কাঞ্চনের হাত ধরে বলল, “চোখ বন্ধ করে হাঁটতে সমস্যা হচ্ছে না তো?”
“তা হচ্ছে। তুমি পারলে আমিও পারব।”
গানের শব্দ শুনে শুনে তারা কিছুক্ষণের মাঝেই রাস্তার পাশে একটা ছোট টংয়ে হাজির হলো। টংয়ের ভেতর একটা ছোট টেলিভিশন, সেখানে মাহী কাঞ্চন একটা গিটার হাতে নিয়ে নিশি রাইতে চান্দের আলো’ গান গাইছে। টংয়ের সামনের বেঞ্চে বসে কয়েকজন মানুষ চা খেতে খেতে গান শুনছে। আবছা আলোতেও ছোটাচ্চু আর মাহী কাঞ্চনের চেহারা দেখে সবাই বুঝে গেল কিছু একটা সমস্যা হয়েছে, কয়েকজন দাঁড়িয়ে বলল, “কী হইছে আপনাগো?”
ছোটাচ্চু বলল, “মলম পার্টি।”
আর কিছুই বলতে হলো না, সাথে সাথে সবাই কী হয়েছে বুঝে গেল। একজন মানুষ প্রায় আর্তনাদের মতো শব্দ করে বলল, “কী হইল দেশটার? এই সপ্তাহে আপনারা এইখানে দুই নম্বর পার্টি!”
টংয়ে বসে থাকা মানুষটা কাকে যেন ডেকে বলল, “এই শামসু, এক বালতি পানি আন তাড়াতাড়ি। আর সাবান।” তারপর ছোটাচ্চু আর মাহী কাঞ্চনকে বলল, “আপনারা বসেন। আপনাগো আর কোনো ভয় নাই। আমরা আছি।”
টেলিভিশনে মাহী কাঞ্চনের গান শেষ হবার সাথে সাথে একজন উপস্থাপিকা মিষ্টি গলায় বলল, “আপনারা এতক্ষণ আপনাদের প্রিয় মাহী কাঞ্চনের গান শুনছিলেন। এই মাত্র আমরা খোঁজ পেয়েছি জনপ্রিয় গায়ক মাহী কাঞ্চন নিখোঁজ। তিনি এবং তার এক সহযোগী সম্ভবত দুবৃত্তদের কবলে পড়েছেন। শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পুলিশ এবং র্যাবের তল্লাশি চলছে।”
ছোটাচ্চু প্রায় চিৎকার করে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, মাহী কাঞ্চন ছোটাচ্চুকে থামাল।
টেলিভিশনের উপস্থাপিকা বলল, “আমাদের রিপোর্টার ফয়সল খান মাহী কাঞ্চনের বাসভবনে আছেন, আমরা এখন তার মুখ থেকে সরাসরি শুনতে পাচ্ছি।”
মাহী কাঞ্চন ছোটাচ্চুর হাত ধরে বলল, “প্লিজ, আপনি এখানে আমার পরিচয় দেবেন না!”
“কেন?”
“সাংবাদিক-পুলিশ আমাকে কাঁচা খেয়ে ফেলবে।”
“আপনি তো কোনো দোষ করেননি। আপনার সমস্যা কী? যা হয়েছে বলবেন!”
মাহী কাঞ্চন মাথা নেড়ে বলল, “তুমি বুঝতে পারছ না। কী হয়েছে আমার কিছু মনে নাই!”
ছোটাচ্চু অবাক হয়ে বলল, “কিছু মনে নাই?”
“না। আবছা মনে আছে কেউ একজন একটা চাকু নাচাচ্ছে–তারপর দেখলাম আমি চোখ বন্ধ করে রাস্তায় কাদার মাঝে দাঁড়িয়ে আছি, অনেক দূর থেকে একটা গান শোনা যাচ্ছে নিশি রাইতে চান্দের আলো–এর মাঝখানে কী হয়েছে আমি কিছু জানি না!”
“কী আশ্চর্য!”
“তাই বলছিলাম তুমি আমাকে বাঁচাও। সাংবাদিক-পুলিশের হাত থেকে বাঁচাও।”
ছোটাচ্চু বলল, “ঠিক আছে দেখছি!”
ততক্ষণে একটা ছোট ছেলে কাছাকাছি টিউবওয়েল থেকে এক বালতি পানি আর ছোট একটা নতুন সাবান নিয়ে এসেছে। ছোটাচ্চু আর মাহী কাঞ্চন দুজনে মিলে তখন চোখে পানি দিতে লাগল, চোখ দেয়ার চেষ্টা করতে লাগল। বেশ কিছুক্ষণ থোয়ার পর চোখে একটু আরাম হলো, দুজনেই তখন চোখ মেলে একটু একটু দেখতে শুরু করল।
টংয়ের মানুষটি দুই কাপ চা বানিয়ে এনেছে। দুজনের কারোরই এখন চা খাওয়ার ইচ্ছে ছিল না কিন্তু মানুষটির আন্তরিকতা দেখে আর করতে পারল না।
ছোটাচ্চু চা খেতে খেতে বলল, “আপনারা আমাদের বিশ্বাসী একজন রিকশাওয়ালা কিংবা সিএনজি ড্রাইভার দিতে পারবেন?”
